২৪ এপ্রিল ২০২২


মোবাইল চোরাচালানের ‘নিরাপদ রুট’ গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর সীমান্ত

শেয়ার করুন

কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : মোবাইল চোরাচালানের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্ত। দুই উপজেলার সীমান্ত দিয়ে আসছে একের পর এক মোবাইলের চালান। মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে আবারও আরেকটি চালান আটক করা হয়েছে। মোবাইলের চালান আটক করা হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। চোরাচালানের নেপথ্যের নায়করা গ্রেফতার না হওয়ায় মোবাইল চোরাচালানও থামানো যাচ্ছে না। সর্বশেষ চালানসহ গ্রেফতারকৃত জাফর সাদেক জয় ও আক্তার হোসেনসহ ৩ জনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তাদেরকে এখনো পুলিশের হেফাজতে নেয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সিলেট জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানিয়েছেন, চোরাচালান প্রতিরোধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি রাখা হয়। চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে মামলাও হচ্ছে।

এসএমপির শাহপরান থানার ওসি সৈয়দ আনিসুর রহমান জানান, মোবাইল চোরাচালানের রুট ও জড়িতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে সম্প্রতি ধৃতদের ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল। আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। দ্রুত তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাৎক্ষণিক লিয়াকতের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেলে অভিযোগপত্রে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

জানা গেছে, সম্প্রতি শহরতলীর পীরেরবাজার এলাকা থেকে মোবাইলের চালানসহ গ্রেফতার হওয়া জৈন্তাপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলীর পুত্র জাফর সাদেক জয় আলী, লিয়াকতের আপন ভাতিজা আক্তার হোসেন ও গাড়ী চালক লিমন মিয়াকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেট মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক সাইফুর রহমান শুনানি শেষে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে, এখনো তাদেরকে রিমান্ডে নেয়া হয়নি।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহপরান থানার উপ-পরিদর্শক সারোয়ার হোসেন ভূঁইয়া গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় জানিয়েছেন, আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু এখনো কোনো কাগজপত্র আমার কাছে আসেনি। রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে চোরাচালানের রহস্য জানা যাবে। মামলার অপর আসামী শিপলুর ব্যাপারে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না বলে জানান এই তদন্তকারী কর্মকর্তা। অবশ্য মামলার এজাহার অনুযায়ী, আটক হওয়া চালান নগরীর করিম উল্লাহ মার্কেটে শিপলুর দোকানই গন্তব্য ছিল।

জানা গেছে, গত ৫ বছর সিলেটে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে ৬টি মোবাইলের চোরাচালান আটক হয়। ৬ চালানে আটক করা হয় এক হাজার ভারতীয় তৈরি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দামী স্মার্ট ফোন। এর দাম প্রায় কোটি টাকারও বেশি। মোবাইল চোরাচালানের ঘটনায় ঘুরে ফিরে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুরের সৈয়দ তৈমুছ আলীর পুত্র সৈয়দ আরিফের নাম আসে। সিলেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চালানের মালিক ছিলেন এই সৈয়দ আরিফ। ২০১৯ সালের নভেম্বরে প্রায় ৩০০টি স্মার্ট ফোনের ৩টি কার্টন ছিনতাই হয়ে যায়। এ ঘটনায় পুলিশের এএসআই জাহাঙ্গীর হোসেনসহ ৪ জন গ্রেফতার হয়। বিষয়টি নিয়ে খোদ পুলিশের অভ্যন্তরে তোলপাড় শুরু হয়।

তবে, চোরাচালানি আরিফের দেখা পায়নি পুলিশ। শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালের ৩১ মার্চ সৈয়দ আরিফ আহমদ (৩৬) ও তার সহযোগী সৈয়দপুরের (আগুনকোনার) মৃত আব্দুল মজিদের পুত্র মো. জিলু মিয়া (২৯) ও আকলাকুল ইসলাম মৃদুল (৩৬) নামের ৩ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় পুলিশ। আরিফের পর এবার শিপলুর নাম এসেছে। সম্প্রতি আটক হওয়া চোরাচালানের সহযোগিতাকারী হিসেবে লিয়াকত আলীর নাম মামলার এজাহারে বর্ণনা করা হলেও তার নাম আসামির তালিকায় নেই। অথচ লিয়াকতের গাড়ীসহ পুত্র-ভাতিজা ও তার চালক আটক হন।

