১১ মে ২০২২
এম জসীম উদ্দিন : সমন্বিত ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সেবা প্রদান পদ্ধতিকে অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ১ হাজার ১৯৭ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্প(জুলাই ২০২০ হতে জুন ২০২৫ পর্যন্ত) এবং ১ হাজার ২১২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ডিজিটাল জরিপ পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। প্রকল্প দু’টি ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্প দুটির বাস্তবায়ন ২০২৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হবে। আইন ও বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধানে নিবন্ধন অধিদফতর বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যাশিত সেবাগ্রহীতা ভূমি অফিসে না গিয়ে ঘরে বসে মোবাইল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সেবা পাবেন। হাতের মুঠোয় ভূমিসেবা দেওয়া প্রকল্প দুটির মূল লক্ষ্য। প্রকল্পটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর বাস্তবায়ন করবে। জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত প্রকল্প কাজের অগ্রগতি ১৫.০৯ শতাংশ।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন’ গ্রাহকের ১৭ ধরনের সেবা নিশ্চিত করবে। এসব সেবা পেতে অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার তৈরি করা হবে। এ সফটওয়্যারের মাধ্যমেই মিলবে সকল সেবা। সেবাগুলো হচ্ছে- ই-মিউটেশন, রিভিউ ও আপিল মামলা ব্যবস্থাপনা, অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর, রেন্ট সার্টিফিকেট মামলা ব্যবস্থাপনা, মিউটেটেড খতিয়ান, ডিজিটাল ল্যান্ড রেকর্ড, মৌজা ম্যাপ ডেলিভারি সিস্টেম, মিস মামলা ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা, দেওয়ানি মামলা তথ্য ব্যবস্থাপনা, হাটবাজার ব্যবস্থাপনা, জলমহাল ব্যবস্থাপনা, বালুমহাল ব্যবস্থাপনা, চা-বাগান ব্যবস্থাপনা, ভিপি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ বাজেট ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। ‘ল্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিস ফ্রেমওয়ার্ক’ সিস্টেম সফটওয়্যার-এর মাধ্যমে একই কাঠামোয় নিয়ে এসে আন্ত-পরিচালনযোগ্য ডাটাবেজ তৈরি করে সরকারের অন্যান্য সব সেবার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
এই প্রকল্পের প্রধান কাজ হবে ভূমি ব্যবস্থাপনায় ১৭টি ধাপে সংস্কার আনা। সংস্কারগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীয় ডেটা সেন্টার এবং নেটওয়ার্ক কেন্দ্র স্থাপন, প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের জন্য ৪৯৬টি মাইক্রো ডেটা সেন্টার স্থাপন ও জেলা ডেটা সেন্টারের সঙ্গে আন্তসংযোগ স্থাপন, প্রতিটি জেলায় একটি করে ডেটা সেন্টার, এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি) সফটওয়্যার উন্নয়ন, নিবন্ধন অধিদফতর এবং এই সংশ্লিষ্ট সব অফিসের জন্য ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) স্থাপন, তহশিলদার; দলিল লেখক ও নকলনবিশদের প্রশিক্ষণ প্রদান, বায়োমেট্রিক হাজিরা সিস্টেম স্থাপন এবং রেকড রুম স্বয়ংক্রিয়করণ এবং পুরোনো রেকর্ডগুলো ডিজিটাইজ করা।
তাছাড়া পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ভূমিসেবা প্ল্যাটফর্ম স্থাপনের লক্ষ্যে ভূমিব্যবস্থা অটোমেশন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ প্ল্যাটফর্ম জাতীয় ডিজিটাল সেবা ইকোসিস্টেমের অন্যতম অংশ হিসাবে কাজ করবে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নতুন ও চলমান সব প্রকল্প বস্তুত ভূমিব্যবস্থা অটোমেশন প্রকল্পকে সামনে রেখেই তৈরি ও হালনাগাদ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের লক্ষ্য কেবল বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম ক্রমাগতভাবে কার্যকর সরকারি দপ্তর তথা ভূমি অফিসের সম্পদ পরিকল্পনা ডিজিটালাইজেশন করাই নয়; আইন, জরিপ, মানবসম্পদ ও অর্থের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুমুখী সংস্কার উদ্যোগের নির্দেশক হিসাবে কাজ করা। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় সব ক্ষেত্রেই জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারটিতে লক্ষ্য রাখা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষিজমি ও বনভূমি সুরক্ষা জলবায়ুর ক্ষতিকর পরিবর্তন প্রতিরোধে অত্যাবশ্যক। এ লক্ষ্যে কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন তৈরির কাজ প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়া ভূমির গুণাগুণ অনুযায়ী, ভূমিকে প্লটওয়ারি কৃষি, আবাসন, বাণিজ্যিক, পর্যটন ও শিল্পোন্নয়ন ইত্যাদি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে মৌজা ও প্লটভিত্তিক ডিজিটাল ভূমি জোনিং ম্যাপ ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ডিজিটাল ভূমি জোনিং প্রকল্প চলমান রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় তিনটি সিটি করপোরেশন, একটি পৌরসভা ও দুটি উপজেলায় ড্রোনের মাধ্যমে জমি জরিপ করা হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় সমীক্ষার পরে, একটি ডিজিটাল ডাটাবেস স্থাপন করা হবে যা সমস্ত জমি-সম্পর্কিত বিষয় যেমন রেজিস্ট্রেশন, বিক্রয়, ক্রয় এবং মিউটেশন ডিজিটালভাবে রেকর্ড করার অনুমতি দেবে। প্রকল্পের উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে রয়েছে প্রকৃত মালিকদের জমির অধিকার নিশ্চিত করা, জমি সংক্রান্ত বিরোধ কমানো, ভূমি রাজস্ব বৃদ্ধি করা এবং সরকারের ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা বাড়ানো।
দক্ষ ভূমি ব্যবস্থাপনা স্থাপনে কার্যকর ভূমিনীতি অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনবান্ধব ভূমিব্যবস্থা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তার প্রথম মেয়াদেই আজ থেকে ২০ বছর আগে ২৮টি মৌলিক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে ২০০১ সালের ২১ জুন ‘জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০০১’ গ্রহণ করেন। ডিজিটালাইজেশন, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও সংস্কার করে এবং ভূমিনীতির কার্যকর ও দক্ষ প্রয়োগের সমন্বয়ে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এর অন্যতম অংশ ‘ভূমি ব্যবস্থাপনা’কে শক্তিশালী করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এ কর্মযজ্ঞ সরকারের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণ ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় অন্যতম নিয়ামক।
ইতোমধ্যে অনলাইনে খতিয়ান সরবরাহ, ই-নামজারি ও ই-সেটেলমেন্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ডিজিটাল ল্যান্ড ডেটা ব্যাংক ও ল্যান্ড জোনিং কার্যক্রমও হাতে নেওয়া হয়েছে। এ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। ভূমি ব্যবহারে আধুনিকায়নের জন্য ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভূমি জরিপ কার্যক্রমটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল বিষয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় আধুনিকীকরণ ও ডিজিটালাইজেশন করতে সময় লেগেছে ২০-২৫ বছর। ভূমি তথ্য ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশন এ সময় সম্পন্ন করা জটিল। কারণ ভূমি তথ্য ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজেশনের চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার বিষয়টি একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
ডিজিটালাইজেশনের আওতায় ভূমি অধিদফতরের সদর দফতর, খতিয়ান ও ম্যাপ প্রিন্টিং প্রেস, কেন্দ্রীয় রেকর্ড ব্যবস্থাপনা (ম্যাপ ও খতিয়ান) কার্যালয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক কম্পিউটার, স্ক্যানার, ল্যাপটপ সরবরাহসহ ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। অধিদফতরের হিসাব শাখা ও লাইব্রেরি অটোমেশন করা হয়েছে। কম্পিউটারের মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যে মৌজা ম্যাপ এবং স্ক্যান করা প্রিন্ট কপি সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে। অধিদফতরের ওয়েব পোর্টাল চালু করা হয়েছে। অধিদফতরে ওয়াই-ফাই চালু করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ২০ হাজার মৌজার চার কোটিরও অধিক স্বত্বলিপি ডেটাবেইসে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ১ লাখ ১৫ হাজার মৌজা ম্যাপ স্ক্যানকরত পিডিএফ রূপে সার্ভারে সংরক্ষণসহ ডিজিটাল ব্যবহার চালু করা হয়েছে ।
জমি সংক্রান্ত অপরাধ ঠেকাতে আইন করছে সরকার। ইতোমধ্যে জমি সংক্রান্ত ২২ ধরনের অপরাধ চিহ্নিত করে আইনের খসড়া তৈরি করে- তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২১’ শীর্ষক এ আইনের খসড়ায় অন্যের জমির মালিক হতে জাল দলিল তৈরির পাশাপাশি মালিকানার চেয়ে বেশি দলিল করা, অতিরিক্ত জমি লিখে নেওয়া, আগে বিক্রি বা হস্তান্তরের পরও গোপনে বিক্রি করা, বায়না করা জমি পুনরায় বিক্রি করতে চুক্তিবদ্ধ হওয়া কিংবা ভুল বুঝিয়ে দানপত্র তৈরির মতো অপরাধগুলো কে আমলে এনে এর প্রতিকারের জন্য আইন করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ সুবিধা পাবে এবং ভূমি সংক্রান্ত অপরাধ ও মামলা কমে যাবে।
ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করার বিষয়টি বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। এজন্য নেওয়া হয়েছে একাধিক প্রকল্প। কাজটি যতই চ্যালেঞ্জিং হোক, সরকার এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে বলে সকলেই বিশ্বাস করে ।
(লেখক : সহকারী তথ্য কর্মকর্তা, তথ্য অধিদফতর, ঢাকা।)