৪ জুলাই ২০২২
কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : দিরাই পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব চন্ডিপুরে সন্তানদের নিয়ে গৃহবধূ মাসেদা বেগমের বসবাস। স্বামী মনির মিয়া মারা গেছেন বেশ আগেই। চার সন্তান নিয়ে স্বামীর নির্মাণ করা ঘরেই চলছিল মাসেদার জীবন সংগ্রাম। চলতি বন্যার পানিতে তার বসতঘর তলিয়ে যায়। জীবন রক্ষায় ঘরবাড়ি ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে এ গৃহবধূ আশ্রয় কেন্দ্রে ছুটে যান। বানের পানি নামার পর বাড়িতে এসে যেন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। দেখতে পান, তার বসতঘরটি ভিটের সাথে মিশে গেছে। খাবারের কথা এখন আর তার মাথায় আসে না। কিভাবে আবারও টিনের চালা তুলবেন-মাথাগোঁজার ঠাঁই হবে তার-এই চিন্তায়ই তার চোখে ঘুম নেই। ঘরের জন্যে গৃহবধূ মাসেদা এখন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি।
করিমপুর ইউনিয়নের চান্দপুরের ক্ষিতীশ বর্মন কোনোমতে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে চলছিলেন। পেশায় জেলে ক্ষিতীশ জাল-দড়ি দিয়ে যা উপার্জন করেন-তা দিয়েই পৈতৃক ভিটায় টিনের তৈরি কাঁচা ঘরে তার সুখের সংসার। বন্যার পানি তার ঘরে ঢুকে যায়। নিরুপায় হয়ে দিরাই উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেন। এক সময় ঘরের ভেতরে হয়ে যায় পেট সমান পানি। বানের পানি নামার পরে ঘর দেখতে বাড়িতে যান ক্ষিতীশ। ঘর দেখার পর তার অবস্থা হঠাৎই খারাপ হয়ে আসে। যেন বেঁচে থেকেও তিনি জীবিত নেই। মাসেদার মতো জেলে ক্ষিতীশের ঘরটিও ভিটের সাথে রাক্ষুসী বন্যা মিশিয়ে দিয়ে গেছে। দিরাই উপজেলার মাসেদা কিংবা ক্ষিতীশ বর্মনই নয়,এবারের প্রলয়ংকারী ভয়াবহ বন্যায় সিলেট বিভাগে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মানুষের ঘরবাড়ির। এর আগে কোনো বন্যায় এত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এতে শ্রমজীবী মানুষেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। বন্যার পানি কমলেও বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়ায় এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজের ভিটেমাটিতে ফিরতে পারছেন না।
জানা গেছে, বন্যায় সিলেট বিভাগে ৯৯ হাজার ৭৮৮টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়। সিলেট বিভাগের ১ কোটি ২৫ লাখ মানুষের মধ্যে এবারের বন্যায় ৬৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৬৫ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৬ লাখ ২২ হাজার ৯৮৬টি। এ হিসেবের মধ্যে বহু প্রতিবন্ধী শিশু, নারী ও বৃদ্ধও রয়েছেন। সব হারিয়ে অন্তত সোয়া ১ লাখ মানুষ এখন একেবারে নিঃস্ব। এখন শুধু চাল, ডাল, লবণ, আটায় এদের ক্ষতি পোষানো সম্ভব নয়।
এদিকে, সিলেট ও সুনামগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত ঘর নির্মাণে সহায়তা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ইতোমধ্যে ১০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। এই টাকা থেকে প্রত্যেক পরিবারকে নগদ ১০ হাজার টাকা করে ১০ হাজার পরিবারকে প্রদান করা হবে। আজ সোমবার থেকে এই অর্থ বিতরণ শুরু হবে।
জানা গেছে, সিলেট জেলায় বন্যায় মোট ৪০ হাজার ৯১টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৩টি। বন্যায় মোট ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৪৩৩ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকা, জেলার ৫ পৌরসভা ও ১৩ উপজেলার ১০৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯৪ ইউনিয়ন বন্যা কবলিত।
সিলেট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়েছে।
এদিকে, সিলেট জেলায় সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র শ্রেণি পেশায় নিয়োজিত পরিবারসমূহের গৃহ মেরামত, গৃহস্থালি উপকরণ ও শিক্ষা সামগ্রী ক্রয় এবং আনুষাঙ্গিক ব্যয় মিটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল হতে আর্থিক সহায়তা হিসেবে ৫ কোটি টাকা দেয়া হয়। গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর এসাইনমেন্ট অফিসার (প্রতিকল্প) আব্দুল্লাহ আল খায়রুম স্বাক্ষরিত এক পত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিষয়টি সম্পর্কে সিলেটের জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসমূহের মধ্য হতে দিনমজুর, দরিদ্র কৃষক, কৃষি শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, বয়স্ক প্রতিবন্ধী, রিক্সাচালক, নাপিত, হোটেল শ্রমিক, দোকান মজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফেরিওয়ালাসহ স্বল্প আয়ের দরিদ্র পরিবার এবং এ সকল ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী রয়েছে এমন পরিবার চিহ্নিত করে তাদের অনুকূলে গৃহ মেরামত, শিক্ষা সামগ্রী ও আনুষাঙ্গিক প্রয়োজনে পরিবার প্রতি ১০ হাজার টাকা নগদ প্রদানের গাইডলাইন দেয়া হয়েছে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান জানিয়েছেন, আজ সোমবার থেকেই সকল নির্দেশনা মেনে টাকা প্রদানের কাজ শুরু করা হবে।
