৫ এপ্রিল ২০২২


সখী এনে দে তাহারে

শেয়ার করুন

কমল খোন্দকার : দাস পাড়ার নিস্তরঙ্গ জীবনে আজ রাসলীলার জমজমাট মেলা। ঘিঞ্জি দাস পাড়ার আবর্জনা ফ্যালার একমাত্র মজে যাওয়া ডোবাটায় ভেসে ব্যাড়াচ্ছে স্বর্ণচাঁপার ফুলে ফেঁপে ঢোল হয়ে ওঠা শরীরটা। মৌচাকের মৌমাছির মতই ডোবাটাকে ঘিরে জনতার ভীড়।

কোন দুঃখে আত্মঘাতী হলো চঞ্চলমতী মেয়েটা?দুই দিন হলো অবশ্য পাড়ায় দেখা যাচ্ছিল না ওকে। নাচুনি মেয়ে, ধরেই নিয়েছিলসবাই, কোন না কোন কুটুম বাড়ি বেড়াতে গিয়ে হয়তো ধেই ধেই করে নেচে বেড়াচ্ছে স্বর্ণ!

কে রাখে কার খোঁজ! সারাদিনের অন্ন জোগাতে পুরুষগুলোর বেশিরভাগকেই সকাল সকাল চারটে নুন পান্তা গিলেই ছুটতে হয় জুতো সেলাইয়ের কাজে। মেয়েরা যায় মুসলমানের বাড়িতে ঘর কিংবা কাপড় ধুতে। ওদের হাতের রান্না খায় না বলে মুসলমানদের রান্নাঘরে ঢোকা হয় না ওদের। গতরাতেই শুধু এ বাড়ি ও বাড়ি স্বর্ণচাঁপার খোঁজ তালাসে চিন্তিত মুখে দ্যাখা গেছে লীলা দাসীকে ।

স্বর্ণচাঁপা! মুচির মেয়ের এরকম কাব্যিক নামে অনেকেই ত্যারছা চোখে তাকাতো স্বর্ণ’র দিকে। তাকানোর পর অবশ্য স্বীকার করতেই হতো, নামের সাথে পুরোপুরি মিলে যায় স্বর্ণ’র রূপ। আসলেই সোনা বরণ রং আর চলনে চাঁপা ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে পড়তো স্বর্ণচাঁপার শরীর বেয়ে। ফিঙে পাখির চাপল্যে যখন পথ চলতো ও, তখন আশেপাশের আশি থেকে আঠারো, সবারই বুকে ছড়িয়ে পড়তো হাহাকারের ছড়াছড়ি। চলন নয় যেন ধারালো ছুরিতে এ ফোঁড় ও ফোঁড় হয়ে যেতো বৃদ্ধ থেকে শুরু করে তারুন্যে ভরা হৃদয়গুলো।

জনতার ভীড়ের এক কোণে দাঁড়িয়ে টকটকে লাল চোখে স্বর্ণ’র ব্যাঙের মত ফুলে ওঠা চিৎ হয়ে ভাসতে থাকা দেহটার দিকে এতক্ষণ ধ্যানমগ্ন হয়ে তাকিয়েছিলো অজয়। হঠাৎই স্বর্ণ’র মা লীলা দাসীর গগন বিদারী আর্তনাদে চমকে ওঠে ও।

দাস পাড়ার তস্য গলিতে সহজে পা মাড়ায় না শহরের পুলিশ। কোন দরদীর ডাকে এই পড়ন্ত বিকেলে হাজির হয়েছেন তেনারা, কে জানে! লাঠি দিয়ে ছাগল গরু তাড়ানোর মত জনতাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়ে দাস পাড়ারই একজনকে ডোবায় নামায় পুলিশ। কান্নার বিরতির ফাঁকে এই দৃশ্যে আবারও আর্তনাদে আকাশ পাতাল সচকিত করে কেঁদে উঠে লীলা দাসী। স্বর্ণ’র বিকৃত শরীরটার দিকে আর তাকাতে ইচ্ছা করে না অজয়ের। শেষবারের মতো স্বর্ণকে নিবিড় দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে ধীরে ধীরে ওখান থেকে সরে আসে ও।

