২৮ মার্চ ২০২২


সম্মেলনের নাটকে ‘ঘনীভূত’ বিএনপির দলীয় কোন্দল

শেয়ার করুন

আকাশ চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : দল গোছানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। আর তার অংশ হিসেবেই সিলেট জেলা কমিটির সম্মেলনের ঘোষণা এবং ভোটের মাধ্যমে প্রধান তিন নেতা নির্বাচনের উদ্যোগ। কিন্তু তাতে আরও বিপাকে পড়ে গিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা দলটি। এতে দলের বিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়ে এখন হ-য-ব-র-ল অবস্থা সিলেট জেলা বিএনপিতে।

শুরু হয়েছিলো সিটি কর্পোরেশেনর মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতি প্রার্থিতা ঘোষণায় সম্মেলন স্থগিতের মধ্য দিয়ে। এরপর মঙ্গলবার নির্বাচন পরিচলানা কমিটির বৈঠকে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী কামরুল ইসলাম শাহীন ও সাংগঠনিক সম্পাদক প্রার্থী শাকিল মোর্শেদের মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। আর আগের দিন মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী আবদুল আহাদ খান জামালের।

ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় কামরুল ইসলাম শাহীন ও শাকিল মোর্শেদের এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের পদে থাকায় আব্দুল আহাদ খান জামালের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে বলে জানান নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আব্দুল গাফ্ফার।

তবে যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে এর ‘নেপথ্যে ষড়যন্ত্র’ দেখছেন তারা।

মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক আব্দুল আহাদ খান জামাল বলেন, ‘অঙ্গসংগঠনের পদে থাকার কারণ দেখিয়ে আমার মনোয়ন বাতিল করা হয়েছে। অনেক উপজেলায় অঙ্গসংগঠনের পদে থাকা নেতারা বিএনপির শীর্ষ পদে ঠাঁই পেয়েছেন। আমার মনোনয়নপত্র অবৈধ হলে তারা কীভাবে পদ পেলেন?’

আর কামরুল ইসলাম শাহীন বলেন, ‘আমি ওয়ার্ড পর্যায়ের বিএনপির সঙ্গে জড়িত আছি, তবু আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এর পেছনে ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য চিঠি দিয়েছি।’

সিলেট জেলা বিএনপির সম্মেলন ও কাউন্সিল হওয়ার কথা ছিল ২১ মার্চ। কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচনের ঘোষণা দেয় দলটি। সব প্রস্তুতিও হয়েছিল। তবে ঠিক এক দিন আগে তা স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

আর এর একদিন পরেই মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে ‘দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে’ সভাপতি পদে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন মেয়র আরিফ।

ওইদিন রাতেই বৈঠক করে ২৯ মার্চ কাউন্সিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করে সিলেটে জেলা বিএনপি। কেন্দ্রে ওইদিনই এই প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অনুমোদন দিয়ে দেন।

আরিফের মনোনয়নপত্র প্রত্যহারের পর জেলা বিএনপির সভাপতি পদে লড়াইয়ে আছেন শুধু আবুল কাহের চৌধুরী শামীম ও আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।

এক প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার এবং তিন প্রার্থীর বাতিল হওয়ায় সিলেট জেলা বিএনপির তিন পদে লড়ছেন ৯ জন। এর মধ্যে দুই সভাপতি প্রার্থী ছাড়া সাধারণ সম্পাদক পদে আ. ফ. ম. কামাল, আলী আহমদ, ইমরান আহমদ চৌধুরী ও মো. আব্দুল মান্নান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে এম মুজিবুর রহমান মুজিব, লোকমান আহমদ ও মো. শামিম আহমদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

তবে এখন বিএনপিতে মূল আলোচনা সম্মেলন স্থগিত করা নিয়েই। এর পেছনে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির আহবায়ক খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের ইন্ধন ছিল বলেই দলের ভেতরে অনেকের ধারণা।

আরিফুল হক চৌধুরীকে ঠেকাতেই জেলা সম্মেলন স্থগিত করা এবং তাকে সভাপতি পদ থেকে প্রার্থীতা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছে বলেও দলের ভেতর থেকেই বলা হচ্ছে।

তবে কেউ কেউ আরিফকেই দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকে দলের মধ্যে ‘নিস্ক্রিয়’ থেকে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীদের সঙ্গে ‘দহরম-মহরম’ চালিয়ে যাচ্ছেন আরিফুল হক। তারা বলছেন সম্মেলনের ঠিক চার দিন আগে — ১৬ মার্চ – আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়ায় আরিফুলের ওপর আরও রুষ্ট হয় দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব

সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন বলেন, ‘উনি মেয়র পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। তাকে অনেক কিছু ম্যানেজ করে চলতে হয়। স্থানীয় সাংসদ ও মন্ত্রীদের সঙ্গে তাকে সুসম্পর্ক রাখতে হয়। তাই এই মুহূর্তে দলের দায়িত্ব নিলে তার এসব ম্যানেজ করতে সমস্যা হতে পারে। এতে দলের কার্যক্রমের পাশপাশি সিলেটের উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে। এসব কারণে তাকে সভাপতি পদে প্রার্থিতা থেকে সরে যেতে বলা হয়েছে।’

আরিফুল হক চৌধুরী চারদলীয়জোট সরকারের আমলে ছিলেন ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার। সেসময়কার অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের আশির্বাদে গোটা সিলেটে তিনি বিস্তার করেন আধিপত্য। ছিলেন নগর উন্নয়ন কমিটির সভাপতিসহ নানা পদে। তার জন্য ছিল পুলিশি প্রটোকল।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য আরিফুল হঠাৎ করেই জেলা কমিটির সভাপতি প্রার্থী হন। তার প্রার্থী হওয়া বদলে দেয় সিলেট বিএনপির রাজনীতির হিসাব-নিকাশ। এই ঘোষণা দ্বিধাবিভক্ত বিএনপির পুরোনো বিরোধকে উসকে দেয়।

কয়েকজন নেতা জানান, সিলেটে বিএনপি এখন মূলত দুই ধারায় বিভক্ত। এক বলয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। অন্য বলয়ের নেতৃত্বে আরিফুল হক চৌধুরী।

তবে সিলেট বিএনপিতে আধিপত্য এখন মুক্তাদিরের। এই আধিপত্যে ভাঙন ধরাতেই আরিফ জেলা বিএনপির সভাপতি প্রার্থী হয়েছিলেন বলে জানান তারা।

২০১৯ সালের অক্টোবরে জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কথা ছিল কয়েক মাসের মধ্যেই

পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হবে। কিন্তু তা আড় হয়নি। আর দলও গতি পায়নি অভ্যন্তরীন কোন্দলে। এবার সম্মেলন স্থগিত, আরিফুলের প্রার্থীতা প্রত্যাহার এবং অন্যদের মনোনয়ন বাতিলে নতুন করে কোন্দল আরও ঘণীভুত হয়ে উঠছে।

শেয়ার করুন