৩ সেপ্টেম্বর ২০২২
অতিথি প্রতিবেদক : সিলেটে সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হচ্ছে ৫৬.৫৪ শতাংশ সেবাগ্রহীতা বা পরিবার। গেল বছরে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সিলেটের প্রতিটি পরিবারকে গড়ে দুই হাজার ৫৮০ টাকা করে ঘুষ দিতে হয়েছে। মোট ১৭টি সেবা খাতে এই ঘুষের টাকা দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। এ সময় সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হলেও সিলেটে দুর্নীতির সবচেয়ে বড় আখড়া হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বিআরটিএ সেবাখাত।দুর্নীতিগ্রস্থ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে সিলেট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস।আর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
টিআইবির প্রতিবেদনে সিলেটসহ দেশের আটটি বিভাগে মোট ১৭ ধরনের সেবা খাতের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়। এই দুর্নীতির সময়কাল ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এসব দুর্নীতির মধ্যে রয়েছে ঘুষ, জোরপূর্বক টাকা আদায়, প্রতারণা, দায়িত্বে অবহেলা, স্বজনপ্রীতি, সময়ক্ষেপণসহ বিভিন্ন হয়রানি।
টিআইবির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সিলেট বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৭৮.১৮ শতাংশ মানুষ বিআরটিএ’র সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন।পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ৭২.১৪ শতাংশ মানুষ । ৬০.৯৪ শতাংশ মানুষ দুর্নীতির শিকার হয়েছেন আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী সংস্থা থেকে সেবা নিতে গিয়ে।
অন্যদিকে, সিলেটে টিআইবির জরিপে অংশগ্রহণকারী ৫১.১২ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তায়, ৪৭.৩২ শতাংশ উত্তরদাতা বিচারিক সেবায়, ৪০.২৫ শতাংশ উত্তরদাতা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এছাড়া সিলেটের ২১.৩২ শতাংশ উত্তরদাতা স্বাস্থ্যে, ২১.৮১ শতাংশ উত্তরদাতা ভূমি সেবায়, ১৫.০২ শতাংশ উত্তরদাতা বিদ্যুত সেবায়, ১৭.৮২ শতাংশ উত্তরদাতা শিক্ষায়, ৩৩.৬১ শতাংশ কৃষিতে, ১৮.৬১ শতাংশ কর ও শুল্কে, ৭.৫১ শতাংশ এনজিওতে, ২০.৩২ শতাংশ গ্যাসে, ৫১.১২ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তায়, শুন্য.৯২ শতাংশ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে এবং ২.২১ শতাংশ অন্যান্য ক্ষেত্রে সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হওয়ার কথা বলেছেন।
সিলেটে ২০২১ সালে বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে খানা বা পরিবারকে গড়ে ২ হাজার ৫৮০ টাকা করে ঘুষ দিতে হয়েছে বলে হিসাব দিয়েছে টিআইবি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটে গত বছর ২৬. ৭০ শতাংশ খানা বা পরিবার ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেন করতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৪ শতাংশ খানা ঘুষ দিয়েছে পাসপোর্ট সেবার জন্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষেত্রে ৪৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং বিআরটিএ সেবার জন্য ১৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ খানা বা পরিবার ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ১৮.৩২ শতাংশ উত্তরদাতা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে, ১.১১ শতাংশ উত্তরদাতা বিচারিক সেবায়, ১২.২৫ শতাংশ উত্তরদাতা ভূমি সেবায়, ৭.৪০ শতাংশ উত্তরদাতা শিক্ষায়, ১৬.০৭ শতাংশ কর ও শুল্কে, .৭৮ শতাংশ উত্তরদাতা বিদ্যুৎ সেবায়, ৪.৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা স্বাস্থ্যে, ১০.৭৬ শতাংশ গ্যাসে, ৬ শতাংশ ইন্সুরেন্সে, .৩৬ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগে, .৩৯ শতাংশ অন্যান্যে, .৩১ শতাংশ এনজিও এবং ১৩.৫৬ শতাংশ কৃষিসেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই মনে করেন, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। তারা ঘুষ দেন মূলত হয়রানি বা ঝামেলা এড়াতে।