ঘুমে জড়িয়ে আসে অজয়ের চোখ। বাড়ি ফিরে যেতে সায় দ্যায় না মন। আজকাল বড্ড ঘ্যানোর ঘ্যানোর করে বুড়িটা। ছানি পড়া চোখে দেখতেও পায় না ভাল করে। ভাত তরকারিতে প্রায়ই ছাগলের নাদি, টিকটিকির লেজ বেছে খেতে হয় ওকে। চোখে না দেখলেও মুখের বিষে কমতি নেই একটুও। অষ্টপর মুখ চালায় বুড়ি…

‘ওই গু মুত খেইয়েই পইড়ে থাক শুয়োর! কোন্ মেইয়ের বাপের ঠ্যাকা পইড়েচে গাঁজাইড়ে হতভাগার হাতে মেইয়ে দিতে? মইরে পইড়ে থাকলে মা কালির চরণে জোড়া পাঁঠা বলি দিইতেম ! নিজে হাতে দাহ কইরতেম প্যাটের কলঙ্করে! ‘

বুড়ির আস্তাকুঁড় মুখের সামনে পড়ার চেয়ে শশ্মান ঘাটের বটতলা অনেক শান্তির,অনেক মমতার জায়গা। পায়ে হাঁটা পথে কিছুটা দূর গিয়ে শশ্মান ঘাটের বাঁধানো বটতলার বেদীতে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে অজয়। হঠাৎ বাঈজী পায়ের ঘুঙ্ঘটের শব্দের মত ঝাঁঝালো হাসিতে চমকে ওঠে অজয়। বন্ধ চোখেই দাঁতে দাঁতে ঘষা লাগে ওর। মনে মনে বলে, ‘ শালী বারোয়ারী মাল, ভরেছে তো কোলা? ‘

অজয়ের বুকে বর্শার ফলাটা আস্ত ঢুকিয়ে সেদিন হেসেছিলো স্বর্ণ। ‘বুঝলি, সাক্ষাৎ শিবের দ্যাখা মিইলেচে এবার! তোর মতোন বোম ভোলানাথ না। মা’ও পছন্দ কইরেচে ষস্টি দাসেরে। যেমন ঘর তেমন বর! হি হি হি…’

কিছু দিন থেকেই এঁটুলির মতো পড়েছিলো শালা স্বর্ণদের বাড়ি। কোন্ জোড়াতালি দেয়া আত্মীয়তার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে হাজির হয়েছিলসম্বন্ধীর পুত, সেটা ভালো করেই জানে অজয়। অজয়ের কুঁড়ের দুই গজ তফাতেই স্বর্ণ’র ঘর। চৌপর দুই ঢ্যামনা ঢ্যামনির ছেনালিতে ঘরে টেঁকা দায় হয়ে উঠেছিলো অজয়ের। গাঁজা, সিদ্ধি, কাপালিকের কারণ বারি কোনটাতেই নেশা হয় না কিছুতেই। মনে মনে আবারও দাঁতে দাঁত চেপে স্বর্ণ’র উদ্দেশ্যে খিস্তির বন্যা বইয়ে দ্যায় অজয়।

‘ডোমের হাতে এবার ছিঁইড়ে ছুইটে টুকরা টুকরা হ’ মাগী! রূপের দেমাগে মাটিতে পা পড়েনি মনসা দেবীর! ডোমও এখন তোর ওই পচা গলা ঘেন্নাঘাঁটি রূপ ছুঁইতে বমি উইগরে দেবেনে রে শালীর ছেনাল মাগী কোনেকার! ‘

অজয়কে নিয়ে কম খেলা খেলেনি স্বর্ণ। অজয়ের বন্ধ চোখের তারায় নেচে বেড়ায় ঘাসের ডগায় সকালের রোদে ঝিকিয়ে ওঠা শিশির বিন্দুর মতই স্বর্ণচাঁপার সুসজ্জিত দাঁতের ঝমঝম হাসি। যতবারই ওকে দেখে ছেনালি হাসিতে খুন চাগিয়ে দিয়েছে মাথায়, ততবারই অসহনীয় যন্ত্রণায় উন্মাদ অজয় স্থান কাল ভুলে জড়িয়ে ধরেছে ওকে। পিশে ফেলতে চেয়েছে ওর বর্ণবহুল নাগিনী হিল্লোল তোলা কামুক অঙ্গের সমস্ত রূপ সৌন্দর্যকে। অজয়কে উন্মাদ করে হাঁচড়ে পাঁচড়ে খামচে কামড়ে দৌড়ে পালিয়েছে হারামজাদি অজয়ের বেষ্টনী থেকে।

