১৫ এপ্রিল ২০২৩


নাজাতের তৃতীয় দিন : জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে হবে

শেয়ার করুন

শাহিদ হাতিমী : মুসলিম উম্মাহর জন্য রামাজানের প্রতিটি মুহুর্তই মহামূল্যবান। এই মাস প্রাপ্তিতে পরকালীন চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য মুমিনমাত্রই আল্লাহমুখি হন, আমল করেন। প্রথম ১০ দিনে আল্লাহর রহমতে বান্দা নিজেকে সিক্ত করে নেয়, দ্বিতীয় ১০ দিনে ক্ষমা লাভের মাধ্যমে বান্দা নিজেকে আল্লাহর কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়, আর শেষ ১০ দিনে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার নিশ্চয়তা লাভের চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে।

এ জন্য মহান আল্লাহ ও তার রাসুল সা. রমজানের শেষ ১০ দিনের প্রতি অসাধারণ গুরুত্বারোপ করেছেন এবং নানা নফল ইবাদতের দ্বারা শেষ ১০ দিনকে সমৃদ্ধ করেছেন। রমজানের শেষ দশক হলো এ মাসের সবচেয়ে গুরুত্ববহ সময়। এ সময়ে নবী কারিম সা.-এর ইবাদত-বন্দেগি হতো বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এমনকি রমজানের প্রথম বিশদিন থেকেও আলাদা বোঝা যেতো শেষ দশদিনের ইবাদত-নিমগ্নতা। হজরত আয়েশা রা. বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সা. রমজানের শেষ দশকে এতো ইবাদত করতেন, যা বছরের অন্য সময়ে করতেন না। -সহিহ মুসলিম : ১১৭৫। তিনি আরও বলেন, ‘যখন রমজানের শেষ দশক আসতো নবী কারিম সা. তখন ইবাদতের জোর প্রস্তুতি নিতেন, নিজে রাত্রি জাগরণ করতেন এবং পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে তুলতেন।’ -সহিহ বোখারি : ২০২৪।

আমাদেরও রমজানের শেষ দশকে ইবাদতে নিমগ্ন হওয়া চাই, বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলোতে। কারণ এ রাতগুলোতেই আছে হাজার বছরের সেরা রাত লাইলাতুল কদর, যা কোরআন নাজিলের মতো মহাঅর্জনসমৃদ্ধ। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি বিশ্বাস ও ইহতিসাবসহ কদর রাত ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাল, তার আগের জীবনের সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ -সহিহ বোখারি : ১৯০১। শেষ দশকে হেলায়, অবজ্ঞায় না কাটিয়ে আমলের মাধ্যমে কাজে লাগাই। সুতরাং যাঁরা এতেকাফরত এবং যারা এতেকাফের বাহিরে সকলেই আসুন লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করি।

অনেকের জানা কথা- রমজানের শেষ দশকে শান্তির বার্তা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে মহাগ্রন্থ আল কোরআন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি একে নাজিল করেছি মহিমান্বিত রাতে (লাইলাতুল কদর)। আপনি কি জানেন মহিমান্বিত রাত কী? মহিমান্বিত রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। সেই রাতে প্রতিটি কাজের জন্য ফেরেশতারা এবং রূহ তাদের প্রতিপালকের আদেশক্রমে অবতীর্ণ হয়। সেই রাতে শান্তিই শান্তি, ফজর হওয়া পর্যন্ত।’ -সুরা কদর : ১-৫ । বায়হাকির শোয়াবুল ঈমানে হজরত আনাস রাযি. বর্ণিত একটি হাদিস উদ্ধৃত হয়েছে।

এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হজরত রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, যখন কদর রাত আসে, তখন হজরত জিবরাইল আ. ফেরেশতাদের বিরাট বাহিনীসহ পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন এবং দাঁড়িয়ে কিংবা বসে আল্লাহর জিকির ও ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকা প্রত্যেক বান্দার জন্য রহমতের দোয়া করেন। এই হাদিস হতে কদর রাতের মর্যাদা এবং এই রাতে ইবাদত-বন্দেগি, কোরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ ও ইসলামি আলোচনা ও জ্ঞানচর্চার মর্যাদা স্পষ্টভাবে জানা যায়। শেষ দশকের ইবাদতের অন্যতম হলো- শবেকদর তালাশ করা। নবী কারিমে সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কদর রাতের সন্ধান পেতে চায় সে যেন রমজানের শেষ দশকে খুঁজে নেয়।’ -সহিহ বোখারি : ১১৫৮।

নবীজি সা. আরও বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদরের তালাশ করো।’ -সহিহ বোখারি : ২০১৭। অন্য হাদিসে ইরশাত হয়েছে, ‘কদরের রাত হাজার রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। যে এর কল্যাণ অর্জন পারে না, তার সব কল্যাণই হাতছাড়া হয়। সত্যিকার হতভাগা ছাড়া আর কেউ এর কল্যাণ বঞ্চিত হয় না।’ -ইবনে মাজাহ : ১৬৪৪।

শবেকদর নির্দিষ্ট না হলেও অধিকাংশ মানুষ রামজানে ২৭তম রাতকে কদরের রাত হিসেবে গ্রহণযোগ্য মনে করে। কারণ হজরত বিলাল রা. ও হজরত মুয়াবিয়া রাযি. সহ বেশিরভাগ সাহাবার বর্ণনা সপ্তবিংশ রাতকে নির্দেশ করে। তবে আল্লাহর রাসুল সা. উম্মাহর কল্যাণার্থে নির্দিষ্ট করে দেননি। তাই আমরা সব বেজোড় রাতে আল্লাহর রাসুলের শিখিয়ে দেওয়া দোয়া দিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাইব।

হাদিসের প্রসিদ্ধগ্রন্থ সুনানে তিরমিজিতে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আয়েশা রা. নবীজিকে বললেন, যদি আমি শবেকদর পেয়ে যাই, তাহলে কী দোয়া করবো? নবীজি শেখালেন এই দোয়া ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন তুহিব্বুল আফওয়া ফাআফু আন্নি।’ অর্থাৎ : ‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাকারী, ক্ষমা করতে আপনি পছন্দ করেন। অতএব আমায় ক্ষমা করুন।’

(লেখক : জ্যেষ্ঠ সহ সম্পাদক, আজকের সিলেট ডটকম)

শেয়ার করুন