জানা গেছে, গত ১৫ এপ্রিল শুক্রবার শহরতলির পীরেরবাজার এলাকা থেকে ১০০ পিস ভারতীয় মোবাইলের চালানসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ভারত থেকে চোরাইপথে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চালানটি আনা হয়। আটককৃত চালানের দাম প্রায় ১২ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এ ঘটনায় গাড়িতে থাকা লিয়াকত আলীর ছেলে জাফর সাদেক জয় আলী (২২), লিয়াকতের ভাই ইসমাঈল আলীর ছেলে আক্তার হোসেন (২২) ও গাড়ির ড্রাইভার লিমন মিয়াকে (২৮) আটক করে পুলিশ। লিয়াকতের ব্যবহৃত সিলভার কালারের প্রিমিও গাড়িটিও জব্দ করে থানায় নেওয়া হয়।

এর আগে গত ২৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরের বাইপাস সড়কের মুক্তিযোদ্ধা অফিসের সামনে সন্দেহ জনকভাবে একটি মোটর সাইকেলকে ধাওয়া করে পুলিশ। মোটর সাইকেলে দু’ব্যক্তি ৩টি কার্টন নিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছিল। পুলিশের ধাওয়ায় কার্টন ৩টি রাস্তায় ফেলে তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। কার্টনগুলো উদ্ধারের পর খুলে দেখা যায় অত্যাধুনিক স্মার্ট ফোন। ৩ কার্টনে মোট ২০২টি স্মার্ট ফোন পাওয়া যায়। উদ্ধার হওয়া স্মার্ট ফোনের দাম প্রায় ৩০ লাখ টাকা।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই শুক্রবার রাতে আইনশৃংখলা বাহিনীর একটি দল গোপন সংবাদ পেয়ে চেকপোস্ট বসায়। চোরাকারবারিরা আইনশৃংখলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তাদের ধাওয়া করলে চোরাকারবারিরা গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা এলাকায় নোহা গাড়ী রেখে দ্রুত পালিয়ে যায়। গোলাপগঞ্জ থানা পুলিশ এসে নোহা গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ভারতের তৈরি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৩১৬টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত মোবাইল চালানের দাম প্রায় ৮০ লাখ টাকা।
এর আগে ২৬ জুলাই সিলেট শহরতলির মুরাদপুর এলাকা থেকে ৭১টি ভারতীয় চোরাই মোবাইল ফোনসহ বুখাইর আহমদ ও পলাশ নামের দু’জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। উদ্ধারকৃত মোবাইল ফোনের দাম প্রায় ১৮ লাখ টাকা।

ওই বছরের ২২ জুন ভারত থেকে আসা ২৫টি স্মার্ট ফোনের চালানসহ জাকির হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় পুলিশ তার কাছ থেকে একটি প্রাইভেট কার জব্দ করে আইনশৃংখলা বাহিনী।

২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর নগরীর কাজিটুলার মক্তবগলির ৪৪ নম্বর বাসার পঞ্চম তলা থেকে ৩টি কার্টন ভর্তি ভারতীয় স্যামসাং, ভিভো, অপ্পো ও এক্সজামিসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২৭৯টি ভারতীয় চোরাই মোবাইল ফোন উদ্ধার করে পুলিশ।

নগরীর সুবিদবাজার থেকে পুলিশের এএসআই জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে মোবাইলের বিশাল চোরাচালানসহ প্রাইভেটকার ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় খোদ পুলিশের অভ্যন্তরে তোলপাড় শুরু হয়। পরে অভিযান চালিয়ে এএসআই জাহাঙ্গীরসহ এ ঘটনায় জড়িত ৪ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক অনুপ কুমার চৌধুরী বাদী হয়ে ১৯ নভেম্বর কোতোয়ালি থানায় পৃথক মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে মূল চোরাকারবারির নামসহ বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা দুটির অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, ভারতের বিভিন্ন জায়গায় চুরি হওয়া মোবাইল ফোন গুলো চোরাকারবারিরা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। ভারতে চোরাইকৃত মোবাইল ফোনের আইএমইআই (মোবাইল ইক্যুইপমেন্ট আইন্ডেটিটি) বাংলাদেশে আসার পর আর শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। চোরাকারবারিরা এই সুযোগকে দীর্ঘদিন ধরে কাজে লাগাচ্ছে।

পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে চোরাকারবারিরা সবসময় লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়। স্মার্ট ফোন চোরাচালানে বহনকারীদের গ্রেফতার করা হলেও মূল হোতাদের গ্রেফতারে তেমন তৎপরতা দেখা যায়না।

শেয়ার করুন