একবার, শুধু একবার ঘোর অমাবশ্যা রাতে দাস পাড়ার বাঁশঝাড়ের মধ্যে সর্বশক্তিতে টানতে টানতে বিষে ভরা সুন্দর নাগিনীটাকে মাটিতে পেড়ে ফেলতে পেরেছিলো অজয়। দৃশ্যটা পরিষ্কার ফুটে ওঠে অজয়ের চোখের সামনে। প্রায় দেড় ঘন্টার দাপাদাপির পর চিরে যাওয়া ঠোঁটের রক্ত সাপের মতই লিকলিকে জিভে চেটে নিতে নিতে অজয়ের দিকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে ডাইনির মতোই হেসেছিলো ছেনালটা। বলেছিলো, ‘ ভারি আমার মরদ উইঠে এইয়েচে গো! এ আগুন নেভাইনে অতই সহজ না রে ভোলানাথ। একদিন রাইক্ষইসে বাঘ সেইজে আসিস দিনি! সেইদিন দেখবি খ্যাপা বাঘিনীর কামড় কারে কয়! ‘

অন্ধকার রাতেও সেদিন চরম পরিতৃপ্তির খেলা দেখেছিলো অজয় স্বর্ণ’র চোখে মুখে। তারপরেও মাগীর মুখের ফোঁসফোঁসানিতে পৌরুষে ঘা লেগেছিল অজয়ের। তপ্ত আগুনের ভাটাটাকে ছাই বানাতে আবারও মাটিতে পেড়ে ফেলতে চেয়েছিলো ও শঙ্খ নাগিনীকে। কিন্তু বাঁশ বাগানে ঠিক সেই সময়েই কাদের যেনো ফিসফিসানিতে সুযোগ বেরিয়ে গিয়েছিলো সে রাতে অজয়ের হাত ফসকে। এখনও সেই অতৃপ্তির জ্বালায় জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যায় অজয়। ঘুম পালিয়ে যায় চোখ থেকে।

ঘোরের মাঝেই কখন কখন রাত নেমে এসেছে টের পায়নি অজয়। নেশাটাকে আজ যে করেই হোক জমাতেই হবে ওকে। নয়তো পাগল হয়ে যাবে নির্ঘাত। উল্লসিত মৃত্যু ঘুরপাক খাচ্ছে স্বর্ণ’র অপমৃত্যুতে! উৎসবের রোল পড়েছে পেত্নী পাড়াতে!

প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতেই হিসনা পাড়ার বিশাল নির্জন মাঠ অতিক্রম করতে থাকে অজয়। ভাল রাতেই দাহ হবে মাগীর। মনে মনে হাসে অজয়। পূর্ণিমা না হলেও চাঁদের জেল্লা নেহাত কম না। দাহতে কী অংশ নেবে অজয়? মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করে ও।

দাস পাড়ার মরনে আবার দাহ! কোনরকমে মুখে একটু আগুন ছুঁইয়ে শশ্মান ঘাটের কাদা মাটিতে পুঁতে রাখা!
‘আমার মনের অষ্টপর জ্বলা চিতের আগুনেই তো নেত্য তোরে দাহ কইরে চইলেছিরে স্বর্ণ! ওসব লোক দেখাইনে দাহর মুখে পেচ্ছাপ করি আমি! ‘

নিজের সাথে কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে ওঠে অজয়। নাহ্! আরও জোরে দৌড়া অজয়! কাপালিক হৃদয় নন্দী পেসাদ সাইজে নে বইসে রইয়েচে তোর জন্য! জোর কদমে দৌড়া বাপ! ‘

