১৩ নভেম্বর ২০২১


ফাঁকা মাঠেও ‘গোল খেল’ আওয়ামী লীগ

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেট অঞ্চলকে আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসেবে দাবী করেন ক্ষমতাশীন দলের নেতাকর্মীরা। সেই দাবী থেকেই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জাতির পিতার কন্যার কাছ থেকে উন্নয়ন ভাগিয়ে নেন। এমনকি এমন বিশ্বাস থেকেই সিলেট অঞ্চলের একাধিক নেতাকে নিজের মন্ত্রীসভায় ঠাঁই দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের হাত ধরে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যাপক উন্নয়নও হয়েছে সিলেটে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতও সিলেটকে ঢেলে দিয়েছেন। রাজপথের প্রধান বিরোধীদল বিএনপিও দলীয় প্রতিকে নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্থানীয় অনেক নেতা নির্বাচন করলেও জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের দেখা যায়নি তাদের পক্ষে প্রচারে। অন্য দলগুলোও এই নির্বাচন নিয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। অন্যদিকে এই নির্বাচন ঘিরে আটঘাট বেঁধে মাঠে নামে আওয়ামী লীগ। তৃণমূলের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে নির্বাচন করা হয় প্রার্থী। যারা বিদ্রোহী হয়েছেন তাদের করা হয়েছে বহিষ্কার। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের দেখা গেছে মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালাতে। তবুও দ্বিতীয় ধাপে ইউপি নির্বাচনের ফলাফলে বলতে গেলে নৌকা ডুবেছে। কিন্তু কেন?

এই কেনোর উত্তরে রয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। দলের এমন ভরাডুবিতে প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব।

সিলেট জেলায় মোট ১৫টি ইউপিতে নির্বাচন হলেও মাত্র ৬টিতে জয় পেয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। আর দু’টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, ৪টিতে স্বতন্ত্রের ব্যানারে বিএনপি, ১টিতে জামায়াত ও ১টিতে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। অর্ধেকেরও কম ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের জয় নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।

কেবল তাই না, সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে জামায়াত নেতার কাছেও হারতে হয়েছে নৌকার প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিনকে। স্বাধীনতা বিরোধী একটি সংগঠনের নেতার কাছে নৌকা প্রতীকের হার নিয়ে ব্যপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের এমন ভরাডুবির কারণ হিসেবে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা প্রার্থী বাছাইকেই দোষ দিচ্ছেন। নির্বাচনের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে সরগরম সমালোচনা।

দলটির স্থানীয় নেতারা বলছেন, প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল, বিদ্রোহী প্রার্থীদের থামাতে না পারা ও গ্রামের মানুষের সঙ্গে নেতাদের দূরত্ব তৈরি হওয়াসহ বেশ কিছু কারণে বেশির ভাগ ইউনিয়নে পরাজয় মেনে নিতে হয়েছে নৌকার প্রার্থীদের।

যদিও বিষয়টিকে সাংগঠনিক ব্যর্থতা কিংবা দলের জনপ্রিয়তায় ধস হিসেবে দেখছেন না স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরীর মতে তৃণমূল্যের পছন্দের প্রার্থীদেরকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে কোন ব্যর্থতা নেই বলে তাঁর দাবি। এমনকি সারা দেশের তুলনায় সিলেটেই প্রার্থী বাহাইয়ে স্বচ্ছতা ছিলো।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আলমগীর আহমদ। বিএনপির এই নেতা পেয়েছেন ৫ হাজার ২৮১ ভোট। তার নিকটতম আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ইলিয়াসুর রহমানের পক্ষে গেছে ৩ হাজার ৮৭৯ ভোট। আর আওয়ামী লীগ মনোনীত মো. মুল্লুক হোসেন পেয়েছেন ২ হাজার ৬১ ভোট। এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুই নেতার মোট ভোট বিজয়ী প্রার্থীর চেয়ে ৬৫৯ বেশি। এভাবে বিদ্রোহী থাকা সব ইউনিয়নেই ভাগ হয়েছে আওয়ামী লীগের ভোট। সিলেট জেলার ১৫টি ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার ভোট হয়। এর ১০টিতে ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। দল থেকে বহিষ্কার করেও তাদের দমাতে পারেনি আওয়ামী লীগ।

ফল ঘোষণার পর দেখা গেছে, ১৫ ইউনিয়নের ১০টিতেই পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। ৫টি স্বতন্ত্র হয়ে লড়া বিএনপি নেতারা, ৪টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা ও একটিতে জামায়াত নেতা জয় পেয়েছেন।

প্রার্থী বাছাইয়ে ভুলের কারণেও অনেক ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন বলে মনে করেন পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ইলিয়াসুর রহমান। তিনি বলেন, ‘প্রার্থী বাছাই যে ভুল ছিল, তা ফলাফল দেখেই বোঝা যাচ্ছে।’

