১ অক্টোবর ২০২২
আজকের সিলেট ডেস্ক : বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের আপত্তির মুখেও ইভিএমে (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) অনঢ় থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানোর বিষয়ে চমক দেখানোর কথাও বলছে ইসি। অন্যদিকে ইভিএম এবং সরকারের অধীনে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে রাজনীতির মাঠে সরব রয়েছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশন ইভিএমের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। সব মিলিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির ময়দান এখন সরগরম হলেও ইভিএম পদ্ধতি মেনে বিরোধীমতের রাজনৈতিক দলগুলো কি আদৌ নির্বাচনে যাবে, তৈরি হয়েছে সে প্রশ্নও।
তবে ইভিএমের বিরোধিতাকারী কোনো কোনো রাজনৈতিক দলে নির্বাচনে যাওয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ও সংশয় থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের পথেই হাঁটছে দলগুলো। নির্বাচন কমিশনের সংলাপে ইভিএমের বিরোধিতা করা এবং সংলাপে অংশ না নেওয়া দলগুলোর বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন আভাসই পেয়েছে ঢাকাটাইমস। ইভিএমের বিরোধিতা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ফিরিয়ে আনাসহ ইসিকে কিছু শর্ত দিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করলেও ভেতরে ভেতরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এসব দল। ঢাকা টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে কোনো রাজনৈতিক দলই নির্বাচন বয়কটের কথা বলেনি। তারা বলছে, নির্বাচন ব্যবস্থা ও পদ্ধতি সংস্কারের কথা।
এমন পরিস্থিতিতে ইভিএমের বিরোধিতা করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। নির্বাচন কমিশনের সংলাপেও অংশ নেয়নি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা এই দলটি। বিএনপির দাবি সরকার বা নির্বাচন কমিশন মেনে না নিলে বিএনপি কি নির্বাচনে যাবে?
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের একটাই দাবি, এ সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়।’ তাহলে কি বিএনপি নির্বাচন বর্জন করবে? এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাব না বলেছি, বর্জনের কথা বলছি না। আমরা বলেছি, সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে নির্বাচনে যাব।’
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, ‘দেশের বেশিরভাগ মানুষ মনে করে, ইভিএম হচ্ছে কারচুপির মেশিন।’
তবে ইভিএম পদ্ধতি বহাল থাকাসহ জাতীয় পার্টির দাবি নির্বাচন কমিশন না মানলে নির্বাচন বর্জন করার বিষয়ে ষ্পষ্ট করে কিছুই বলছেন না জিএম কাদের। তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই জাতীয় পার্টি ইভিএমের বিরোধিতা করে আসছে।’
ইভিএমে ভোট হলে জাপা নির্বাচন বর্জন করবে কিনা, সে বিষয়ে জিএম কাদের বলেন, ‘সেটি দলীয় ফোরামে আলোচনা করে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে।’
তবে ইভিএম বা সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিরোধিতা করে মাঠে-ময়দানে সরব থাকলেও জাতীয় পার্টি নির্বাচনের দিকেই হাঁটছে। ইতোমধ্যেই দলটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কি থাকবে, না থাকবে তা প্রস্তুত করার বিষয়ে ভাবছে। ভোটরদের আকৃষ্ট করতে নতুন কৌশল নেয়ার বিষয়ে ভাবনা রয়েছে জাতীয় পার্টির।
নির্বাচন কমিশনের সংলাপে অংশ নিয়ে ইভিএমের বিরোধিতা করা বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আমরা ইভিএমের বিষয়ে কিছু শর্ত দিয়েছিলাম। কিন্তু সেসব শর্ত পূরণ হয়নি।’
সেক্ষেত্রে ওয়ার্কার্স পার্টি নির্বাচনে যাবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওয়ার্কার্সপার্টি নির্বাচন ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। ওয়ার্কার্স পার্টি নির্বাচনের দিকেই হাঁটছে।’ আর দাবিগুলোর বিষয়ে আবার কথা বলবেন বলেও জানান রাশেদ খান মেনন।
নির্বাচন কমিশনের সংলাপে ইভিএম পদ্ধতির বিরোধিতা করা বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ধারাবহিকতা রক্ষার স্বার্থে বাংলাদেশ ন্যাপ ইসির কাছে ইভিএমবিরোধী প্রস্তাব দিয়েছে। রোডম্যাপ ঘোষণা পরবর্তী সংলাপ করার কথা ছিল নির্বাচন কমিশনের। সেই অপেক্ষায় আছি। তখনও ইভিএম নিয়ে একই কথাই বলবো।’
তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচনমুখী দল। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ ইভিএম বিষয়ক দাবি ইসি মেনে না নিলেও দলটি নির্বাচন থেকে সরবে না বলে আভাস পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ইসিকে ইভিএম তথা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিষয়ে কিছু শর্ত দেওয়া রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টি- এনপিপির চেয়ারম্যান শেখ ছালাউদ্দিন ছালু বলেন, ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই গণতন্ত্র বিকাশের একমাত্র হাতিয়ার। সেক্ষেত্রে এনপিপি নির্বাচনমুখী দল। আমরা ২০০-৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা ভাবছি।’ শর্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা শর্ত দিয়েছিলাম যে, প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে ভোট গণনার পরই কেন্দ্রের ফলাফল শিটের একটি কপি প্রিজাইডিং অফিসার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশন ও প্রার্থীদের এজেন্টদের কাছে দিবে সইস্বাক্ষর করে।’ মোটকথা তাদের দাবি ইসি মানুক আর না মানুক দলটি নির্বাচনের দিকেই হাঁটছে।
এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সরকারের অধীনে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটে যাওয়া না যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কয়েকটি দল মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে তারাও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
এদিকে ইভিএমের পক্ষে জনমত গড়তে প্রচারণা চালাতে মাঠে নেমেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলছেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। তত্ত্বাবধায়ক আর ফিরে আসবে না।’
সংবিধানে সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে গতকাল এক অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না।’
প্রসঙ্গত, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হবে ২০২৩ সালের নভেম্বর মাস থেকে। আইন অনুযায়ী ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে ইসিকে। ইতমধ্যেই নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে ইসি। সেজন্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ, সীমানা পুনঃনির্ধারণসহ নিজেদের কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে ব্যস্ত সময় পার করছে নির্বাচন কমিশন। তবে নির্বাচন কমিশন নিজেদের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ শুরু করলেও কমিশনের উপর আস্থা নেই বেশিরভাগ দলের। তবুও নির্বাচন থেকে সরে যেতে চাচ্ছেন না তারা। ইসির প্রতি আস্থাহীনতার চাপাক্ষোভ ভেতরে নিয়েই নির্বাচনমুখী হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো।
অন্যদিকে দেশে গত পাঁচ বছরে ইভিএমে মোট ৭৯১টি নির্বাচন হয়েছে। তবে ইভিএম নিয়ে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের সংশয়, সন্দেহ ও অবিশ্বাস দূর হয়নি। পাঁচ বছর আগেও ইভিএম নিয়ে বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের যে অবস্থান ছিল, এখনো তা একই আছে। বরং ক্ষেত্রবিশেষে ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। বর্তমান ইসির অধীনে ১৩০টি নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার করা হয়। এসব নির্বাচনে বেশি আলোচনা হয়েছে ভোটকক্ষে (বুথ) ‘ডাকাতের’ উপস্থিতি, ইভিএমে ভোট নিতে দেরি হওয়া, আঙুলের ছাপ না মেলার মতো বিষয়। এর ফলে ইভিএমের গ্রহণযোগ্যতা আরও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।