সত্যি সত্যিই দৌড়াতে দৌড়াতেই কাপালিকের ডেরায় পৌঁছে যায় অজয়। ঘরের ভেতর আলো আঁধারির ভৌতিক খেলা। এরই মধ্যে ঝেড়ে পিটে ঝিম ধরে বসে আছে কয় গাঁজাড়ে। পদ্মাসনে গভীর ধ্যানে মগ্ন হৃদয় নন্দী। কপালে দগদগে সিঁদুরের ত্রিশূল! মুখ ভর্তি জংলা দাড়ির আড়ালে ঢাকা পড়েছে কাপালিকের আসল চেহারা। এক ঝাড় কোঁকড়া চুল ঝুঁটির বাঁধনে আটকা পড়েছে আজ। ভন্ড না তো শালা? প্রতি অমাবশ্যা তিথিতে শশ্মাণে গিয়ে কুমারী মেয়ের শরীরের বিশেষ বিশেষ অঙ্গগুলো তুলে আনে নন্দী কাপালিক। ধুপ ধুনো জ্বালিয়ে সেই হাড়গোড় নিয়ে প্রচন্ড নাদে মন্ত্র পড়ে আর হোম কুন্ডে ঘি ঢালে নন্দী। কাপালিকের গমগম মন্ত্র ধ্বনিতে ভয়ে কেঁপে ওঠে অজয়ের শরীর। তবুও মন্ত্রমুগ্ধের মতই হৃদয় নন্দীর মন্ত্রপাঠ শোনে অজয়।

‘ওঁ মম বৈরিবশং যাতঃ কান্ ভোগানুপলপ্স্যতে।
যে মমানুগতা নিত্যং প্রসাদ ধনভোজনৈঃ —
ওঁ সর্ব্বভূতা যদি দেবী স্বর্গমুক্তি প্রদায়িনী
ত্বং স্ততা স্ততয়ে কা বা ভবন্ত পরমোক্তয়ঃ–

মন্ত্রের তুবড়িতে বাতাস ঢোকার অবকাশ পায় না কাপালিকের মুখে।

কতবার স্বর্ণকে বশ করার মন্ত্র চেয়েছে অজয়। যতবার চেয়েছে ততবারই ঘন জংলার আড়ালে শুধু ব্যাটার চোখের নাচন দেখেছে ও । সাথে রহস্যময় হাসি ঝিকিয়ে উঠতে দেখেছে ওর অন্তর্ভেদী চোখের তারায়। যেন অজয়ের ভেতরটা পরিষ্কার ঝকঝকে দেখতে পাচ্ছে ব্যাটা। কাপালিকের ওই তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে আপনা আপনিই ঝুঁকে পড়েছে অজয়ের মাথা।

কাপালিকের ধ্যানের ফাঁকেই গাঁজার কলকেটা হাতে তুলে নেয় অজয়। শুধু গাঁজায় কাজ হবে না আজ। গাঁজাতে তাই সাদার পাতা মিশিয়ে কলকেতে আগুন দেয় অজয়। আগুনের ছোঁয়ায় পাক খেতে খেতে ধোঁয়া উঠে যায় চালের মাথায়। কষে বুক ভরে ফুসফুসে টেনে নেয় ও গাঁজার ধোঁয়া। একটানে মন ভরে না। পাগলা গাজনের উন্মত্ততা গ্রাস করেছে ওকে। দুই শ্বাসে নিঃশেষ হয়ে যায় কলকের ধোঁয়া। পাগলের মতোকাপালিকের সামনে থেকে একটা মাটির পাত্র তুলে নেয় অজয়। ঘন গাদের মত কালো রঙের এক রকমের তরল পদার্থ । কোন্ অমৃত রস বানিয়ে রেখেছে সাধু কে জানে! কোন কিছু না ভেবেই বিদঘুটে স্বাদের গাঢ় তরল পদার্থটি পেটে চালান করে দ্যায় অজয়। যে করেই হোক নেশাটা জমাতে আজ মরীয়া ও!

‘জয় মা তারা! কিসে খ্যান্ত হবি তুই চামুন্ডা? রক্তগঙ্গায় স্নান করাবো তোকে। আয় মা! তোর জন্য যে জবা ফুলের নরমুণ্ডুসাজিয়ে মালা গেঁথে রেখেছি! সন্তানের ভোগ নিতে আসবি না চামুন্ডা?
‘ওঁ করোতু সা নঃ শুভতেরীশ্বরী শুভানি ভদ্রাণ্যভিহন্ত চাপদঃ —
ওরে! তোর পবিত্র মন্ডপ যে আজও শূণ্য খাঁ খাঁ করছে মাগো! একবারটি আয় জননী আমার!’