দুর্নীতির শিকার হলেও তা নিয়ে অভিযোগ করেননি সিলেটে ৭০ দশমিক ৭১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। তাদের বেশিরভাগই অভিযোগের দিকে যাননি মূলত ঝামেলা বা হয়রানির ভয়ে। সবখানেই দুর্নীতি- তাই অভিযোগ করার প্রয়োজনবোধই করেননি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অংশগ্রহণকারী। অভিযোগ না করার অন্য সব কারণের মধ্যে রয়েছে- অভিযোগ করে কাজ হয় না, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা নেই, কিভাবে অভিযোগ করতে হয় জানা নেই। তবে এরপরও যারা অভিযোগ করার পথে হেঁটেছেন, তাদের ৬২ দশমিক ৭০ শতাংশ অভিযোগের ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
টিআইবির জরিপে দেখা গেছে, সিলেট বিভাগে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন পুরুষই বেশি ৫৭.০৩ শতাংশ। নারীর ক্ষেত্রে এই হার ৫৪.১৬ শতাংশ। এর মধ্যে সিলেটে পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ৫১.৬ শতাংশ পুরুষ ও ৭০.৭ শতাংশ নারী। বিআরটিতে অবশ্য ১০০ শতাংশ পুরুষই দুর্নীতির শিকার হয়েছেন, নারী ৭৭.৬ শতাংশ। আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী সংস্থা থেকে সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ৫০.৪ শতাংশ পুরুষ ও ৬০.২ শতাংশ নারী। জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ৪৮.৩ শতাংশ পুরুষ ও ৫৬.৫ শতাংশ নারী, কৃষি সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ৪০.৮ শতাংশ পুরুষ ও ৩২.৯ শতাংশ নারী।স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সেবাগ্রহণে ৩২.২ শতাংশ পুরুষ ও ৩৬.৭ শতাংশ নারীই দুর্নীতির শিকার হয়েছেন।অন্যদিকে সিলেটে বিচারিক সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির কবলে পড়েছেন ৯.৮ শতাংশ পুরুষ ও ৩৭ শতাংশ নারী।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটে গেল বছরে ৫৬ থেকে ৬৫ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি (৪২.২৬ শতাংশ) দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এর পর ৩৫.৬৭ শতাংশ রয়েছেন ৪৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সীরা।৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সীরা ৩২.৯৪ শতাংশ, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা ২৭.৬৬ শতাংশ এবং ৬৫ বছর বয়সীরা ২২ দশমিক ৭৬ শতাংশ দুর্নীতির শিকার হয়েছেন।তবে ১৮ বছরের নিচের বয়সীরা তুলনামূলক কম (১৪.৩ শতাংশ) দুর্নীতির শিকার হয়েছেন।
টিআইবির পরিচালিত জরিপের সময়ে সিলেট বিভাগের চার জেলায় শহরের চেয়ে বেশি ঘুষের শিকার হয়েছেন গ্রামের মানুষ।শহরের প্রতিটি পরিবারকে গড়ে দুই হাজার ১৩৭ টাকা করে ঘুষ দিলেও গ্রামের প্রতিটি পরিবারকে ৩ হাজার ৩২৫ টাকা করে ঘুষ দিতে হয়েছে।সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে গিয়ে শহরে ৫২.৬১ শতাংশ এবং গ্রামে ৫২.৫৩ শতাংশ সেবাগ্রহীতা বা পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ করা হলেও ৬২ দশমিক ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
টিআইবির পরিচালিত জরিপে ২০২১ সালে সিলেটে সাধারণ মানুষের তুলনায় শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধিতা রয়েছে এমন খানাগুলোও বেশি ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হয়েছে।এই হার ৬৮.৮৭ শতাংশ।