১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
ডেস্ক রিপোর্ট : মধ্যবিত্তের জীবনে এখন আর পকেটের হিসাব মেলে না। বেড়েই চলেছে নিত্যপণ্যের দাম।ডাবল সেঞ্চুরি পার করেছে ব্রয়লার মুরগি।চড়া দামের কারণে গরু-খাসি মাংসের স্বাদ শিকেয় উঠেছে আগেই। এখন বিপত্তি ডিম কিনতে গিয়েও।ডিম ও ব্রয়লার মুরগির বাজারে অস্থিরতা চলছে এক মাস ধরে।ছোলা, ডাল, ভোজ্যতেল ও আটার দামও উর্ধ্বমুখী।
লাগামছাড়া দাম বাড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভোক্তারা। নিম্ন আয়ের অনেকেই ডিম ও গোশত খাওয়া বাদ দিয়েছেন। নিম্ন মধ্যবিত্তদের অবস্থাও ব্যতিক্রম নয়। যারা কিনতে পারছেন, তারাও পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। আগে যারা ডজন ডজন ডিম কিনতেন এখন তারা হালিতে নেমেছেন। গরু কিংবা খাসির গোশত খাওয়া তো অনেকে ভুলেই গেছেন। ব্রয়লার বা লেয়ার মুরগি দিয়ে যারা আমিসের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতেন তারাও এখন পড়েছেন বিপাকে।
রমজান শুরুর আগেই এভাবে ডিম ও গোশতের দাম লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকায় মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
নগরীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শুধু ডিম আর গোশতই নয়, সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে বেশকিছু পণ্যের দাম।সব ধরনের সাক-সবজিও আগের মতো বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে।প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। দাম বেড়েছে মাংসেরও। গরুর মাংসও কেজিপ্রতি ২০-৫০ টাকা বেড়ে এখন ৭২০-৭৫০ টাকায় উঠেছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ছোলা, ডাল, ভোজ্যতেল ও আটার দাম বেড়েছে।
গত মাসেও ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে ছিল। অর্থাৎ এ সময়ে দাম বেড়েছে প্রতি কেজি ৭০ টাকা। আর শেষ দফায় এক সপ্তাহে বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। তখন দাম ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা।
এ পরিস্থিতিতে বেশ কিছুদিন পর যারা ব্রয়লার মুরগি কিনতে বাজার এসেছেন তারা পিলে চমকে যাচ্ছেন। বিপাকে পড়ছেন ফার্মের মুরগির ডিমের দাম নিয়েও। কারণ প্রতি ডজন ডিমের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা। এখন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা ডজনে। প্রতি হালি ৫০ টাকা, যা আগে ৪৫ টাকা ছিল। এদিকে ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ার সাথে সাথে লেয়ার বা পাকিস্তানি জাতের মুরগির দামও কেজিতে অন্তত ২০ টাকা বেড়ে গেছে। গত সপ্তাহে ২৮০ টাকায় পাকিস্তানি মুরগি পাওয়া গেলেও এখন ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মুরগি ও ডিমের মতো বাড়তি দেখা গেছে গরুর মাংসের দাম। বেশিরভাগ বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকা দরে, যা গত সপ্তাহে ৭০০ টাকায় মিলতো। আর খাসির গোশত এখন ১০০০ টাকার নিচে পাওয়া যাবে না নগরীর কোনো বাজারে। বকরি ৯৫০ টাকা। আগে যেখানে বকরি ৮০০ ও খাসির গোশত ৯০০ টাকায় পাওয়া যেত।
ক্রমাগত পণ্যের এ মূল্যবৃদ্ধি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। দোকানে দোকানে দাম নিয়ে চলছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের বাগবিতণ্ডা। বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগি ও ফার্মের ডিমের দাম বাড়ায় নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ক্রেতারা কষ্টে পড়ে গেছেন। বেশকিছু ক্রেতাকে দাম শুনে খালি হাতে ফিরে যেতে দেখা গেছে।
