১ আগস্ট ২০২২
আজকের সিলেট ডেস্ক : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যে ধারাবাহিক সংলাপ শুরু করেছিল, গতকাল জাতীয় পার্টি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সংলাপের এই পর্ব শেষ হয়েছে। তবে ইসি সংলাপে অংশ নেয়নি বিএনপিসহ সমমনা ৯টি দল। আনুষ্ঠানিক সংলাপ শেষ হলেও সময় চেয়ে আবেদন করেছে আরও দুটি রাজনৈতিক দল।
সংলাপে বিএনপির অংশগ্রহণ না করায় আর সবকিছু ছাপিয়ে নির্বাচন কমিশনের ওপর দলটির অনাস্থার বিষয়টি উঠে এসেছে। সংলাপে বিএনপির মতো বড় দল অংশ না নেওয়ায় হতাশ হয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। নির্বাচনে দলটি অংশ না নিলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানান সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল।
অংশগ্রহণমূলক ভোটের প্রত্যাশা জানিয়ে সিইসি ইতোমধ্যে বলেছেন, দলগুলোর দেওয়া প্রস্তাব বিবেচনার জন্য পর্যালোচনা করবেন তারা। ইসি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যাবতীয় পদক্ষেপ নেবে এবং আইন-বিধির প্রয়োগ নিশ্চিত করবে। সংলাপে আসা প্রস্তাবগুলো দলীয় প্রধানদের কাছে পাঠানোর পাশাপাশি সরকারের কাছেও পৌঁছে দেবে নির্বাচন আয়োজন ও পরিচালনার সাংবিধানিক সংস্থাটি।
নির্বাচন কমিশনের কাছে আসা প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর বলেন, ‘সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে অনেক প্রস্তাব এসেছে। আমরা এগুলো যাচাই-বাছাই করে শিগগিরই কাজ শুরু করব। তবে সব প্রস্তাব নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করতে পারবে এমন নয়। সব বিষয়ে আমাদের এখতিয়ার নাও থাকতে পারে। আর কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো কারো পক্ষেই করা সম্ভব হবে না।’
ইভিএম ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে অনেক প্রস্তাব এসেছে সংলাপে। কমিশন সেগুলো কীভাবে দেখছে জানতে চাইলে মো. আলমগীর বলেন, ‘নিয়মনীতি মেনেই সব করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করা নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়। এটা সংসদীয় বিষয়। তবে নির্বাচন কমিশন দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সুন্দর একটি পথ তৈরি করতে পারে। আমরা সে চেষ্টাই করছি।’
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সংলাপে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয় ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে। ১৭ জুলাই শুরু হওয়া ইসি সংলাপ শেষ হয়েছে গতকাল। তেরো দিন ধরে চলা সংলাপে অংশ নেয় ২৮টি দল।
সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে দলগুলোর পক্ষ থেকে মোট ৩২১টি প্রস্তাব আসে। এর মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে বেশি কথা হয় ইলেকিট্রিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম), নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচনে সেনা মোতায়েন- এই তিনটি বিষয় নিয়ে। আসন বৃদ্ধি, সংরক্ষিত আসন বাতিল, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধসহ বেশ কিছু দাবিও জোরালোভাবে এসেছে সংলাপে। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের ওপরে আস্থার সংকটের কথাও উঠে আসে কয়েকটি দল থেকে।
২৮ দলের ৩২১ প্রস্তাব
আওয়ামী লীগের ১৫ দফা প্রস্তাব
৩০০ কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার, ছবিযুক্ত নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়নসহ ১৫ দফা প্রস্তাব রাখে ক্ষমতাসীন দলটি।
জাতীয় পার্টির (জাপা) ৪ দফা প্রস্তাব
ইভিএমে ভোটগ্রহণের ঘোর বিরোধিতা করে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ৪ দফা দাবি জানায় সংসদে বিরোধী দলটি।
তরিকত ফেডারেশনের ১১ দফা প্রস্তাব
সংসদ নির্বাচন দুই বা তিন ধাপে করা, সেনা মোতায়েন, সেই সঙ্গে সংসদ নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএম ও ১৫০ আসনে ব্যালট পেপার নির্বাচন করার প্রস্তাব রাখে তারা।
বাংলাদেশ ন্যাপের ১১ দফা
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও জাতীয় সংসদের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে সংসদে প্রতিনিধিত্ব, তফসিল ঘোষণার পর সংসদ ভেঙে দেওয়া, ইভিএম ব্যবহার না করাসহ ১১ দফা প্রস্তাব দেয় দলটি।
গণফোরামের ১০ দফা
নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচনী প্রচারণায় প্রত্যেক আসনে সব প্রার্থীকে এক মঞ্চে সভা করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করে গণফোরাম।
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ১ দফা
নির্বাচনকালীন সরকার ও প্রশাসন দলনিরপেক্ষ না হলে কোনোভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব নয়। জন আস্থা তৈরি ও ইসির দায়িত্ব পালনে মেরুদণ্ড শক্ত করে ভূমিকা নেওয়ার দাবি জানায় কাদের সিদ্দিকীর দলটি।
জাকের পার্টির ৪ দফা প্রস্তাব
দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও হয়রানিমূলক আচরণ বন্ধ, ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড করার পক্ষে মত দেয় দলটি।
এনপিপির ১৬ দফা প্রস্তাব
ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরার ব্যবহার, স্বল্পসংখ্যক আসনে ইভিএম ব্যবহার, প্রার্থীদের জামানত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয় এই দলের পক্ষে।
বিকল্পধারার ৭ দফা প্রস্তাব
কেন্দ্রে কেন্দ্রে সামরিক বাহিনী মোতায়েন, সব কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারসহ ৭ দফা প্রস্তাব রাখে দলটি।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ১১ দফা প্রস্তাব