শেষের দিকে কাপালিকের অসহায় উচ্চস্বরের বিলাপে চমকে তাকায় ঝিমিয়ে পড়া চোখগুলো। আচমকাই কান্না থামিয়ে হুংকার দিয়ে ওঠে কাপালিক –
‘হরি! শ্যামা মায়ের কেত্তন ধর !’

ধড়মড় করে উঠে বসে হরি। সাথে খোল করতাল ধরে অনিল আর সুদেশ। পদ্মাসনে আবারও গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয় হৃদয় নন্দী।
হরির অন্তরের আকুতিতে অবিরল জল ঝরে অজয়ের চোখে ।

‘মাগো চিন্ময়ী রূপ ধরে আয়
তোর মৃন্ময়ী রূপ পূজি শ্রী দূর্গা-
তাই দূর্গতি আর ঘুঁচলো না হায়…’

ঢুলতে ঢুলতে বেরিয়ে আসে অজয়। এলোমেলো পায়ে পার হয় হিসনা পাড়ার নির্জন মেঠো পথ। শশ্মানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে অজয়। শশ্মানকে কোনদিনই ভয় পায় না অজয়। কাদার নীচের পচা গলা দেহের আর কিইবা করার শক্তি থাকে !

মধ্য রাতের আলোয় ধুয়ে দিচ্ছে সরু নদীর জল। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয় অজয়ের। বাঁধানো বটতলার বেদিতে শুয়ে পড়ে ও। হঠাৎ অনেকগুলো তরুণীর মিলিত খলবল হাসিতে চমকে উঠে বসে ও। দাসপাড়ার হতচ্ছাড়ি মাগীর দল! রস কত! এই ভর মাঝরাতে জলকেলি করতে বেরিয়েছে হারামজাদিরা। খলবল করতে করতেই জলে নেমে পড়ে ওরা। ও! দলের সর্দারনিও এসেছে দেখি! তাই তো বলি, এরকম পাগল করা ঝর্না ধারায় ওই চোখখাকি ছাড়া আর কেইবা ভাসাতে পারে এমন করে?

হাস মাগীরা! ডুবে মর সব একসাথে! এ কী! অসভ্য নাগিনীটা তো খ্যামটা তালে এদিকেই এগিয়ে আসছে! খ্যামটার ঢং দেখে ওদিকে মাগীগুলোর খলখলানি যেনো দ্বিগুণ বেড়ে যায়। অজয়ের ঘোর লাগা মোহাচ্ছন্ন চোখে বিজলী ঝরাতে ঝরাতে স্বররণ ওকে টেনে নিয়ে যায় মাঝ নদীতে। অসংখ্য ঝলমলে নাগিনী ছোবলে দীর্ঘ দিনের নেশাশূণ্য অজয়ের চোখ প্রবল নেশায় ডুবে যায় এই চাঁদশূণ্য রাতের গহীন অন্ধকারে!

রোদের তীক্ষ্ণ থাবায় অনেক কষ্টে পিটপিটে চোখে চোখ মেলার চেষ্টা করে অজয়। কোথায় শুয়ে আছে ও? এত উত্তাপ কেন রোদের? পিঠের নীচে কেমন যেন নরম শীতল অনুভূতি। তাহলে বাড়ি না এটা ! পুরোপুরি চেতনায় আসতে আরও খানিকক্ষণ সময় বয়ে যায়। মুখের ওপর অনেকগুলো ঝুঁকে পড়া উদ্বিগ্ন মুখ দেখতে পায় অজয়। ওহ্! শরীরের ব্যথায় নড়তে চড়তেও বিষিয়ে উঠছে য্যানো শরীরটা! চোখে মুখে হাত বোলায় অজয়। হাতটাকে সামনে মেলে ধরে ও। চমকে ওঠে অজয় আধা শুকনো কালো রক্তে মাখামাখি ওর হাতের তালুর দিকে চোখ পড়ে!ধড়মড় করে উঠে বসে অজয়। নদী তীরে কাদার মধ্যে এতক্ষণ পড়েছিলো ও। সারা শরীর ধারালো নখের আঁচড়ে রক্তাক্ত!

