১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২
কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : ফেঞ্চুগঞ্জ শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল)-এর বিভাগীয় প্রধান খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল ও রসায়নবিদ নেছার উদ্দিন আহমদসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জাল-জালিয়াতি ও ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে তারা নতুন করে ১৩ কোটি ৬৭ লাখ ৫ হাজার ৪৫৬ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর আগে গত ৪ আগস্ট মঙ্গলবার খোন্দকার ইকবাল ও নেছার উদ্দিন আহমদসহ চক্রটির বিরুদ্ধে ৩৮ কোটি ৭১ লাখ ২৪ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় সিলেটের উপ-পরিচালক মো. নুর-ই-আলম বাদী হয়ে আরও ১৫ টি মামলা দায়ের করেন।
নতুন দায়েরকৃত মামলার অপর আসামিরা হলেন- খোন্দকার ইকবালের স্ত্রী মোছা. হালিমা আক্তার ও শ্যালক মো. জামসেদুর রহমান, ঠিকাদার মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ এর মালিক মো. হেলাল উদ্দিন ও সানশাইন আই টি সল্যুউশন এর মালিক মাসুদ রানা। এর মধ্যে তিনটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে মেসার্স নুসরাত ট্রেডার্স, মেসার্স টি আই ইন্টারন্যাশনাল ও ইউটোপিয়া প্রোপ্রার্টিজ-এর মালিক মোছা. হালিমা আক্তার। এছাড়া, ড্যাফোডিলস ইন্টারন্যাশনাল এর মালিক মো. জামসেদুর রহমান খোন্দকার।
দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় সিলেটের উপ-পরিচালক মো. নূর-ই-আলম বলেন, এই চক্রটি নামে-বেনামে, ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে। খোন্দকার ইকবালের নেতৃত্বে চক্রটি বিভিন্ন সময়ে ওই টাকা লুটে নেয়। চক্রটির বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ২৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এখন মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম চলবে। আসামিদেরকে যেকোনো মুহূর্তে গ্রেফতার করা হবে বলে জানান তিনি।
দুদক সূত্র জানায়, ১৩ কোটি ৬৭ লাখ ৫ হাজার ৪৫৬ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় নতুন ১১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। দন্ডবিধির ৪২০/৪০৬/৪০৯/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা তৎসহ ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলাগুলো দায়ের করা হয়।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির হিসাব বিভাগীয় প্রধান খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবালের নেতৃত্বে চক্রটি এ সারকারখানা থেকে সবমিলিয়ে ৫২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। এজন্যে খোন্দকার ইকবাল তার স্ত্রী মোছা. হালিমা আক্তার ও শ্যালক মো. জামসেদুর রহমানের নামে গড়ে তুলেন নাম সর্বস্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কেবল স্ত্রী বা শ্যালকই নয়; কোম্পানির সাবেক রসায়নবিদ নেছার উদ্দিন আহমদ ও আট ঠিকাদার মিলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে এ চক্র। এই চক্রের বিরুদ্ধে গত পরশু ১১টি মামলা দায়ের করে দুদক । এর প্রায় ৭ মাস আগে ওই চক্রের বিরুদ্ধে দুদক আরও ১৫ টি মামলা দায়ের করে।
মঙ্গলবার দায়ের করা প্রথম মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল ও তার শ্যালক মো. জামসেদুর রহমান খোন্দকার ভুয়া বিলের মাধ্যমে ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্পের অনুকূলে জনতা ব্যাংক লি. কর্পোরেট শাখা, দিলকুশা, ঢাকায় পরিচালিত একাউন্ট থেকে ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৫৫৮ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন।
২য় মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, একই সময়ে, একই শাখা থেকে ফার্টিলাইজার কোম্পানির সাবেক রসায়নবিদ নেছার উদ্দিন আহমদ ও খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল মিলে ৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৯১ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন।
৩য় মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল একা ওই শাখা থেকে ভুয়া বিলের মাধ্যমে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৫ হাজার ৬৬২ টাকা উত্তোলন করেন।
৪র্থ মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, রসায়নবিদ নেছার উদ্দিন আহমদ ও খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল মিলে একই শাখা থেকে কোনো প্রকার বিল ভাউচার ছাড়াই ১৫ লাখ ৭০ হাজার ৭৭০ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন।
৫ ম মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল ও তার স্ত্রী মোছাঃ হালিমা আক্তার কোনো ধরনের বিল ভাউচার ব্যতীত উত্তোলন করেন ৪ কোটি ৮৮ লাখ ২৮ হাজার ৭৭০ টাকা।
৬ষ্ঠ মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল ও তার স্ত্রী মোছাঃ হালিমা আক্তার একইভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তোলন করে নেন ৩ কোটি ৫ লাখ ৬৮ হাজার ২৫৫ টাকা।
৭ম মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল ও তার শ্যালক মো. জামসেদুর রহমান খোন্দকার মিলে বিল ভাউচার ছাড়াই ৬৬ লাখ ১৮ হাজার ৪৩৫ টাকা তুলে নেন।
৮ম মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল ও ঠিকাদার মো. হেলাল উদ্দিন মিলে বিল ভাউচার ছাড়াই তুলে নিয়েছেন ৯৫ লাখ ৮১ হাজার ৩২৭ টাকা।
৯ম মামলার এজাহারে বলা হয়, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল বিল ভাউচার ব্যতীত ২ লাখ ৬ হাজার ১৫০ টাকা তুলে নেন।
১০ম মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল ও তার স্ত্রী মোছাঃ হালিমা আক্তার মিলে ২ কোটি ৩৬ লাখ ৯৭ হাজার ৪৯৫ টাকা তুলে নিয়েছেন।
১১ তম মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল ও ঠিকাদার মাসুদ রানা মিলে ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৪৯৫ টাকা তুলে নেন। উপরোক্ত ৬ আসামি শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্পের অনুকূলে জনতা ব্যাংক লি. কর্পোরেট শাখা, দিলকুশা, ঢাকায় পরিচালিত একাউন্ট থেকে এই টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছে।
দুদক সূত্র জানায়, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্পের উন্নয়ন কাজে অনিয়ম, দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার ও পরস্পর যোগসাজসে ভুয়া বিল-ভাউচারে আসামিরা উল্লিখিত টাকা আত্মসাৎ করে। এছাড়া কেনাকাটা, গাড়ি সার্ভিসিং, গাড়ি মেরামত, গাড়ি ভাড়া, আপ্যায়ন, ভুয়া সম্মানী ভাতা প্রদান, খাবার বিল, ফটোকপিসহ নানা উৎস থেকে ভুয়া বিল দাখিল করে ওই টাকা আত্মসাৎ করা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) নিজস্ব অডিটে বিপুল পরিমাণ এই সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি ধরা পড়ে। বিসিআইসি’র অডিটে বিষয়টি ধরা পড়ার পর এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানির সহকারী হিসাবরক্ষক (হিসাব বিভাগীয় প্রধান) খন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন ও রসায়নবিদ নেসার উদ্দিন আহমদের দুর্নীতির বিষয়টি উঠে আসে। এর পরপরই খোন্দকার মুহাম্মদ ইকবাল ও অপর আসামি প্রতিষ্ঠানের সাবেক রসায়নবিদ নেছার উদ্দিন আহমদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের শুরুতে ১৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ওই বছরের ২৪ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানির নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মোট ৫ হাজার ৮১২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি। সরকারি মালিকানাধীন এই সার কারখানা দৈনিক ১ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন সর্ববৃহৎ ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এর উৎপাদন শুরু হয়।