৪ জানুয়ারি ২০২২
আজকের সিলেট ডেস্ক : দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ০৪ জানুয়ারি। ১৯৪৮ সালের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে সংগঠনটির জন্ম হয়। এরপর ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সঙ্কটে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রেখেছে সংগঠনটি।
গৌরব ও ঐতিহ্যে ৭৩ বছর পার করা এ সংগঠনটির এবারের ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনেকটা নিষ্প্রভ। এমনকি পূর্বের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীগুলোতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাস থাকলেও এবার নেই সেই আমেজ। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের গাফিলতির কারণে এমনটি হচ্ছে বলে ঘোর অভিযোগ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের। তাদের মতে, ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও আমেজহীন থাকবে সংগঠনটি, এটা মানা যায় না। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তারা আরও বলেন, কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় ছাত্রলীগের ভেতরে নেতিবাচকতা চলে আসছে। কাজেই সম্মেলন হওয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।
জানা যায়, ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দুইদিন আগে শনিবার সংগঠনটির সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পাঁচ দিনব্যাপাী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সংগঠনটি। পরে এদিন সোমবার রাতে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রথম দিনের কর্মসূচির কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়।
এই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী- ছাত্রলীগের পাঁচদিন ব্যাপী কর্মসূচির প্রথম দিনে মঙ্গলবার সকালে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ও দেশব্যাপী সংগঠনের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল সাতটায় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, সকাল আটটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে কেক কাটা, দুপুর দুইটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলায় সংগঠনটির ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভ উদ্বোধন ও আনন্দ শোভাযাত্রা।
কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন বুধবার রয়েছে সকাল সাড়ে এগারোটায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ ( কেআইবি ) মিলনায়তনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভা। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্ত থাকবে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
কর্মসূচির তৃতীয় দিন বৃহস্পতিবার সকাল এগারোটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সংলগ্ন স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে পথশিশুদের মাঝে শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ, বিকাল তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ।
এছাড়া কর্মসূচির চতুর্থ দিন শুক্রবার বিকাল তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সংলগ্ন সোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে দুঃস্থদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ এবং পঞ্চম দিনে শনিবার সকাল এগারোটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা সংলগ্ন বটতলায় স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি।
এছাড়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রলীগ এর সকল ইউনিটকে (জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ) যথাযথ স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে আগামী পাঁচ জানুয়ারি সকাল সাড়ে এগারোটায় অনুষ্ঠিতব্য ছাত্রলীগ এর আলোচনা সভায় সংযুক্ত হওয়ার জন্য এবং সেই সাথে ছাত্রলীগ ঘোষিত কর্মসূচি নিজ নিজ ইউনিটে সুবিধাজনক সময়ে বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়।
জানা যায়, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনতন্ত্রে দুই বছরের জন্য হলেও বর্তমান কমিটির মেয়াদ প্রায় ৪ বছর হতে চলেছে। এরমধ্যে ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য্য ভারপ্রাপ্ত থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্তির দুই বছর হবে আগামী ৪ জানুয়ারি অর্থাৎ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন। এরআগে ২০২০ সালের ৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জয়-লেখককে ‘ভারমুক্ত’ করে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেন।
সূত্র জানায়,যেহেতু জয়-লেখকের দায়িত্বের দুই বছর আগামীকাল ৪ জানুয়ারি পূর্ণ হচ্ছে সেহেতু ছাত্রলীগের এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংগঠনটির সাংগঠনিক অভিভাবক ও আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সম্মেলনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ছাত্রলীগকে নির্দেশনা দিবেন।
এদিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশও ছাত্রলীগ নিষ্ক্রিয় থাকা, কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়াসহ প্রভৃতি কারণে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সম্মেলন দাবি করছেন।
যেভাবে প্রতিষ্ঠা হলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রী লাভ করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবি প্রথম পর্বে ভর্তি হন। ঢাকায় ফিরে আসার প্রধান কারণ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্বাস করতেন নেতাজী-শেরে বাংলাদের সাইডলাইনে পাঠিয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, জওহরলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধী, লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনরা যেভাবে ভারতবর্ষ ভাগ করে পাকিস্তান নামক যে অবাস্তব রাষ্ট্র বানিয়ে দিলো, তা বাঙালির জন্য নয়। ১২০০ মাইলের ব্যবধানে দুই ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতির দুই দেশ, এক অবাস্তব রাষ্ট্র। এটি টিকে থাকতে পারে না। তিনি তাঁর বন্ধুদেরও বলেছিলেন, যে পাকিস্তানের জন্ম হলো তা আমাদের জন্য নয়, আমাদের আবার লড়াই করে আপন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাই ঢাকায় ফিরে যাচ্ছি।
তারুণ্যের শক্তি অজেয় অপ্রতিরোধ্য। তাদের পিছুটান নেই। বঙ্গবন্ধু নিজেও তখন তরুণ। কাজেই তরুণদের সংগঠন দরকার। তিনি তরুণদের সংগঠিত করতে থাকলেন এবং ঢাকায় ফিরে আসার ছয় মাসের মাথায় ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের এ্যাসেম্বলিতে তখনকার একঝাঁক সাহসী তরুণ নিয়ে প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন। প্রথমদিকে অবশ্য মুসলিম শব্দটি ছিল। পরে সকল জাতি, ধর্ম তথা সর্ব বর্ণবাদবিহীন তরুণদের নিয়ে অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়।
ছাত্রলীগ যখন প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন বঙ্গবন্ধুর বয়স ছিল ২৮ বছর এবং তিনিই হতে পারতেন এর সভাপতি। কিন্তু না, তিনি হননি। তিনি প্রথম আহ্বায়ক নির্বাচিত করেন নাঈমুদ্দিন আহমদকে। এরপর যখন ছাত্রলীগ রাজপথে কার্যক্রম শুরু করে তখন সভাপতি মনোনীত করা হয় দবিরুল ইসলামকে। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয় খালেক নেওয়াজ খানকে। জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই ভাষার অধিকার, শিক্ষার অধিকার, বাঙালির স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান, সর্বোপরি স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনসহ বিভিন্ন সঙ্কটে সবচেয়ে সফল সাহসী সারথি রেখেছে সংগঠনটি।
বস্তুত, এই ছাত্রলীগের সবকিছুতেই ছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের পর আওয়ামী লীগের মতো ছাত্রলীগেরও হাল ধরেন তাঁরই কন্যা বর্তমান প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা।