৩ সেপ্টেম্বর ২০২২
আজকের সিলেট ডেস্ক : গঙ্গা চুক্তির ২৬ বছর পর কুশিয়ারা নদীর পানিবণ্টন বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর (এমওইউ) হতে যাচ্ছে। তবে তিস্তার বিষয়েও আশা ছাড়েনি সরকার। ভারতের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাগড়ায় থেমে যাওয়া তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন করতে রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা হচ্ছে।
এদিকে, ভারত তিস্তা মহাপরিকল্পনা আগ্রহী বলে জানা যাচ্ছে। তারা যদি আগ্রহ প্রকাশ করে বা অফার করে তাহলে এটা বাংলাদেশ সরকার বিবেচনা করবে।
কুশিয়ারা নদীর পানি নিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন বিষয়ক দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরে কুশিয়ারা স্মারক সই হওয়ার পাশাপাশি তিস্তার বিষয়ে একটি সমাধান আসতে পারে।
কুশিয়ারা চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তিও বাস্তবায়িত হবে। সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ফেনী নদী থেকে ভারত পাবে ১.৮২ কিউসেক পানি এবং কুশিয়ারা থেকে বাংলাদেশ পাবে ১৫৩ কিউসেক পানি।
এক কিউবিক (কিউসেকের একক) মানে ২৮.৩১৭ লিটার। এটি পানির প্রবাহকে বোঝায়। সে হিসাবে এক কিউসেক পানি মানে কোনো বাঁধ বা জলাধার থেকে সেকেন্ডে এক কিউবিক পানি প্রবাহিত হওয়া। কুশিয়ারা থেকে বাংলাদেশ প্রতি সেকেন্ডে পাবে ৪৩৩২.৫০১ লিটার আর ফেনী নদী থেকে ভারত প্রতি সেকেন্ডে পাবে ৫২.৬৬৯৬২ লিটার পানি।
বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, যৌথ নদী কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিস্তা চুক্তির বিষয়ে হাল ছেড়ে দেয়নি বাংলাদেশ। ভারতও তিস্তাবিষয়ক মহাপরিকল্পনা গ্রহণের পক্ষে। কিন্তু এ চুক্তির বিষয়ে এখন পর্যন্ত একমাত্র বাধা পশ্চিমবঙ্গের মুূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। খোঁজা হচ্ছে রাজনৈতিক সমাধানও। শেখ হাসিনার আসন্ন সফরে এ বিষয়ে একটি ফল পেতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
তিস্তার পানির বিষয়ে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে শিগগিরই এর একটি সমাধান দেখতে পাব। তিস্তার পানি বণ্টনের চুক্তি প্রস্তুত ছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আপত্তির কারণে তা স্বাক্ষরে বিলম্ব হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এটা আলোচনা ও পর্যালোচনা করছে জানিয়ে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, আভাস পেয়েছি যে, ভারত এ ব্যাপারে (তিস্তা মহাপরিকল্পনা) আগ্রহী। তারা যদি আগ্রহ প্রকাশ করে বা অফার করে তাহলে তখন এটা সরকার বিবেচনা করবে। দুই দেশই ইস্যুগুলো সমাধানে তৎপর হবে বলে আশা প্রকাশ করে জাহিদ ফারুক।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১২ বছর পর সম্প্রতি যৌথ নদী কমিশনের সচিব ও মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকটি আন্তরিক পরিবেশে সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবছর বৈঠক করার আশা ভারতের। দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসবে।
কুশিয়ারা নদীর ১৫৩ কিউসেক পানি পাবে বাংলাদেশ। ছয়টি নদীর পানিবণ্টন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আরও আটটি নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনায় আছে। বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া হিমালয় থেকে প্রবাহিত নদীর অন্তর্বর্তী নদীসংযোগ করবে না ভারত। বন্যার বিষয়ে ৫ দিন আগেই পূর্বাভাস জানাবে ভারত।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ফেনী নদীর পানি মানবিক কারণে বণ্টনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের। এছাড়া ভারত থেকে প্রবাহিত নদীগুলোর দূষণ রোধে ব্যবস্থা নেবে দুই দেশ।
কত সময়ের জন্য কুশিয়ারা সমঝোতা স্মারক করা হচ্ছে, জানতে চাইলে যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মাহমুদুর রহমান বলেন, আমরা লাইফটাইম চেয়েছিলাম। কিন্তু ভারত ১৫ বছরের জন্য করতে চায়। দেখি আলোচনায় কী হয়।
ভারতের জলমন্ত্রীর (পানিসম্পদ) বাংলাদেশ সফরের যে কথা রয়েছে, ওই সফরে কি তিস্তার কোনো সমাধান আসতে পারে, নাকি প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মাহমুদুর রহমান বলেন, সব কথা আগাম বলা ঠিক হবে না। তিস্তার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করছেন একটি সমাধানে পৌঁছার জন্য।
কুশিয়ারা চুক্তি হলে বাংলাদেশ কতটা সুবিধাভোগী হবে, এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবীর বলেন, চুক্তিই শেষ কথা নয়। এই চুক্তির অধীনে মানুষ সুবিধা পাচ্ছে কি না নাকি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে- তা যাচাইয়ে দুই দেশের একটি যৌথ মূল্যায়ন কমিটি থাকা দরকার। অ্যাসেসমেন্ট করা দরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুশিয়ারা নদীর পানিও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তি অনুযায়ী ভারত যেন পরবর্তীতে কথা রাখে তাও নিশ্চিত করা জরুরি।
ক’টনীতিকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরে তিস্তার বিষয়ে একটি রাজনৈতিক সমাধান আসতে পারে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার অগ্রগতিও হতে পারে।
অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এক দীর্ঘমেয়াদি অমীমাংসিত ইস্যু। দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে একমাত্র গঙ্গা নদীর পানির বণ্টনের চুক্তি স্বাক্ষর হলেও তিস্তাসহ আলোচনায় থাকা ৮টি নদীর পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।
গঙ্গা চুক্তি অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দুই দেশ চুক্তিতে উল্লেখিত ফর্মুলা অনুযায়ী পানি ভাগাভাগি করে নেবে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, নদীতে ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম পানি থাকলে দুই দেশ সমান সমান পানি ভাগ করে নেবে। পানির পরিমাণ ৭০ হাজার কিউসেক থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে ৪০ হাজার কিউসেক পাবে বাংলাদেশ। অবশিষ্ট প্রবাহিত হবে ভারতে।
১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান একটি বহুব্যাপী বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী জলসম্পদ বণ্টন, সেচ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় নিয়ন্ত্রণের মতো সাধারণ বিষয়গুলোর জন্য একটি যৌথ নদী কমিশন গঠন করা হয়।