২১ নভেম্বর ২০২২


সখের বসে সবজি চাষে স্বাবলম্বী স্কুল ছাত্র ইমরান

শেয়ার করুন

দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : স্কুলের আঙ্গিনায় এখনো দূরন্তপনার সময়। নবম শ্রেণির ছাত্র এখন আর প্রাইভেটের টাকার জন্য চিন্তা করতে হয় না। বই, খাতা ও স্কুলের বেতনের টাকাও খুজতে হয় না বাবার কাছে। বাবার কাছে শিখেছে, কীভাবে সবজি চাষ করতে হয়। সেভাবে সবজি চাষ করে এখন সে বাবাকে সহযোগীতার পাশাপাশি নিজের লেখাপড়ার খরচ বহন করছে। পুষ্টির জোগানও দিচ্ছে পরিবারের সদস্যদের।

বিগত করোনাভাইরাসের কারণে দেশের স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় সেসময় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরাই পড়াশোনা বাদ দিয়ে খেলাধুলা, আড্ডা কিংবা হাতে থাকা স্মার্ট ফোন নিয়ে ব্যাস্ত দিন কাটিয়েছে। আবার অনেক শিক্ষার্থীরাই নিজেদের সময় নষ্ট না করে পরিবারকে সাহায্য করতে বিভিন্ন চাকরি করছেন। উপার্জন করে মা-বাবার কষ্ট কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছেন। এমনই একজন দোয়ারাবাজারের ইমরান আহমদ।

করোনাকালে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় কৃষি কাজে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন ইমরান। এখন প্রতিদিন সে ভোরে উঠে সবজি জমিতে পরিচর্যা করেই সে স্কুলে যাচ্ছে। স্কুল থেকে এসে বিকালের ফ্রি থাকায় সময় টুকোও কাটাচ্ছে সবজির খেতে। প্রতিদিন সবজির বাজার উঠানামা করার খুঁজ খবর ও নিচ্ছে। তাই সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হয় তাকে। ইমরান আহমদ উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের ঘিলাছড়া স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেনীর শিক্ষার্থী। সে তেরাপুর গ্রামের রজব আলীর ছেলে।

প্রথমে তার পিতার কৃষি কাজেই সময় দিয়েছেন তিনি। পরে নিজেই কয়েক শতাংশ জমিতে করলা, শসা, বেগুন, ধুন্দল,লাউ,মোলা,শিম,আলুসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ করছেন এই শিক্ষার্থী। এখান থেকে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করছেন পাইকারি ও গ্রামের খুচরা বাজারে। স্কুল বন্ধ থাকায় অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে ‘সমন্বিত কৃষি উদ্যোগ’ নিয়ে কৃষিকাজ করছেন ইমরান আহমদ নামের এই নবম শ্রেনী পড়ুয়া শিক্ষার্থী। এতে একদিকে পরিবারের চাহিদা মিটছে অন্যদিকে উৎপন্ন ফসল বিক্রি করে মিলছে আর্থিক সচ্ছলতাও। শিক্ষার্থী ইমরান আহমদ বলেন, সপ্তম শ্রেনীতে পড়া অবস্থায় করোনা মহামারির দেখা দেয়,

করোনাকালীন সময়ে স্কুল বন্ধ হয়ে যায় । দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পর যখন বুঝতে পারি যে স্কুল খোলার কোনো সম্ভাবনা নেই। তখন কোনো একটা উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করি। ঠিক তখন পিতার কৃষি কাজে সহযোগিতা করার পাশাপাশি নিজেই বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ শুরু করতে শুরু করি। আমি এখন ক্লাস নাইনে পড়ি এখনো আমার সবজি চাষ করা অব্যাহত রয়েছে। এই কাজে আমার মা-বাবা,চাচা ও ছোট বোন সময় দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করছেন। গত বছর এই সময়ে সবজি বাজার তুলনামূলক ভালো থাকায় এখান থেকে সাফল্য পেয়েছি অনেকটাই এবং আরও বড় সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখছি এবারও।

তিনি আরো জানান, কাজ কোনটায় ছোট নয়,আমার বাবা একজন কৃষক। আমি গর্বিত একজন কৃষকের ঘরে জন্ম নিয়ে। আমি মনে করি কৃষিকাজ করা এটা একটা সেবার মধ্যে পরে। আমি একজন শিক্ষার্থী, আমার কাজ লেখাপড়া করা। স্কুল বন্ধ থাকায় আমি চাইলেই এই অবসর সময়টা এমনি এমনি কাটাতে পারতাম। কিন্তু তা না করে সময়কে কাজে লাগিয়ে সমাজের সেবাসহ অর্থ উপার্জন করছি। এতে আমার পরিবারের সদস্যরাও অনেক খুশি।

ইমরান আহমদের বাবা বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের সময় ফোয়ার স্কুল বন্ধ আছিল অনেখ দিন। আগে নিজে এখলাউ ক্ষ্যাত-খামার খরতাম। কিন্তু ফোয়ার স্কুল বন্ধ থাকার সময়টা আমারে সহযোগীতা খরছে। হে চাইলে আন্তাজি সময় খাটাইতে পারতো,কিন্তু তা না খইরা হে কাজে মন দিলাইছে। অ্যারপর থাকিন ফোয়াটাউ কাজখামো সাহায্য খরের। পরতাকিন ওউ এখলাউ চেষ্টা করের পুরা ক্ষ্যাত খরতো। পুরল, করলা, বেগুন, মরিচ, লাউ,উড়ি লাগাইছে নিজের ইচ্ছামতো। ভালো দামে হে ইগুন আবার বেঁচার ও চেষ্টা খরের। এলাকার অন্য ফোয়াইন্তোর মতো বাইরে ঘোরাফেরা না খইরা সংসার সামলার। ওউটাউ আমার লাগিন অনেখ।

দোয়ারাবাজার উপজেলা কৃষি অফিসার শেখ মোহাম্মদ মহসিন আলী খোলা কাগজকে বলেন, ‘ উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নে নবম শ্রেনীতে পড়ুয়া এক স্কুল শিক্ষার্থীর সবজি চাষের সফলতার খবর শুনেছি। আমরা তার সাথে যোগাযোগ করে কৃষি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগীতাসহ দিকনির্দেশনা দিবো। তিনি আরও বলেন, নবম শ্রেনীতে পড়ুয়া শিক্ষার্থী ইমরান আহমদের উদ্যোগটি খুব ভালো উদ্যোগ। এটাকে আমরা স্বাগত জানাই।

শিক্ষার্থীর এই উদ্যোগে একদিকে তার পরিবারের পুষ্টির চাহিদা সে পূরণ করেছে। পাশাপাশি অর্থিক ভাবে সে ও তার পরিবার স্বচ্ছল হয়েছে। নতুন নতুন শিক্ষিত ছেলেরা যদি কৃষিতে আসে তাহলেতো কৃষি আধুনিক হবে। আমরা যে কৃষিকে আধুনিক বলি, আধুনিকের মূল বিষয়টা আসলে শিক্ষিত এই লোক যারা কৃষিতে আসে। তাহলে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও জাত সহজেই তারা নিতে পারবে।

শেয়ার করুন