১৭ এপ্রিল ২০২২


এক দশকেও উদঘাটন হয়নি ইলিয়াস আলী গুমের রহস্য

শেয়ার করুন

ডেস্ক রিপোর্ট : দীর্ঘ এক দশকেও বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর ‘নিখোঁজ’ রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। ছেলে ফেরার প্রতীক্ষায় আজও প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন ইলিয়াস আলীর বৃদ্ধা মা সূর্যবান বিবি। সহধর্মিণী তাহসীনা রুশদীর লুনা ও তার ছেলে-মেয়েরাও করছেন অশ্রুসজল অপেক্ষা। ইলিয়াস আলীর সঙ্গে ‘নিখোঁজ’ হওয়া তার গাড়িচালক আনসার আলীরও তথ্য মেলেনি আজ পর্যন্ত।

জানা যায়, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে নিজ বাসায় ফেরার পথে রাজধানীর মহাখালী থেকে গাড়িচালক আনছার আলীসহ নিখোঁজ হন সিলেট-২ আসনের সাবেক এমপি, বিএনপির সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সিলেট জেলা সভাপতি এম ইলিয়াস আলী। ওইদিন মধ্যরাতে মহাখালী এলাকা থেকে ইলিয়াস আলীর ব্যবহৃত গাড়িটি উদ্ধার হলেও সন্ধান মেলেনি তাদের দুজনের।

দিন কিংবা মাস নয়, একে একে পেরিয়েছে ১০টি বছর। তবে অপেক্ষার প্রহর এখনো ফুরায়নি। ইলিয়াস আলীর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি কোনো স্পষ্ট বক্তব্যও। তবে এখনো তার ফের আসার ব্যাপারে আশাবাদী তার স্বজনরা। অপেক্ষায় আছেন দলের নেতাকর্মীরা। ইলিয়াস আলীর মা সূর্যবান বিবি এখনো আছেন ছেলের প্রতীক্ষায়। ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের পানি অনেকটা শুকিয়ে গেছে।

ইলিয়াস আলী নিখোঁজের পর তাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে দেশব্যাপী গড়ে উঠে কঠোর আন্দোলন। আন্দোলন করতে গিয়ে ইলিয়াসের নির্বাচনি এলাকা বিশ্বনাথে প্রাণ হারান তিনজন। টানা কর্মসূচি পালন করেছিল কেন্দ্রীয় বিএনপিও। সিলেটেও ওই সময় টানা কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় বিএনপি।

স্বামীকে উদ্ধারের আবেদন জানাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ছুটে গিয়েছিলেন ইলিয়াস পত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনাও। গুমের দুই দিন পর তার স্ত্রী তাহমিনা রুশদীর লুনা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। তিনি সে সময় অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবৈধভাবে তার স্বামীকে আটক করেছিল। তখন দলের নেতারাও একই অভিযোগ তুলেছিলেন।

ইলিয়াস আলীকে আদালতে হাজির করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রতি হাইকোর্টের নির্দেশ চেয়েছিলেন ইলিয়াস পত্নী লুনা। তার রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ১০ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা চেয়ে রুল জারি করে বলেছিলেন, ইলিয়াস আলীকে অবৈধভাবে আটক করা হয়নি এ মর্মে সন্তুষ্ট হওয়ার জন্য কেন তাকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হবে না। তবে সেই রিট আবেদনের শুনানির বিষয়ে কোনো উদ্যোগ আজও পরিলক্ষিত হয়নি।

এদিকে, নিখোঁজের ৯ বছরের মাথায় (গত বছর) ইলিয়াস আলীকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর এক মন্তব্য করেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ইলিয়াস আলীকে গুম করেনি। ইলিয়াস আলীকে গুম করার পেছনে ভেতরের কয়েকজন নেতা দায়ী। ওইসব নেতাদের অনেকেই চেনেন।

গত বছরের ১৭ এপ্রিল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনা এবং এম ইলিয়াস আলীকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে আয়োজিত ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেছিলেন মির্জা আব্বাস।

সিলেট বিভাগ জাতীয়তাবাদী সংহতি সম্মেলনী-ঢাকার উদ্যোগে আয়োজিত ভার্চুয়াল ওই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত ছিলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম।

মির্জা আব্বাস সেদিন বলেন, ‘আমি জানি আওয়ামী লীগ তাকে গুম করেনি। তাহলে গুমটা করল কে?

ইলিয়াস আলী গুমের পেছনে দলের কতিপয় নেতার ইন্ধন রয়েছে জানিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘গুম হওয়ার আগের রাতে দলীয় অফিসে কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয় মারাত্মক রকম। ইলিয়াস খুব গালিগালাজ করেছিলেন তাকে। সেই যে পেছন থেকে দংশন করা সাপগুলো, আমার দলে এখনো রয়ে গেছে। যদি এদের দল থেকে বিতাড়িত না করেন, তাহলে কোনো পরিস্থিতিতেই দল সামনে এগোতে পারবে না।’

এসময় ইলিয়াস আলীকে যারা গুম করেছে তাদের বদমাইশ উল্লেখ করে বিচার দাবি করেন মির্জা আব্বাস। বলেন, ‘আমার দলের ভেতরে লুকায়িত যে বদমাইশগুলা আছে- দয়া করে তাদের একটু সামনে আনার ব্যবস্থা করেন, প্লিজ।’

ইলিয়াস আলীর গুমের খবর ওই দিন রাত দেড়টা থেকে পৌনে দুইটায় পেয়েছিলেন জানিয়ে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস বলেন, ‘গুমের সংবাদ পাওয়ার পর পরিচিত যারা ছিলেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান- ইলিয়াস আলীকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং- যে পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে তাকে নেওয়া হলো, সেই পুলিশ কর্মকর্তাদের আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এই খবর আপনারা কেউ জানেন না। পুলিশের গাড়িতে যে কজন কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের আজও পাওয়া যায়নি। যেমন ইলিয়াস আলীর চালককেও পাওয়া যায়নি। তাহলে এই কাজটা করল কে?’

মির্জা আব্বাসের এই বক্তব্যের পর বিএনপির অভ্যন্তরে ঝড় উঠে। পাশাপাশি রাজনীতিসচেতন মানুষের মাঝে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।

কিন্তু বিএনপির শক্তিধর নেতা ইলিয়াস আলী ‘নিখোঁজ’র বিষয়ে নানা গুঞ্জন তথ্য-গুঞ্জন বাতাসে ভেসে বেড়ালেও আজ পর্যন্ত সঠিক ও গ্রহণযোগ্য কোনো তথ্য মেলেনি তাঁর বিষয়ে। ইলিয়াস আলী ‘নিখোঁজ’র বিষয়টি দীর্ঘ ১০ বছরে রহস্যই থেকে গেলো।

শেয়ার করুন