ওর চারপাশে ঘিরে থাকা মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকায় অজয় ভ্যাবলার মতো। অজয়ের জ্ঞান ফেরা দেখে স্বস্তির আলো খেলা করে ঘিরে থাকা মুখগুলোতে।অনেকগুলো উচ্চ কণ্ঠএকসাথে ভেসে আসে অজয়ের কানে, ‘জল পেত্নী মেইরে ফেলতি জলে টেইনে নে ‘গিইয়েচিলো তোরে। মা গঙ্গার দয়ায় বেঁইচে গিইয়েচিস এ যাততারায়।’

একে একে সব মনে পড়ে অজয়ের। স্বর্ণ! প্রতিশোধ নিতে এসেছিলো স্বর্ণমধ্যরাতে! কিন্তু ওরই বা আর কী করার ছিলো! দীর্ঘ দিনের উপোষী বাঘের মুখের সামনে যদি টাটকা নরমাংস ঝুলিয়ে রেখে ওকে উপোসীই রাখে ভগবান, সে ভগবানে ভক্তি আসে কোত্থেকে?

তাও মেনে নিয়েছিলো অজয়। ওই আয়ান ঘোষটারে নিয়ে স্বর্ন যদি ওরকম ঢলাঢলিটা না করতো,তাহলে হয়তো খিদের জ্বালাটাও কোনমতে সহ্য করে নিতো অজয় । কিন্তু স্বর্ণযে খুনের আগুন উসকে দিলো ওর মাথায় ! ওকে নিকেশ না করে তো উপায়ও ছিলো না কোন। বেঁচে থাকলে এই নপুংসক না হলে আরেক নপুংশক -নাহয় আরেক -এভাবে একের পর এক লোলুপ লোভী চোখ গিলে খেতো স্বর্নকে। আবার পরের ঘর আলো করতে যেদিন চলে যেত স্বর্ন আরেকজনের হাত ধরে, তখন তার সাথে উন্মাদিনী স্বর্ণ’র লীলা কেত্তন য্যানো স্বচক্ষে দেখতে পেতো অজয়। আগুন মাথায় ঝড়ের তাণ্ডবে ছারখার করে দিতে ইচ্ছা হতো পুরো পৃথিবীটাকে ওর। পশুর যন্ত্রণায় এভাবে কাঁহাতক মুখ বুঁজে প্রতি মুহূর্তে বিষের ছোবল সহ্য করে বেঁচে থাকা যায়?

নেশাখোর বাউন্ডুলের হাতে কোনদিনই স্বর্ণকে তুলে দিতো না রূপবতী মেয়ের গর্ববতী মা লীলা দাসী। তার চেয়ে এই ভালো। মরেই বেঁচে থাক স্বর্ন! মৃত স্বর্ন’র দেহটাতে ভারা বেঁধে প্রবল ঘৃনায় অজয় আছড়ে ফেলেছিলো ওকে ডোবার জলে! তামাম দুনিয়াকে জানান দিতে ভেসে উঠেছে আজ স্বর্ণ’র বিভৎস দেহ!

মনে পড়ে, যখন উন্মাদ খুনী অজয় বাঁশ বাগানের ঘন জঙ্গলের মধ্যে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে সর্বশক্তিতে টিপে ধরছিলো স্বর্ন’র মরাল গ্রীবা, তখন প্রাণপণে গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে বলতে চেয়েছিলো স্বর্ণ,

‘একবার বিশ্বেস কর, তোকেই ভালবেইসে এইয়েচি এ্যাতোকাল। তোর মনে জ্বালা– ধরাতি— ষস্টিরে– নিয়ে -একটু –ফস্টি– নস্টি –কই-রেচি – খেইলে-চি –ও-রে– নি–য়ে — মা –রি—স—নে—অ—জ—য়—
তু—ই—আ—মা—র—শি—ব—ঠা—কু—র— ‘

স্বর্ণ’র মরণহাহাকারে কেঁপে ওঠে অজয়ের গোটা বিশ্ব!দুপুরের সূর্যদেব হেসে ওঠেন প্রবল প্রতাপে! পুড়ে খাক হয়ে যায় নির্জন শশ্মান ঘাট! এক সাহারা হাহাকারের মত ধ্বনি প্রতিধ্বনিতে মন্ত্র বাজে আকাশে বাতাসে…

‘ওঁ জ্ঞানিনামপি চেতাংসি দেবী ভগবতী হি সা
বলাদাকৃষ্য মোহায় মহামায়া প্রযচ্ছতি…’

ডুকরে কেঁদে উঠে অজয় কাদায় মুখ গুঁজে!

শেয়ার করুন