১৭ মে ২০২২


কালজয়ী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা

শেয়ার করুন

আজকের সিলেট ডেস্ক : স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনা। চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর তাঁর নেতৃত্বে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। বর্তমানে চতুর্থ দফায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার চার দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার মোটেও মসৃণ ছিলো না। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে দলকে সুসংগঠিত করার পাশাপাশি দক্ষ হাতে দেশও পরিচালনা করছেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে ধানমণ্ডি ৩২ এ সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্য সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করে। এ সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার মা, তিন ভাই, দুই ভাইয়ের স্ত্রী এবং বাড়িতে থাকা তার অন্যান্য আত্মীয়দের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ সময় তিনি এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করার কারণে প্রাণে বেঁচে যান। পরবর্তীতে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন সরকার দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করায় বাধ্য হয়ে নির্বাসনে থাকতে হয় শেখ হাসিনাকে।

দেশে না থেকেও ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা এবং একই বছরের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন তিনি। দেশে ফিরে বসে থাকেননি বঙ্গবন্ধুকন্যা। আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অধিকারে রাজপথে ছুটে যান তিনি। ১৯৮৩ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মার্শাল ল এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য গণতন্ত্র পন্থি ১৫ প্রগতিশীল দল নিয়ে জোট গঠন করেন এবং আন্দোলন করেন। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি ও নভেম্বর মাসে তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। এর পরের বছরের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।

১৯৮৬ সালে তার অধীনে থাকা জোট নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ৯৭ আসনে বিজয়ী হয়। শেখ হাসিনা বিজয়ী হন তিন আসন থেকে। সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হন তিনি। ১৯৮৭ জুলাই মাসে সেনা সদস্যদের স্থানীয় প্রশাসনে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একটি বিল পাশ করতে তোড়জোড় শুরু করে এরশাদের সামরিক সরকার। এ সময় বিরোধী দলে থাকা শেখ হাসিনা পার্লামেন্ট থেকে ‘ওয়াক আউট’ করেন এবং এই বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন এবং এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে পার্লামেন্ট সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দেন শেখ হাসিনা।

১৯৯০ সালে ৮ দলীয় জোটকে নিয়ে জোরালো রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। যেখানে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য দলও অংশ নেয়। ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করেন। এরশাদের সামরিক শাসনের পতনের পর ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে ৮৮ আসনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিরোধী দল হিসেবে সংসদে যায় আওয়ামী লীগ।

১৯৯৪ সালে পার্লামেন্টারি বাই-ইলেকশনের ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন শেখ হাসিনা। এ সময় তার নেতৃত্বে বিরোধী দল সংসদ ত্যাগ করে এবং ডিসেম্বরে সংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন সকলে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য ১৯৯৫ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আন্দোলন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জোটে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেয় আওয়ামী লীগ। তাদের জোটে থাকা অন্যান্য দলও এই নির্বাচন বয়কট করে। তীব্র আন্দোলন চলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে। এর ফলে তৎকালীন সরকার বাধ্য হয় পার্লামেন্টে এই বিল পাশ করতে। তিন মাসের মধ্যে এই পার্লামেন্ট বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১২ জুন অনুষ্ঠিত এই সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসনে বিজয়ী হয়। ২৩ জন দেশের দশম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে শেখ হাসিনা। একই বছর নভেম্বরে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত গঙ্গা-পদ্মা নদীর ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি করেন শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৭ সালে জনসংহতি সমিতি নামে এক সশস্ত্র দলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি হয় ডিসেম্বরে। যার মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে চলমান চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের উত্তেজনা প্রশমন হয়। সফলতার সঙ্গে ৫ বছর দেশ পরিচালনার পর ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে শেখ হাসিনা সরকার। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সঠিক সময় পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে তা শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তর করে কোনো সরকার।

২০০৪ সালের শেখ হাসিনা অল্পের জন্য রক্ষা পান গ্রেনেড হামলা থেকে। ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তার ওপর গ্রেনেড হামলার পাশাপাশি গুলিও চালানো হয়। এ ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। ২০০৭-২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাসনে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু দৃঢ়চিত্তে সকল ভয় ও চোখ রাঙ্গান উপেক্ষা করে দেশে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিথ্যা দুর্নীতির মামলা প্রদান করা হয় এবং প্রায় ১ বছর জেলে আটকে রাখা হয়।

২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নবম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২৯ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দল ২৬২ আসনে বিজয়ী হয়, যেখানে আওয়ামী লীগ বিজয় লাভ করে ২৩০ আসনে। ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে শেখ হাসিনা ৬ জানুয়ারি। এই বছর ৯ মে তার স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া মারা যান। একই সঙ্গে এই বছর ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি দিতে গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

২০১০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের মধ্য হতে ৫ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২৮ জানুয়ারি। ২০১১ সালে টাইম ম্যাগাজিনের আগস্ট সংখ্যায় শীর্ষে থাকা ১২ নারী নেতৃত্বের মধ্যে সপ্তম হন শেখ হাসিনা। এই বছর ৫ সেপ্টেম্বর ভারত-বাংলাদেশ ৬৪ বছরের সীমান্ত সমস্যা সমাধানে চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০১২ সালে জাতিসংঘের ৬৭তম অধিবেশনে ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত শান্তি ও সমৃদ্ধির মডেল সকলের কাছে সমাদৃত হয়।

২০১৩ সালে মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গোলাম আজমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয় ১৫ জুলাই। এই বছর ১২ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি দেয়া হয় কাদের মোল্লাকে। ২০১৪ সালে এ বছর ৫ জানুয়ারি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ২৩৪ আসনে পাশ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১২ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। এ বছর ১৭ এপ্রিল দেলোয়ার হোসেন সাইদীকে ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার দায়ে ১১ এপ্রিল ফাঁসি কার্যকর করা হয় যুদ্ধাপরাধী মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের। ৩১ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারতের ছিটমহলগুলোর বাসিন্দাদের ও সীমানা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হয়। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ হয় ৩০ জুনের মধ্যে। ২২ নভেম্বর আলি আহসান মুজাহেদি এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ২০১৬ সালে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে ১১ মে মতিউর রহমান নিজামির ফাঁসি কার্যকর হয়। একই বছর ৩ সেপ্টেম্বর মানবতা বিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকায় মীর কাশেম আলীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এ বছর জুনে মার্কিন ম্যাগাজিন ফোর্বসে বিশ্বের সর্বোচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ৩৬তম ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনার নাম ঘোষণা করেন। ২০১৭ সালে সেপ্টেম্বর মাসে মিয়ানমার থেকে জীবন ভয়ে পালিয়ে আসা ৭ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ। ২০১৮ সালে ১১ তম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৭ জানুয়ারি যেখানে বিজয়ী হয়ে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা।

শেয়ার করুন