৪ অক্টোবর ২০২১


লালদীঘি মার্কেট নিয়ে নানা ‘জল্পনা’

শেয়ার করুন

ওয়েছ খছরু (অতিথি প্রতিবেদক) : নগরীর লালদীঘিরপাড়ের হকার্স মার্কেটের মালিকানা নিয়ে নানা প্রশ্ন। বৈধ মালিকরা মালিকানা কিংবা দোকান নবায়নে হিমশিম খাচ্ছেন। আবার অবৈধরা মেতে উঠেছেন হরেক রকমের ধান্ধায়। অবৈধভাবে দোকান বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ আছে। এ নিয়ে বিরক্ত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীও। প্রায় চার বছর ধরে ওই মার্কেটের দোকান মালিকদের সমস্যার সুরাহা করতে পারছেন না। এই অবস্থায় দরজায় কড়া নাড়ছে বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প। যেকোনো সময় ওই মার্কেটসহ আশপাশের কয়েকটি মার্কেটের স্থলে কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু করা হতে পারে।

সিলেটের লালদীঘিরপাড় ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ওই এলাকাকে গড়ে তুলতে পৌরসভার আমল থেকেই কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিলো। তখন থেকেই দোকান বিক্রি বা বরাদ্দের কার্যক্রম শুরু করা হয়। ডোবা জমিতেই দোকান ক্রয় করা শুরু করেন আগ্রহীরা। পররবর্তীতে পৌরসভার সময়েই ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মাটি ভরাট করে দোকানপাটের নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। এরপর ২০০২ সাল থেকে দোকানের পজিশন সমঝিয়ে দেয়া হয়। শুরুতেই অনেকেই নামমাত্র মূল্যে (৫০ থেকে ১ লাখ টাকায়) দোকান কোটা ক্রয় করেছিলেন। অপেক্ষা করতে করতে অনেকেই দোকান না পেয়ে মৃত্যু বরণও করেছেন। কেউ কেউ দোকানের আশা ছেড়ে দিয়ে প্রবাসেও চলে যান। এক সময় ফেনসিডিলের আড়ত হিসেবে লালদীঘিরপাড় হকার মার্কেট পরিচিত ছিল।

এ ছাড়া নানা অসামাজিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের স্থান হিসেবে বিবেচিত হতো এই মার্কেট। তবে- গত এক যুগে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে লালদীঘিরপাড় হকার মার্কেটের বি ব্লকে পুরোদমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এ ব্লকের ব্যবসাও সচল হচ্ছে। তবে- অব্যবহৃত হওয়ার কারণে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সি ও ডি ব্লক ভেঙে দিয়ে সেখানে ভাসমান ব্যবসায়ীদের আশ্রয় দিয়ে নগরের ফুটপাথ দখলমুক্ত করেছেন। রেজিস্ট্রার্ড সংগঠন লালদীঘিরপাড় হকার মার্কেট দোকান মালিক সমিতির নেতারা গত ২৮শে সেপ্টেম্বর মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর বরাবর দোকান নবায়নের প্রক্রিয়ার বিষয়টি জানিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

ওই স্মারকলিপিতে তারা উল্লেখ করেন- ২০১৫ সালে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া মার্কেটের দোকান কোটার নবায়ন করার জন্য তারা পরের বছরই আবেদন করেন। আর এই আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের মার্কেটের মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমানকে ১০০টি দোকান কোটা নবায়নের অনুমতি দেন বাজার শাখার তত্ত্বাবধায়ক ফয়জুর রহমান। কিন্তু তাৎক্ষণিক কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকার কারণে নবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ওই সময় বাজার শাখার কর্মকর্তা সুশেন চন্দ্র দে নবায়ন নিয়ে নানা নাটকীয়তা শুরু করলে তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মার্কেটের দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা। এর প্রেক্ষিতে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নজরে বিষয়টি আসলে তিনি বাজার শাখার সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অন্যত্র বদলি করে দেন।

করোনাকালীন সময়ে বেশ কয়েক মাস বাজার শাখার কার্যক্রমে স্থবিরতা ছিল। মালিক সমিতির নেতারা জানিয়েছেন- বাজার শাখায় দায়িত্বরত সুশেনকে সরিয়ে নেয়ার আগে তার ইন্ধনেই মার্কেট সমিতির বিকল্প অবৈধ কমিটি গঠন করা হয়। আর এতে সভাপতি করা হয় ফারুক আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় শামসুল আলম ডিসকোকে। পরবর্তীতে শামসুল আলম রেজিস্ট্রার্ড মার্কেটের মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন। কিন্তু কোতোয়ালি থানা পুলিশের তদন্তে সেটি প্রমাণিত হয়নি।