সুনামগঞ্জ জেলার ১১টি উপজেলা ও ৪টি পৌরসভায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা ৪৫ হাজার ২৮৮টি। এর মধ্যে ৪ হাজার ৭৪৭টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪০ হাজার ৫৪১টি ঘরবাড়ি। জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকের সংখ্যা ৩০ লাখ। ১১ উপজেলায় এখনো ৫৫ হাজার ৬৬০ জন লোক পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। জেলার ১১ উপজেলার ৮৮ ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভার মধ্যে সবক’টি পৌরসভা ও ইউনিয়ন বানের পানিতে নিমজ্জিত হয়। সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যার তীব্রতা এমনই ছিল যে, জেলার কোথাও পা ফেলবার মতো শুকনো মাটি ছিল না।
সুনামগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, সুনামগঞ্জ জেলায় সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র শ্রেণি-পেশায় নিয়োজিত পরিবারসমূহের গৃহ মেরামত, গৃহস্থালি উপকরণ ও শিক্ষা সামগ্রী ক্রয় এবং আনুষাঙ্গিক ব্যয় মিটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল হতে আর্থিক সহায়তা হিসেবে ৫ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। গত শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের বিষয়টি সুনামগঞ্জের এনডিসি মেহেদী হাসান নিশ্চিত করেছেন। প্রত্যেক পরিবারকে নগদ ১০ হাজার টাকা করে মোট ৫ হাজার পরিবারের নিকট এই টাকা দেয়া হবে। সিলেট জেলার মতো সুনামগঞ্জ জেলাও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনুরূপ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশনার আলোকেই এই টাকা দেয়া হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলায় এ পর্যন্ত আংশিক ও পুরোপুরি মিলিয়ে মোট ১৪ হাজার ৩০৯ টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন ৫৮ হাজার ৫৯৫ জন মানুষ। জেলার ৭ উপজেলার মধ্যে ৫ উপজেলার ৩১ ইউনিয়ন বন্যা দুর্গত। বন্যায় মৌলভীবাজার জেলায় ২ লাখ ৬২ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
মৌলভীবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ছাদু মিয়া বলেন, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে ইতোমধ্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়েছে।
হবিগঞ্জ জেলায় এখনো বন্যার পানি নামতে শুরু করেনি। তাই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে, এ পর্যন্ত শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সরকারি হিসেবে গতকাল পর্যন্ত ৩৫০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১৯ হাজার ৩৩৬ জন লোক আছেন। পানিবন্দী অবস্থায় আছেন ২৪ হাজার পরিবার। ৮ উপজেলার মধ্যে ৪ উপজেলার ৩৭টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত। হবিগঞ্জ জেলায় বন্যায় ৮৩ হাজার ৪৯০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার এবং ভারপ্রাপ্ত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মঈন খান বলেন, বন্যার পানি নামা শুরু করলে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ভেসে উঠবে। এখন পর্যন্ত শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এসেছে। পানি কমার পর ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে বিস্তারিত বলা যাবে।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ফয়সল আহমদ জানান, বর্তমানে বন্যা দুর্গত এলাকায় খাবারের সমস্যা থেকেও বড় সমস্যা হচ্ছে বাসস্থানের। পানি কমলেও আফালে ভেঙ্গে গেছে হাওর পাড়ের অনেকের বসত ভিটা। বানের প্রবল স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে মাথাগোঁজার ঠাইও। একমাত্র ঘর হারিয়ে এখন অনেক পরিবার এখন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। ধনী বা স্বাবলম্বীরা ঘরবাড়ি পুনরায় তৈরি বা একরকম সংস্কার করে সেই পুরনো ঘরবাড়িতে ফিরে আসলেও দরিদ্র লোকজন পড়েছেন চরম বিপাকে। এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারও এ সংকট থেকে বাদ পড়েনি। এ বিষয়টি সামনে রেখে সরকারিভাবে পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা জরুরি।
সমাজকর্মী আব্দুজ জহির বলেন, এবারের বন্যায় কাচা ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে পুরাতন টিনের ঘরবাড়িও। নতুন বাড়ি ঘরেরও ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি সীমাহীন। ক্ষতির পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ণয় না হলে এবং সরকারি সাহায্য সঠিকভাবে না দিলে শত শত পরিবার গৃহহীন হওয়ারও আশংকা আছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরির সময় নির্বাচনে পরাজিত মেম্বার- চেয়ারম্যানদেরও রাখা উচিত। এতে সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে।
যোগাযোগ করা হলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আতিকুল হক সিলেটের ডাককে জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংস্কার বা পুনঃনির্মাণে সহায়তা দিতে পরিকল্পনা আছে। জেলা প্রশাসনের তালিকাটা দেয়ার পরে আমাদের মন্ত্রী-সচিবসহ উচ্চ পর্যায়ে বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। আগে ক্ষয়ক্ষতির বিবরণটা নিশ্চিত করব। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে পুনর্বাসন কার্যক্রমে হাত দেব। যাকে যে সহায়তা দেয়া প্রয়োজন-তাকে সেই সহায়তা দেয়া হবে।