৩১ অক্টোবর ২০২২


কতটা খাদ্য সঙ্কটে পড়বে বাংলাদেশ?

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : করোনা মহামারি এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মধ্যে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সঙ্কটের আভাস দিচ্ছে বিশ্ব সংস্থাগুলো। সত্যিই খাদ্য সংকট দেখা দিলে গত তিন বছরের মতো আগামী বছরটাও এই পৃথিবীর মানুষের জন্য দুঃসংবাদের, তা নিয়ে শংকিত সবাই।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী বারবার দুর্ভিক্ষের শঙ্কার কথা বলে সতর্ক করছেন দেশবাসীকে। তেমন বিপদ যদি এসেই পড়ে তা সামাল দিতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ, সেই প্রশ্নও জনমনে।

দেশে গত কয়েক বছরে বাড়তে থাকা বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার ইতোমধ্যে নিম্নমুখী। অন্যদিকে বিশ্বে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার ভিতর দেশে চলছে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং। আর জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে বাজার হয়ে চলে গেছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা খাদ্য সঙ্কটের যে ঝুঁকির কথা বলছে, তাতে আছে বাংলাদেশের নামও।

যদিও সহসা খাদ্য সংকট তৈরির স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত সরকারের কোনো সংস্থার পরিসংখ্যানে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়নি। বরং কৃষিমন্ত্রী বলছেন, সামনে ধানের মৌসুম। ফলে আমাদের আতঙ্কটা একটু কম।

তবে বিশ্ব অর্থনীতির সার্বিক সঙ্কটে মূল্যস্ফীতি বহু বছর পর এখন ৯ শতাংশের উপরে থাকছে। ফলে নিম্ন আর মধ্যবিত্তের সংসার সামলাতে নাভিশ্বাস উঠেছে। সরকারি হিসাবে, দেশের মানুষের জন্য বছরে তিন কোটি ৫০ লাখ টন চাল এবং ৫০ থেকে ৬০ লাখ টন আটা লাগে। চালের প্রায় শতভাগ এবং গমের ১০ শতাংশের মত দেশীয় জোগান থেকে আসে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো কারণে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হলে তখন চাল আমদানি করতে হয়।

বর্তমানে সরকারি গুদামে মজুত প্রায় ১৬ লাখ টন খাদ্যের মধ্যে চাল প্রায় ১৪ লাখ টন, গম এক লাখ ৮০ হাজার টন। আর গুদামে ধান আছে ২০ হাজার টন। চলতি আমন মৌসুমে এক কোটি ৫৯ লাখ টন চাল পাওয়ার আশা থাকলেও ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এসে কিছু ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। তবে সেই ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। সংম্লিষ্টরা বলছেন, জরুরি প্রয়োজনে সরকার চাল আমদানির কিছু প্রস্তুতি ইতোমধ্যে নিয়ে রাখলেও তাতে রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশে চাল-আটাসহ খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লেও সেটা খাদ্যাভাবে গড়ানোর মতো পরিস্থিতি এখনও হয়নি বলে মনে করেন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক। খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে আগামী বছর থেকে সারাদেশের কৃষিজমিকে ব্লকে ভাগ করে চাষাবাদ তদারকের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আমদানিনির্ভর বেশ কয়েকটি ভোগ্যপণ্যের দাম গত কয়েক মাসে লাগামহীনভাবে বেড়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা। এছাড়া ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, প্রসাধনী, জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মত পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় জনজীবনে চাপ আরও বেড়েছে।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থার নিয়মিত সাময়িকীতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বিশ্বের ৪৫টি দেশে বাড়তি খাদ্য আমদানির প্রয়োজন হওয়া দেশের মধ্যে ৩৩টিই আফ্রিকার। বাংলাদেশসহ এশিয়ার ৯টি দেশেরও নাম রয়েছে ওই তালিকায়।

তবে চালসহ মৌলিক খাদ্যের বেশিরভাগই দেশীয় জোগাননির্ভর হওয়ায় সরবরাহ নিয়ে আগামী কিছুদিন বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা কিছুটা কম। তেমনটিই মনে করছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট-পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে দেশের চাহিদার ৯৫ শতাংশ ধান-চালের জোগান দেশীয় কৃষিক্ষেত্র থেকেই আসে। আর কিছুটা সঙ্কট দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ চাল আমদানি করতে হয়।’

যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশেও তা বাড়িয়েছে সরকার। জ্বালানি সঙ্কট আর ডলার বাঁচাতে গত জুলাই থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে, ভুগতে হচ্ছে শিল্প খাতকে।’

সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় গত তিন মাস ধরেই বাংলাদেশে চাল-আটার বাজার ঊর্ধ্বমুখী। অবশ্য এই ঊর্ধমুখী প্রবণতাকে অযৌক্তিক বলেই মনে করছে সরকার। সম্প্রতি চাল-আটার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।

সরকারি সংস্থা টিসিবির বাজার মনিটরিং সেলের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে দেশের খুচরা বাজারে প্রতিকেজি আটার প্যাকেট ৬০ টাকা ও ময়দার প্যাকেট ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দাম একবছর আগের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। একইভাবে বাজারে সরু চাল প্রতিকেজি ৭৫ টাকা, মাঝারি মানের চাল ৫৬ টাকা এবং মোটা চাল ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চালের দামও এক বছর আগের তুলনায় ১০ শতাংশের মতো বেড়েছে।

বিশ্ব আগামী বছর ‘দুর্ভিক্ষের মত খারাপ পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে পারে বলে সতর্ক করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে দেশবাসীকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

শেয়ার করুন