সেনা মোতায়েন, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন ইসির অধীনে ন্যস্ত করা, সব আসনে ব্যালট পেপারে ভোট নেওয়াসহ ১১ দফা প্রস্তাব করে দলটি।
ওয়ার্কার্স পার্টির ১২ দফা প্রস্তাব
ত্রুটি দূর করে ইভিএম ব্যবহার, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন, নির্বাচনকালে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ইসির অধীনে ন্যস্ত করা, আনুপাতির প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয় বাম দলটির পক্ষ থেকে।
মুসলিম লীগের ১৯ দফা দাবি
ইভিএম বাতিল, ভোটের তিন মাস আগে সংসদ বিলুপ্ত করা ও ‘না’ ভোট পদ্ধতি চালুর সুপারিশসহ ১৯ দফা প্রস্তাব করে দলটি।
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ৯ দফা
ইভিএমের যান্ত্রিক ত্রুটি দূর করে সারা দেশে তিন দফায় নির্বাচন সম্পন্ন করাসহ ৯ দফা প্রস্তাব করে দলটি।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ১২ দফা
বিদেশি কূটনৈতিকদের অযাচিত নাক গলানোকে প্রশ্রয় না দেওয়া, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন, ইসিকে রাজনৈতিক বিতর্কে না জড়ানো ও প্রশাসনের কাজে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটদের অধীনে ব্যবহারসহ নির্বাচনে ১২ দফা প্রস্তাব জানায় ক্ষমতাসীন দলের ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলটি।
খেলাফত আন্দোলনের ৪০ দফা
জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসির অধীনে ন্যস্ত করা, সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া, সংরক্ষিত মহিলা আসন বিলুপ্ত করা, ইভিএম ব্যবহার না করা, সংসদ ভেঙে নির্বাচন, ‘না’ ভোট চালুসহ ৪০ দফা দাবি জানায় দলটি।
গণফ্রন্টের ২২ দফা প্রস্তাব
সংসদের আসনসংখ্যা ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ বা ৪৫০ করা, নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক সরকার, স্বল্প পরিসরে ইভিএম চালুসহ ২২ দফা প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির ১৩ দফা
নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা, বিভাগভিত্তিক নির্বাচন, ইভিএম চালু স্বল্প পরিসরে, ‘না’ ভোট চালুর সুপারিশ করে দলটি।
গণতন্ত্রী পার্টির ৫ দফা
নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিশ্চিত করা, ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করাসহ দলটির পক্ষ থেকে ৫ দফা দাবি জানানো হয়।
বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের (এমএল) ৯ দফা
নির্বাচনে ইভিএমে ভোট, ধর্মের ব্যবহার বন্ধ, টাকার খেলা বন্ধ, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের বিষয়ে দলটি ৯ দফা সুপারিশ করে।
খেলাফত মজলিসের ১৫ দফা
নির্বাচনকালে স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইসির অধীনে ন্যস্ত করা, ভোটের ৭ দিন আগে সেনা মোতায়েন, তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, ব্যালট পেপারে ভোট করা, ভোটকেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারের প্রস্তাব করে ইসলামি দলটি।
ইসলামী ঐক্যজোটের (আইওজে) ১১ দফা
নির্বাচনকালীন সরকারের আকার সীমিত করা, ৩০ জনের বেশি প্রার্থী দিলে বেতার-টিভিতে প্রচারের সুযোগ, আস্থা অর্জন করে ইভিএমের ব্যবহারের সুপারিশ করে কয়েকটি ইসলামি দলের এই জোট।
বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট
জাতীয় পরিষদ গঠন ও সাংবিধানকভাবে নির্বাচনকালীন সরকারে প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ২০ দফা প্রস্তাব
নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তদারকি সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন, দল নিবন্ধনের শর্ত সহজ করা, নির্বাচনী ব্যয় মাত্র ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ, ‘না’ ভোট চালুর প্রস্তাব করা হয় এই দলের পক্ষে।
খেলাফত মজলিশের ৪ দফা প্রস্তাব
নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, ইভিএমের ব্যবহার না করা, প্রতিটি বুথে সিসিটিভি ক্যামেরা, সংসদ ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করে ইসলামি দলটি।
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ৯ দফা
পাঁচটি মন্ত্রণালয় ইসির অধীনে রাখা, জেলা প্রশাসকের পরিবর্তে নির্বাচন কর্মকর্কতাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা, ব্যালট পেপারে ভোট নেওয়ার সুপারিশ করে তারা।
বাংলাদেশ কংগ্রেসের ১৬ দফা প্রস্তাব
নির্বাচনের সময়ে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইসির অধীনে রাখা, তফসিল ঘোষণার পর জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ কার্যকর থাকবে না, ওই সময়ে যে সরকার থাকবে তা ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করে দলটি।
বিএনএফের ১ দফা প্রস্তাব
ইসির অধীনে নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে নির্বাহী বিভাগের সহায়তা করা।
এনডিএম-এর ১৩ দফা প্রস্তাব
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একাধিক দিনে ভোটগ্রহণ, নির্বাহী বিভাগ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ না দেওয়ার প্রস্তাব করে দলটি।
নির্বাচন কমিশনের এ সংলাপে ১৭ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ২৮টি দল অংশ নেয়। সংলাপে অংশ নেয়নি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাসদ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমল, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, জেএসডি, এলডিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, সিপিবি ও বিজেপি। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের কাছে সময় চেয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও জাতীয় পার্টি-জেপি।