এদিকে- কয়েক মাস পর বাজার শাখার সাবেক কর্মকর্তা সুশেনকে ফের বাজার শাখায় নিয়ে আসা হয়েছে। একই সঙ্গে সম্পত্তি শাখায় আনা হয়েছে আজিজুর রহমানকে। দোকান মালিকরা দাবি করেছেন- সুশেন ও আজিজ মিলে মার্কেটের অনেক দোকানের ভুয়া মালিনাকানা সাজিয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন। তারা ফিরে এসে অবৈধ বা রেজিস্ট্রেশন বিহীন কমিটিকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন করে নবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে করে মার্কেটের দোকান বা পজিশনের মালিক ও ব্যবসায়ীরা মেয়রের বরাবর গত ২৬শে সেপ্টেম্বর ও ২৮শে নভেম্বর পৃথক দুটি আবেদনের মাধ্যমে আপত্তি জানিয়েছেন।

লালদীঘিরপাড় হকার মার্কেটের বি ব্লকের মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন- ‘মেয়র মহোদয়কে বিতর্কিত করতে বাজার শাখার কর্মকর্তা সুশেন ও আজিজ এসব কর্মকাণ্ড করছে। আর তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দোকান মালিক সমিতির অবৈধ কমিটি গঠন করে ফারুক ও শামসুল দোকান বিকিকিনি ও দখলে মেতে উঠেছে।’

তিনি বলেন- ‘বৈধ কমিটিকে পাশ কাটিয়ে সিন্ডিকেট বানিয়ে দুর্নীতি করলে তারা আইনের আশ্রয় নেবেন।’ তবে- শামসুল আলম ডিসকো তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন- ‘তার অভিযোগের চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল হলেও মোশনের কারনে এখনো আদালতে মামলা বিচারাধীন। এ ছাড়া- এ ব্লক দখল করে কারখানা নির্মাণ ও বি ব্লকে দোকান দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেন। শামসুল তার কমিটিকেই বৈধ কমিটি বলে দাবি করেন।’

মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন- ‘যারা দোকানের জন্য টাকা জমা দিয়েছেন তারা বৈধ। কেউ কেউ মার্কেটের দোকান ইচ্ছামতো দখল করে ব্যবহার করছে। এ নিয়ে কার্যক্রম শুরু করার পর সব জানা যাচ্ছে। এখন যারা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারবেন তাদেরকেই দোকানের পজিশন দেয়া হবে। বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স নির্মাণ হলেও পজিশন তারা পাবেন। কেউ সিন্ডিকেট করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।’ এদিকে- বাজার শাখার কর্মচারী সুশেনের বিরুদ্ধে বর্তমানে ১২-১৫ লাখ টাকায় ভুয়া মালিক সাজিয়ে দোকান বিকিকিনির অভিযোগ উঠেছে।

বাজার শাখার ওই কর্মকর্তা লালাবাজারের খালোপাড়ের হরমুজ আলীর ছেলে ঘটক নুরুল ইসলাম ও নরসিংদীর মনোহরদীর স্বপন দেবনাথকে মালিক সাজিয়ে ১০৭. ১১০, ১১১, ১৮৩, ২১২, ২০১৩, ৩০৪, ৩০৫, ৫২৭, ৫৮৭, ৬৬২, ৭০৪, ৭০৫ নম্বর দোকান বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে মার্কেট মালিকদের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে- বাজার শাখার কর্মকর্তা সুশেন চন্দ্র দেব- দোকান বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে। বিক্রেতাদের তিনি চিনেন না বলে দাবি করেন।

২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৯টি দোকানের বিক্রেতা ঘটক নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন- ‘পূর্বের পরিচিত সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা সুশেন চন্দ্র দেব তাকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে দস্তখত দিতে বলে। এরপর তিনি দস্তখত দিলে তার হাতে দেড়-দুই হাজার টাকা তুলে দেন। তিনি দোকান বিক্রির কোনো খবরই জানেন না বলে জানান।’

শেয়ার করুন