১২ ডিসেম্বর ২০২১


স্বীকৃতি চান বীরাঙ্গনা কুসুমকুমারী

শেয়ার করুন

আশীষ দে : কুসুমকুমারী ব্যানার্জী। বয়স ৮০ ছুঁইছুঁই। বসবাস করছেন সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নের ছড়াগাঁও চা-বাগানে। আর তার আহত হৃদয়ে ও স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে একাত্তরের পাক-হানাদারদের নিকৃষ্টতম সেই ভয়ংকর পশুসুলভ চেহারা। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর কেটে গেলেও যে চেহারাগুলো আজও কুসুমকুমারীকে আঘাতে আঘাতে ক্ষত বিক্ষত করে প্রতিনিয়ত।

কুসুমকুমারী ব্যানার্জী একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে খাঁন চা বাগানে মিডওয়াইফ (সেবিকা) হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় পাক-হানাদারদের লালসার শিকার হন। তাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে একটি স্থানে কয়েকদিন আটকে রাখে পাক-হানাদাররা। সেখানে পালাক্রমে নির্যাতন চলে তার উপর। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় কোনোরকম পালিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের আমতরঙ্গ ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। সেখানে মীর শওকত আলী ও সিআর দত্ত তাকে সেবিকা পদে নিয়োগ প্রদান করেন।

কুসুমকুমারীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তার মা জলদা ব্যানার্জী বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলে পাক-হানাদারদের গুলিতে তিনি মারাত্মকভাবে জখম হন। জখমের স্থানটিতে পচন ধরতে ধরতে কয়েকবছর পর তিনি মর্মান্তিকভাবে মারা যান। দেশ স্বাধীনতা লাভের কয়েক যুগ পেরিয়ে গেলেও আজ অবধি রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি লাভ না করায় মর্মাহত তিনি।

কুসুমকুমারী ব্যানার্জী কাদঁতে কাঁদতে বলেন, ‘চাওয়া পাওয়ার তো কিছু নাই বাবা’। এই দেশের জন্য আমার মায়ের দেহের তাজা রক্ত ঝরেছে, আমি নিজে নির্যাতিত হয়েছি। আমার শরীরের এমন কোন অংশ নেই যেখানে পাক-হানাদারদের নির্যাতনের চিহ্ন নেই। তাদের নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে অর্ধ শতাব্দী ধরে বেঁচে আছি। কেমন আছি সরকার তো কোনো খোঁজ নিলো না বাবা। এখন তো মরার সময় হয়ে গেছে। শরীরটাও এখন আর বেশি ভালো যাচ্ছে না। মৃত্যুর আগে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটুকু পেয়ে যদি মরতে পারি, তাহলে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবো এই বলে যে দেশ ও জাতি আমাকে সম্মানিত করেছে।’

এ বিষয়ে কথা হয় চা শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা রাজু গোয়ালার সাথে। তিনি জানান এলাকার পুরাতন মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছেন যে কুসুমকুমারী ব্যানার্জী একাত্তরের একজন প্রকৃত নির্যাতিতা। তাই রাষ্ট্র যেন তাকে স্বীকৃতি দেয় এ দাবি জানান এই শ্রমিক নেতা। উল্লেখ্য, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বসন্ত কুমার ব্যানার্জীর সাথে তার বিয়ে হলেও তা বেশিদিন টিকেনি। দুই মেয়ে সন্তানকে নিয়ে সামাজিকভাবে হয়েছেন হেয়প্রতিপন্ন।

কুসুমকুমারী ব্যানার্জী একজন সংগ্রামী নারী। তাঁকে সম্মানিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

(লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।)

শেয়ার করুন