৩১ ডিসেম্বর ২০২১
নিজস্ব প্রতিবেদক : নগরীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কয়েক সহস্রাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক (টমটম)। মাঝেমধ্যে মেয়র অ্যাকশনে নামেন। অভিযান চলাকালে নিষিদ্ধ যানবাহনের চলাচল কম থাকলেও, দু-তিন দিন পরেই ‘যে লাউ, সেই কদু’। অবশেষে কঠোর অ্যাকশনে নামছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে সিলেটের সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলতে দেবে না এসএমপি।
জানা যায়, ১৯১৯ সালে চট্টগ্রাম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে রিকশা। এর প্রায় শতবর্ষ পর ২০১১ সালে বাংলাদেশে প্রচলন হয় ব্যাটারিচালিত রিকশা ভ্যানের। সাধারণ প্রচলিত প্যাডেলের রিকশায় মোটর লাগিয়ে ব্যাটরির সাহায্যে চলাচলকারী এই যানবাহন ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠে দেশজুড়ে।
কিন্তু, দুর্বল ব্রেক এবং নিয়ন্ত্রণহীন গতির কারণে অচিরেই মরণবাহনে পরিণত হয় এই যানগুলো। এর প্রেক্ষিতে ২০১২ সালে দুর্ঘটনা রোধ, নগরীর যানজট নিরসন এবং বিদ্যুতের উপর চাপ কমাতে মেট্রো আইনের ২৭(গ) অনুযায়ী সিলেটে ব্যাটারিচালিত টমটম অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা হয়। সিলেট জেলা প্রশাসন, সিসিক ও এসএমপি’র যৌথ উদ্যোগে অভিযান চালিয়ে সে সময় নগরীতে চলাচলকারী সব ধরণের ব্যাটরিচালিত যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ওই বছরই সিলেট ব্যাটারিচালিত রিকশা মালিক সমিতি নামক একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. ওলিউর রহমান এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট (রিট পিটিশন নম্বর-১৩৯৯৬) করেন। এর প্রেক্ষিতে তৎকালীন সিসিক মেয়র প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, সিলেট জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সরকারের সচিব ও এসএমপি কমিশনারের বিরুদ্ধে রুল জারি করেন আদালত।
পরবর্তীতে মামলায় পক্ষ হন সিলেট ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা মালিক-শ্রমিক কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিক, সিলেট অটোরিকশা ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আবু তাহের ও সিলেট রিকশা মালিক সমাজ কল্যাণ সমিতির সভাপতি এমএএম শাহজাহান। ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি এসএম মজিবুর রহমানের যৌথ বেঞ্চ শুনানী শেষে সিলেট ব্যাটারি চালিত রিকশা মালিক সমিতির রিট খারিজ করে দেন। এর ফলে সিলেটে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চলাচল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু তবুও বন্ধ হয়নি অবৈধ এই যানবাহন চলাচল। উল্টো দিন দিন নগরীতে দাপট বাড়ছে ব্যাটারিচালিত যানবাহন চালকদের। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকদের প্রকাশ্যে মদদ দিচ্ছেন সিলেটের বাম সংগঠনের নেতারা। চলতি বছরের ২ জুন নগর ভবনে হামলা চালায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চালকেরা। এ ঘটনায় ৩শ জনকে আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন সিসিকের লাইসেন্স কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান। মামলার আসামি করা হয় বাসদ নেতা প্রণব জ্যোতি পাল ও আবু জাফরসহ ৩০০ জনকে। তবে সে সময় রিকশা চালকদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে সিসিকের লোকজন হামলা চালিয়েছে বলে গণমাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করেছিলেন সিলেটের বাম নেতারা।
২০১৪ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নগরীর ভিআইপি রোড, চণ্ডিপুল ও এয়ারপোর্ট রোডে বেশ কয়েকটি ব্যাটারিচালিত রিকশা জব্দ করেন এবং সব ধরণের ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ২০১৫ সালে সরকারী এক আদেশে সিলেট নগরীতে ব্যাটারী চালিত রিকশা, অটো রিকশা চলাচল, বিক্রি ও বাজারজাত নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়।
একই বছরের ২১ মে সিলেটে প্রাক বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ব্যাটারি চালিত রিক্সার বিরুদ্ধে জোরালো অভিযানের নির্দেশ দেন। ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ব্যাটারিচালিত রিকশা মালিক সমিতির রিট উচ্চ আদালতে খারিজ হয়। ২০১৯ সালের ৭ জুলাই নগরীর ভিআইপি রোডের লামাবাজার ও শেখঘাট এলাকায় গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ব্যাটারী চালিত রিকশা, অটো রিকশা শোরুমে এ অভিযান চালানো হয়।
এসময় বিক্রি ও বাজারজাত করার অপরাধে বেশ কয়েকটি শোরুম সিলগালা করা হয়।
২০২০ সালের ২১ ও ২২ ডিসেম্বর ৬ দফা দাবিতে ধর্মঘট পালন করে সিলেটের সিএনজিচালিত অটোরিকশা শ্রমিকেরা। তাদের ৬ দফার মধ্যে ছিলো সিলেট নগরীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধের দাবি।
চলতি বছরের ২০ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন টাস্কফোর্সের সভায় ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যানের ব্যাটারি বা মোটর খুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
উচ্চ আদালতের নির্দেশে গত ৮ নভেম্বর থেকে সিলেটে কঠোর অভিযানে নামার ঘোষণা দেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। ঘোষণার পর নির্ধারিত দিনে অভিযানে নেমে ৪টি ইজিবাইক (টমটম) ও ৩টি ব্যাটারিচালিত রিকশা জব্দ করে সিসিকের ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু, সকালে অভিযানে নামলেও বিকেলের দিকেই সড়কে দেখা মেলে নিষিদ্ধ যানবাহনগুলোর।
এসএমপি কমিশনার মো. নিশারুল আরিফ বলেন, মহানগরের যানজট নিরসনে এবং অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা এড়াতে নতুন বছরের প্রথম দিন থেকে মহানগর সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকায় রুট পারমিটহীন, অবৈধ ব্যাটারিচলিত যানবাহনের বিরুদ্ধে সাঁড়াশী অভিযান পরিচালনা করা হবে। নিষিদ্ধ এই যানবাহন দেখামাত্র জব্দ করবে ট্রাফিক বিভাগ। অভিযানকালে ইজিবাইক (টমটম) জব্দ করা হবে এবং চালকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই গাড়ি ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।
তিনি আরো বলেন, চলতি বছরের ২০ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সড়ক পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা জোরদার এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে গঠিত টাস্কফোর্সের তৃতীয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব প্যাডেলচালিত রিকশা বা ভ্যানে ব্যাটারি লাগানো হয়েছে, সেসব রিকশা ও ভ্যানের ব্যাটারি ও মোটর খুলে রাখা হবে। আমাদের কাজ হচ্ছে ট্রাফিক আইনের বাস্তবায়ন ও এই আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। কিন্তু সিলেট শহরের যানজট যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং যানজট দূর করতেই আমার ট্রাফিক বিভাগের লোকজন হিমশিম খাচ্ছে। ফলে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ ঠিকমতো সম্ভব হচ্ছে না। নগরীতে অবৈধ যানবাহনের অবাধ চলাচলই যানজটের অন্যতম কারণ।