৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২


জমজমাট জুয়ার আসর, অর্থ যাচ্ছে ভারতে

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেট নগরীতে কিছুতেই থামছে না ভারতীয় শিলং তীর জুয়া, বন্ধ হচ্ছে না ভারতে অর্থপাচার। তীরজুয়ার মাধ্যমে প্রবাসী অধ্যুষিত এই সিলেট থেকে ভারতীয়রা হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে পাঠানো হচ্চে এ টাকা। মাঝেমধ্যে আইওয়াশ অভিযানে কিছুসংখ্যক চিছকে ও ক্ষুদে জুয়াড়ী ধরা পড়লেও রাগব বোয়ালরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারাই জুয়া আইনের ফাক বের করে আনে ধৃত জুয়াড়ীদের। কয়েকদিন পর পর নাম মাত্র পুলিশী অভিযানে গুটি কয়েক জুয়ারী গ্রেফতার হলেও মুল হোতারা বার বারই চলে যায় ধরা ছোয়ার বাহিরে। আর যারা গ্রেফতার হয় তারাও আদালতে মুচলেখা দিয়ে বেরিয়ে আসে অনায়াসে। ফলে কিছুতেই বন্ধ হচ্ছেনা এসব জুয়ার আসর ও অর্থ প্রচার।

নগরীর কালীঘাট পেয়াজপট্টি, বন্দরবাজার রংমহল টাওয়ার সংলগ্ন মেথরপট্টির সামন, বাগবাড়ি, ঘাসিটুলা বেতের বাজার প্রভৃটি এলাকায় টোকেন ও মেবাইল নেটের মাধ্যমে বসে তীরজুয়ার জমজমাট ডিজিটাল আসর। জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত টাকা সিলেটের এজেন্টরা ইংল্যান্ড অথবা অন্য কোন দেশের মাধ্যমে বিভিন্ন পন্থায় মানি লন্ডারিং করে ভারতের শিলং-এ প্রেরণ করে থাকে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় তিন দশক আগে ভারতীয় ধনকুবেররা এ রকম খেলাটি আবিষ্কার করেছিল। এর নাম রাখে মেঘালয়ের আঞ্চলিক ভাষায় ‘তীর খেলা’। এই শিলং তীর খেলাটির নিয়ম হচ্ছে এদেশের এজেন্টদের মাধ্যমে ০-৯৯ পর্যন্ত নম্বর বিক্রয় করা হয় ১০ টাকা থেকে শুরু করে যেকোনো মূল্যে। লটারিতে ০ থেকে ৯৯ পর্যন্ত কোনো সংখ্যা কিনে নেওয়া যায়। সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজি ধরা হয়। যত মূল্যে সংখ্যাটি বিক্রয় করা হয় তার ৭০ গুণ লাভ দেয়া হয় বিজয়ী নম্বরকে। অর্থাৎ- ১০ টাকায় ৭০০ টাকা। একই নম্বর এশাধিক লোকও কিনতে পারেন। সবাই কেনা দামের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি টাকা পাওয়ার লোভে এই শিলং নামে জুয়ায় বাজি ধরছেন। প্রতিদিন বিকাল সোয়া ৪টায় ও সাড়ে ৫টায় ও রাত সাড়ে ১০টায় এ লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। খেলার ফলাফল দেওয়া হয় অনলাইনে। ভারতের শিলং থেকে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জুয়ার আসরটি পরিচালনা করা হয়। আর এ ওয়েব সাইটের মাধ্যমে এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোনেও ফলাফল জানা যাচ্ছে। আর এসব জুয়ার নেতৃত্বে রয়েছে এলাকার প্রভাবশালী কিছু লোকজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, এনড্রয়েড ফোন সেটের মাধ্যমে নম্বর বইয়ের মালিকরা দেখান ও রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে নম্বর টোকেন বিক্রি করেন।

জানাযায়, নগরীর কালীঘাট পেয়াজপট্টির পেছনে স্থানীয় প্রসাশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে নদীর পাড়ে বসে জমজমাট জুয়ার আসর। এই আসরে তীর শিলং ছাড়াও ঝান্ডু-মান্ডু সহ চলে বিভিন্ন প্রকারের জুয়া। এই দুই জুয়ার বোর্ড বসিয়ে দিনমজুর থেকে অনেকে হয়ে উঠেছেন কোটিপতি। পাশাপাশি জ্ঞাতআয় বহির্ভুত টাকা কামাই করছে জুয়ারিদের সহযোগী কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা। এই আসরের মুল হোতা মিজান ওরফে টুকাই মিজান।

দুপুর থেকেই জমতে থাকে কালিঘাটের পেয়াজপট্রির পেছনের নদীর পাড়ের জুয়ার আসর। তীর জুয়া খেলতে সারি বেঁধে আসছেন নানা পেশার লোকজন। তাদেরকে ১০,২০,৫০,১০০ ও ৩০০ টাকার বিনিময়ে একটি টোকেন দেয়। কেউবা একাধিক টোকেনও নিয়ে থাকে। এমনকি কেউ কেউ একসাথে ২০টি টোকেনও নিচ্ছেন। এ যেন কোনো যানবাহনের অথবা চিকিৎসকের টিকিট না, এই টোকেন হচ্ছে শিলং তীর খেলার। প্রতিদিন তীর খেলার ফল প্রকাশের মিজানের বের্ডে রাতে বসে ঝান্ডু-মান্ডু জুয়া আসর। দল বেধেঁ জুয়াড়িরা ঝান্ডু-মান্ডুর খেলেন। নদীপারের এই মিজানের জুয়ার বোর্ডেও রয়েছে একাধিক কমিশন পার্টনার, যারা দিনে শিলংতীর আর রাতে ঝান্ডুমুন্ডু জুয়া পরিচালনা করে থাকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ের কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা প্রতি সপ্তাহে এসব জুয়ার বোর্ড মালিকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে সুবিধা নেওয়ায় এই শিলং নামে জুয়া খেলা কিছুতেই থামছে না। যার ফলে প্রশাসনের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে অভিযানে মাঝে মধ্যে তীর খেলা বন্ধে অভিযান চললেও কোনো সুফল মিলছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে কালিঘাট এলাকায় শিলং তীর এবং ঝান্ডুু-মান্ডু খেলার উৎপাত দ্বিগুণ হারে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ এলাকায় প্রকাশ্যেই শিলং তীর খেলার টোকেন বিক্রি হওয়ায় নারী-পুরুষ দল বেঁধে এই তীর নামক জুয়া খেলায় লাভের আসায় প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে। লাভতো দূরের কথা প্রতিনিয়ত এসব খেলে অনেকেই নি:স্ব হচ্ছে। আর ভারতীয় এ ভাগ্য খেলায় স্কুল-কলেজের ছাত্র, দিনমজুর, রিকশাচালক, যানবাহন চালক-শ্রমিকসহ বেকার যুবকরা বেশি অংশ নিচ্ছে। ফলে টাকার যোগান দিতে প্রায় সময়ই এসব জুয়াড়িরা ছুরি ও ছিনতাইয়ের মত অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে আইন-শৃংখলা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এসএমপির কোতোয়ালী থানার অন্তর্গত বহুল আলোচিত বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ি থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দুরত্বে এসব জমজমাট জুয়া চললেও রহস্যজনক কারনে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা। এমনকি স্থানীয় সচেতন মহল বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িকে বিষয়টি অবগত করলে সাথে সাথে তথ্য চলে যায় জুয়াড়িদের কাছে। অভিযানের আগে তথ্য চলে যাওয়ার ফলে মুল হোতারা প্রতিনিয়তই রয়ে যায় ধরা ছোয়ার বাহিরে। আর যারা তথ্য দেন তারা পড়েন বিপাকে। যে কারনে অনেকেই এখন ভয়ে আর মুখ খুলতে চায়না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুপুর থেকেই এসব জুয়াড়িদের কারনে তারা ঠিকমত ব্যবসা পর্যন্ত করতে পারছেন না স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। কালিঘাটের জুয়ার বোর্ডের মুল হোতা মিজানকে তারা একাধিকবার সতর্ক করলেও সে কর্ণপাত করছেনা। বরং পুলিশ দিয়ে হয়রানির ভয় দেখায় সব সময়।

বিষয়টি নিয়ে জানতে বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই সাজেদুল করিমের বক্তব্যের জন্য তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেন নি।

কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ আলী মাহমুদ আজকের সিলেটকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমাদের মিডিয়া কর্মকর্তা বক্তব্য দিতে পারবেন। আমার বক্তব্য দেয়া ঠিক হবেনা।

এসএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ আজকের সিলেটকে বলেন, আমরা যখনই সংবাদ পাই তখনই ব্যবস্থা নেই। আমরা আসামীদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠিয়ে দেন। আদালতই বাকী প্রদক্ষেপ নেন।

কিছু জুয়াড়ি গ্রেফতার হলেও জয়ার স্পট বন্ধ না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা সব সময় অভিযান চালাচ্ছি, নজরদারী অব্যাহত রয়েছে। জুয়ার স্পটগুলি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার চেষ্ঠা করছি।

এসএমপির মুখপাত্র ও এডিসি (মিডিয়া) বিএম আশরাফ উল্লাহ তাহের আজকের সিলেটকে বলেন, সিলেট মেট্টোপলিটন পুলিশ এই বিষয়ে খুবই তৎপর। আমরা যখনই খবর পাই, তখনই অভিযান চালাই এবং জুয়াড়িদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনি। জুয়ার বিরুদ্ধে এসএমপির অবস্থান জিরো ট্রলারেন্সে। আমরা সব সময় নজরদারী রাখছি।

অভিযানের পরও জুয়ার স্পট বন্ধ না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা এসব বোর্ডের মুল হোতাদের গ্রেফতার করে স্পটগুলি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়ার চেষ্ঠা করছি।

শেয়ার করুন