আম্বরখানা কাঁচাবাজারে আসা লোহারপাড়ার কামাল হোসেন বলেন, দুদিন আগেও ব্রয়লার মুরগি ১৯৫ টাকায় কিনেছি। এখন বলছে ২২০ টাকা! মাসখানেক আগে কিনতাম ১৫০ টাকা। এরমধ্যে কী হলো যে দাম শুধু হু হু করে বাড়ছে। এভাবে আমাদের জীবন চালানো সম্ভব না। কোনোভাবেই হিসাবের মধ্যে সংসার চালানো যাচ্ছে না। মাছ-মাংস খাওয়া প্রায় ছেড়ে দিতে হয়েছে।
এদিকে বিক্রেতারাও মুরগি ও ডিমের দাম দফায় দফায় বাড়ার কোনো সঠিক কারণ বলতে পারছেন না।
মিরাবাজারে কথা হয় আগপাড়ার এক গৃহিণীর সঙ্গে। জানালেন তার স্বামী ঢাকায় গার্মেন্টেসে চাকরি করেন।তিন সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন। স্বামীর পাঠানো টাকায় খেয়ে না খেয়ে কোনো রকম সংসার চলে।দীর্ঘ তিনমাস পরে মুরগী কিনতে এসেছেন, তাও নিজের পরিবারের জন্য নয়। মেয়ে জামাইকে খুশি রাখতে মেয়েকে সাথে নিয়েই মুরগী কিনেছেন। মেয়েকে ২২০ টাকা কেজি দরে মুরগী কিনে দিলেন।
প্রশ্ন করতেই বলে উঠলেন, ‘এত দামে মুরগী কিনে খাওয়ার সামর্থ নেই! আগে যখন দাম কম ছিলো মাসে একবার কি দুই বার কিনে খাইতাম, এখন তো দাম অনেক বেশি তাই আর মুরগীর মাংস খাওয়া হয়না। গরুর মাংস তো কবে দেখেছি মনেই পড়ছে না। আমাদের শাক-পাতা দিয়েই সংসার চলে যায়।’
লালবাজারের মুরগি বিক্রেতা জমিস উদ্দিন বলেন, ‘সরবরাহ কম তাই দাম বেশি শুধু এটুকুই জানি। আমরা বেশি দামে কিনেছি, তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম এভাবে বাড়ুক আমরা সেটা চাই না। কারণ দাম বাড়ায় বিক্রি কম হচ্ছে।’
লালবাজার, মিরাবাজার ও কাজিটুলা বাজার ঘুরে গরুর মাংসের দামও বাড়তি দেখা গেছে। মাংস বিক্রেতা আহমদ আলী বলেন, ‘কম দামে গরু কিনতে পাওয়া যাচ্ছে না বলে আগের দামে মাংস বিক্রি করে পরতা হচ্ছে না। সবখানে দাম বেড়েছে।’
সেখানে কথা হয় মাংস কিনতে আসা সওদাগরটুলার রহিম আলী বলেন, বাজার মনিটরিং না থাকায় ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছেন। তার মতে, এটা রিহার্সেল। রমজানের সরকার গরুর মাংসের দাম নির্ধারণ করে দেয়। তাই আগেই এরা দাম বাড়িয়ে নিচ্ছে।রমজানে যাতে আরেক দফা দাম বাড়ানোর সুযোগ পায়।
বন্দরবাজারের বিক্রেতারা জানান, খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকা, যা সাত দিন আগেও ৯০ টাকা ছিল। ছোট দানার প্রতি কেজি মসুর ডাল ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সাত দিন আগে ১৩৫ টাকা ছিল। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ টাকা, যা গত সপ্তাহে ১৭২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়, যা সাত দিন আগে বিক্রি হয়েছে ৫৮ টাকা।
বন্দরবাজারে আসা ক্রেতা মো. জিসান বলেন, বাজারে এখনই প্রতি কেজি ছোলা ৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত রমজানে ৮০ টাকায় কিনেছি। দুই মাস আগেও দাম ছিল ৭৫ টাকা। রোজা আসার আগেই কেজিতে ২০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সব ধরনের মাংসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এ কোন জগতে আমরা বসবাস করছি। আর কিছু জোগাড় করতে না পারলেও ডিম ভেজে ভাত খাব, এরও উপায় নেই। একটা ডিমের দাম ১৩ টাকা। বাজারে পণ্যের দাম নিয়ে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা দেখার কেউ নেই। মনে হচ্ছে, তদারকি সংস্থাগুলো অসাধু ব্যবসায়ীদের পণ্যের দাম বাড়াতে সুযোগ দিচ্ছে। আর নিত্যপণ্যের আগুনে দামে কপাল পুড়ছে ভোক্তার।
অন্যদিকে, বাজারে সবজির দামও কিন্তু খুব বেশি স্বস্তিদায়ক নয়। পেঁপে ও মুলা ছাড়া প্রায় সব ধরনের সবজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকার ওপরে। আর নতুন পটল, বরবটি, করলা বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকার ওপরে।