তবে অভিযোগপি নাকোচ করে দিয়ে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা কমিটির নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। যাকে সবচেয়ে যোগ্য ও জনপ্রিয় মনে করা হয়েছে, তাকেই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ে কোন ভুল থাকার সুযোগ নেই। এখানে অনেক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ব্যাপারও থাকে। জনগণ ভোট দেয়নি বলে আমাদের অনেক প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। প্রার্থীরা ভোট নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারেননি। এটা তাদের ব্যর্থতা।

বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচনে বেশির ভাগ ইউনিয়নে হেরে যাওয়ার প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপির কথা ও কাজে মিল নেই। তারা ডুবে ডুবে জল খায়। প্রতীক দেয় না বটে, তবে প্রার্থী দেয় ঠিকই।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, অনেক ইউনিয়নে প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল ছিল। কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিতদেরও প্রার্থী করা হয়েছে। বিদ্রোহীদের ঠেকাতে দলের উদ্যোগ ছিল দায়সারা। অনেক ক্ষেত্রে দলের নেতারা বিদ্রোহীদের মদদও দিয়েছেন। এসবের প্রভাবও পড়েছে ফলে।

জেলা আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির এই নেতা বলেন, দল দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকায় তৃণমূলের সাধারণ মানুষজনের সঙ্গে নেতাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। নেতারা এখন আর জনসম্পৃক্ত নন। ফলে ভোটাররা তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও দল আর নেতাদের ব্যর্থতায় ভোটে হারতে হচ্ছে।

এই নেতার বক্তব্যের সত্যতা মিলেছে ভোটের ফলেও। সিলেটের সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন। কিন্তু ভোটে তিনি হেরে গেছেন জামায়াতের স্থানীয় নেতা আবদুল মনাফের কাছে।

ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী সিলেট সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে মধ্যে মোগলগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান হিরণ মিয়া, কান্দিগাঁওয়ে জামায়াত নেতা আবদুল মনাফ, জালালাবাদে আওয়ামী লীগের ওবায়দুল্লাহ ইসহাক ও হাটখোলায় খেলাফত মজলিসের মাওলানা রফিকুজ্জামান বিজয়ী হয়েছেন।

অপরদিকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ইসলামপূর পূর্ব ইউনিয়নে স্বতন্ত্রের ব্যানারে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন আলম, তেলিখালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী আবদুল ওয়াদুদ আলফু, ইছাকলসে বিএনপি সমর্থক সাজ্জাদুর রহমান, উত্তর রণিখাইয়ে আওয়ামী লীগের ফয়জুর রহমান ও দক্ষিণ রণিখাইয়ে আওয়ামী লীগের ইকবাল হোসেন এমাদ বিজয়ী হয়েছেন।

এছাড়াও বালাগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নে স্বতন্ত্রের ব্যানারে বিএনপি নেতা মো. আব্দুল মুনিম, পূর্ব গৌরীপুরে বিএনপি নেুা মুজিবুর রহমান মুজিব, পশ্চিম গৌরিপুরে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী আবদুর রহমান মাখন, বোয়ালজোড়ে আওয়ামী লীগের আনহার মিয়া, দেওয়ানবাজারে বিএনপির নাজমুল আলম ও পূর্ব পৈলনপুরে আওয়ামী লীগের শিহাব উদ্দিন বিজয়ী হয়েছেন।

হিসেব অনুযায়ী আওয়ামী লীগের ভরাডুবি দেখা যাচ্ছে; এমন প্রশ্নে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, এটা ভরাডুবি না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলে অনেক কিছু নির্ভর করে। সেখানে আত্মীয়তার সম্পর্ক, গোষ্ঠী সম্পর্ক ইত্যাদি অনেক সময় ফলাফলে প্রভাব পড়ে।

তাহলে জনগণ কি এ সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে; এমন প্রশ্নে শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন- আমি আগেই বলেছি- স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলে আত্মীয়তার সম্পর্ক, গোষ্ঠী সম্পর্কসহ পারিপার্শ্বিক বিষয় প্রভাব পড়ে। তবে এ নির্বাচন প্রমাণ করে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে স্বচ্ছ নির্বাচন হয়। অধিকাংশ জায়গায় নৌকার পরাজয় হয়েছে এটা ঠিক। কিন্তু কি কারণে পরাজয় হয়েছে সেটি নিয়ে আমরা নিজস্ব তদন্ত কমিটি করে তদন্ত করে দেখব। তবে বিএনপি এতদিন নির্বাচন নিয়ে যে অপপ্রচার চালিয়েছিলো এই নির্বাচন তা ভুল প্রমাণ করে এটাই প্রামণ করেছে আওয়ামী লীগের অধীনেই নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব।

শেয়ার করুন