২৩ আগস্ট ২০২২


সংলাপের প্রস্তাব নিয়ে ইসির কৌশলী সিদ্ধান্ত

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যে ধারাবাহিক সংলাপ করেছিল, সেখানে তাদের পক্ষ থেকে ইসিতে দেওয়া প্রস্তাবগুলো থেকে দশটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ইসির দেওয়া ওই দশ সিদ্ধান্তের মধ্যে দলগুলোর পক্ষ থেকে আসা মোটাদাগে প্রধান প্রধান দাবিগুলোর বেশির ভাগই গুরুত্ব পেয়েছে। তবে ইসির নেওয়া এসব সিদ্ধান্তকে কৌশলী বলে উল্লেখ করছেন অনেক রাজনীতি বিশ্লেষক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। ইসি সংলাপে প্রধান যে বিষয়টি সামনে এসেছিল আগামী নির্বাচন ইভিএমে হবে কি না। বেশির ভাগ দলই ইভিএমর বিরোধিতা করেছে।

ইসি সূত্রে জানা যায়, জাতীয় পার্টিসহ ১৫টি দল ইভিএমের বিপক্ষে প্রস্তাব রেখেছে। এমনকি সংলাপে অংশ না নেওয়া বিএনপিও ইভিএমের বিষয়ে একই বক্তব্য রেখে আসছে। ইভিএমের বিষয়ে সিদ্ধান্তটি গুরুত্ব দিচ্ছে ইসি, তবে নির্বাচনে ইভিএম থাকবে কি না সেই বিষয়টি এখনও জানায়নি।

রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকারে অধীনে নির্বাচন হওয়ার দাবিটিও জোরেশোরে উচ্চারিত হয়। ইসির নেওয়া ১০ সিদ্ধান্তে তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকারের বিষয়টিও উঠে এসেছে। তবে এই বিষয়ে সংবিধান ও রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ইসি। অপরদিকে কমিশনের যে ক্ষমতা, তা পরিপূর্ণ ব্যবহারে সুযোগ পেলে ইসি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে বলেও জানায়।

এছাড়া সবগুলো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইসি সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলেও জানায়। ভোটকেন্দ্রে বিদেশি পর্যবেক্ষক রাখা, প্রতিটি কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খরা বাহিনী মোতায়েন রাখা, অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিল করার মতো প্রস্তাবও ইসির দশ সিদ্ধান্তে উঠে এসেছে। তবে নির্বাচনকালীন সরকারে বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার কথাও জানিয়েছেন তারা। ইসির এসব সিদ্ধান্তকে অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞই ‘কৌশলী সিদ্ধান্ত’ বলে উল্লেখ করছেন। তার মনে করছেন, ইসি যে দশ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে তা সবই বাস্তবায়ন হলে ভালো, তবে এসব বাস্তবায়নের পথে ইসি হাঁটবে কি না সন্দেহ তাদের।

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া ২৮ দল এবং অংশ না নেওয়া ৯টি দলের পক্ষ থেকে কমিশনে ও কমিশনের বাইরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশেষ যে দাবি বা প্রস্তাবগুলো উঠেছিল তার বেশির ভাগই এসেছে ইসির দেওয়া ১০ সিদ্ধান্তে। তবে এসব বিষয়ে কমিশন কি সিদ্ধান্ত নেবে তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী জাতীয় নির্বাচন কেমন হচ্ছে।

এই বিষয়ে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন যাদের মতামত নিয়েছেন তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। গণমাধ্যমে তারা তাদের পরিচয় জানান দিয়েছে। মেজোরিটির কথা না শুনে মতামত নিয়ে কী লাভ?’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন কখনো কখনো বলেছে বিএনপি না এলে পায়ে ধরবে না। নির্বাচন কমিশন কীভাবে এমন কথা বলে! তবে বিএনপি না এলে কী অসুবিধা হবে, সেটা নিয়ে তার কোনো কথা বলছে না। আবার একতরফা নির্বাচন করবে কি না সেটা তাদের ব্যাপার।’

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ইসিতে এখন যারা আছে তার আমলাদের মতো কথা বলেন, আমলাদের মতো করে কমিশন চলাতে চাচ্ছেন। জনগণের সঙ্গে তাদের কোনো কানেকশন নেই। চেষ্টাও করেননি। ইভিএম ভোট হলে শুধু রুম ক্যাপচার করলেই হয়। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ ইভিএমে ভোট দিতে পারে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের জন্য ইভিএমে ভোট কঠিন। আগের দুটো নির্বাচন নিয়ে বিশ্লেষণ করতে বলেছিলাম। তাদের সংলাপগুলে ক্লাসরুমের মতো।

অনেক দল আছে যাদের ১৫০ থেকে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার সক্ষমতা আছে কিন্তু তাদের সঙ্গে ইসি সংলাপ করছে না- এ কথা উল্লেখ করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘অন্তত ৫০ শতাংশ ভোটারের কথা কমিশন ভাবছেই না। তাদের কথা চিন্তা করা উচিত। আমরা ইউনিয়ন পর্যায়ে গিয়েছি, তাদের মতামত দেখেছি। কিন্ত ইসি জনগণের কথা শুনছে না।’

নির্বাচন কমিশনের নেওয়া দশ সিদ্ধান্তের ইসি বেগম রাশেদা সুলতানা বলেন, ‘আমরা যে দশটি সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছি সেগুলো কীভাবে কাজ করবে কতটুকু করবে সেসব বিষয়ে এখনও কোনো কথা হয়নি। দ্বাদশ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে কি হবে না এই বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়া নির্বাচনকালীন সরকার থাকবে কি থাকবে না এসবও আলোচনার পর্যায়ে, কোনো সিদ্ধান্তই এখনও গ্রহণ করা হয়নি।’

অন্যদিকে গত রোববার দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক্স ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মো. আলমগীর। তবে কতগুলো আসনে ইভিএম ব্যবহার হবে সেই বিষয়ে কিছু না বললেও তিনি সাংবাদিকদের জানান ৭০ থেকে ৮০ আসনে ইভিএমে ভোট করার সক্ষমতা আছে তাদের। ইভিএমে ভোট করতে চাইলে নতুন করে মেশিন আনতে হবে বলেও জানান তিনি।

গত ১৭ জুলাই মাসে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের শুরু করেছিল ইসি। ধারাবাহিকভাবে হওয়া সংলাপ শেষ হয়েছে ৩১ জুলাই। ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানায় ইসি। ইসি ডাকে সাড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ২৮ দল অংশ নেয় সংলাপে। দলগুলো পক্ষ থেবে আসে ৩২১ প্রস্তাব বা দাবি।

তবে ইসি সংলাপে অংশ নেয়নি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাসদ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএম্এল, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, জেএসডি, এলডিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, সিপিবি ও বিজেপি। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের কাছে সময় চেয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও জাতীয় পার্টি-জেপি।

শেয়ার করুন