২৯ ডিসেম্বর ২০১৭
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় প্রায় ৪০০ বছর আগেরাজ-রাজন্যের বসবাস ছিলো বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। রাজপরিবারের শেষ বংশধর রাজা সুবিদ নারায়ণের খনন করা ‘কমলারাণী দিঘি’এখনোকালের সাক্ষী হয়েদাঁড়িয়ে আছে।
রাজা সুবিদ নারায়ণ রেখে যাননি রাজ প্রসাদ অথবা রাজবাড়ি। তবে, রেখে গেছেন ঐতিহাসিক দিঘিটি। কেউ বলেন সাগরদিঘি আবার কেউবা বলেন কমলারাণীর দিঘি। সুবিদ নারায়ণের স্ত্রী কমলা রানীর নামেই এই দিঘিটি বেশি পরিচিত।যদিও একই কাহিনী নির্ভর দিঘি রয়েছে কমলগঞ্জে ও হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে।
রাজনগর উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার উত্তর দিকে রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়কের উত্তর পাশে এ দিঘির অবস্থান। ৩১.৫৫ একর জলসীমার খরিদসূত্রে এ দিঘিটির মালিক সদর ইউনিয়নের ঘরগাঁও গ্রামের ইংল্যান্ড প্রবাসী আব্দুল কাদির। তবে এতে সরকারি ৪ একর ও মোস্তফা ওয়াকফ স্টেটের ২.৬৫ একর জমিও রয়েছে।
কথিত আছে, প্রজাহিতৈষী রাজা সুবিদ নারায়ণ শুষ্ক মৌসুমে জনসাধারণের পানীয় জলের সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি দিঘিখননের পরিকল্পনা নেন। নিজ রাজ্যের ১৫০ বিঘা জমি নিয়ে বিস্তৃত এই দিঘি খনন করা হয় সহস্রাধিক শ্রমিকের ৫/৬ মাসের শ্রমে। তৈরি হয় শান বাঁধানো ঘাট। কিন্তু রাজার ইচ্ছার পূর্ণতা আসেনি বিস্তৃত দিঘির বিরাণ দশার কারণে। জনশ্রুতি আছে দিঘিতে পানি উঠছিল না রহস্যজনক ভাবে। এ নিয়ে রাজারহতাশার ছিলো না।
জনশ্রুতি আছে, ঘুমের ঘোরে একদিন রাজা স্বপ্নাদিষ্ট হলেন যে, তার প্রিয়তমা স্ত্রী কমলরাণী যদি স্নান উপলক্ষে দিঘিতে নেমে পূজা করেন তাহলে কাঙ্ক্ষিত পানিতে দিঘিটি টইটম্বুর হয়ে উঠবে। রাজা তার ওইস্বপ্নবৃত্তান্ত প্রিয়তমা স্ত্রীকে জানালেকমলারাণী স্বামীর বাসনা পূরণে পূজা দিতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। রাজার আদেশে পূজার ব্যবস্থা হলো। শান বাঁধানো ঘাট দিয়ে রাণী দিঘিতেনেমে মন্ত্রপাঠ শেষে বিরাণ জমিতে সাষ্টাঙ্গের প্রণাম জানানোর পর পরই মাটি ভেদ করে স্পটিক জলের উদগীরণ শুরু হয়। দিঘিতে কোমর সমান পানি হলে রাণী সেই জলে স্নান করেন। অতঃপর মধ্য দিঘি থেকে জলের ঘাটে আসার আগেই অথৈ জলে কমলারাণী ডুবে যান। ওইবিয়োগান্তক প্রেক্ষাপটে এলাকায় শোকের পাশাপাশি বহুবিধ কল্পকাহিনী ডানা মেলে।
অন্যদিকে, রাজা সুবিদ নারায়ণ স্ত্রী শোকে নির্বাক হয়ে যান। ওইরাতেই কমলারাণী স্বপ্নযোগে রাজার সামনে হাজির হয়ে বললেন, তোমার ঘরে ফেরা আমার জন্য অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। আমার দুগ্ধ পোষ্য সন্তানকে প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলায় দিঘির পশ্চিম পাশে রেখে দিও। আধাঁর নামলেই আমি এসে তাকে দুধ পান করিয়ে চলে যাবো। খবরদার-আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করবে না। স্পর্শ না করলে আমি হয়তো এক সময় তোমার কাছে ফিরে আসবো। যদি স্পর্শ কর তাহলে চিরদিনের জন্য আমার আশা ছেড়ে দাও। রানীকথা অনুযায়ী দিন কয়েক রাতের আধাঁরে দিঘির কিনারে উঠে রানীশিশুপুত্রকেদুধ পান করান।
এদিকে স্ত্রী বিরহে কাতর রাজা ঘাপটি মেরে আড়ালে বসে শিশুকে দুগ্ধদানরত অবস্থায় রানীকে জাপটে ধরলেন। রানীতখন দিঘিতে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে যান। রাজার হতে শুধু রয়ে গেল রাণীর এক গুচ্ছ কেশ। আর কোনোদিন রানীশিশুপুত্রকে দুগ্ধ দানের জন্য ওঠেননি। এই মিথটি ডালপালা মেলে লোকালয়ে এখনও বর্তে আছে আপন মহিমা নিয়ে। রাজা নেই তার সাথে রাজ্যও নেই। বিলীন হয়ে গেছে রাজভিটা। কিন্তু এখনও সেই দিঘিটি আছে।
কথা হয় দিঘি দেখতে আসাদর্শনার্থী স্কুলছাত্রী নাজিয়া চৌধুরীর (তাসপিয়া) সাথে। নাজিয়া জানায়- তার বাসা সিলেটে। এখানে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। এই দীঘির নামটা আগেও আম্মু, নানুসহ অনেকের মুখে শুনেছি তাই এখানে এসেই দিঘিদেখতে চলে এলাম।
দিঘির বর্তমান মালিক পক্ষের আব্দুর রহমান সোহেল বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক দিঘি।বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। এ দিঘিতে পর্যটন এলাকা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য আমরা বেশ চেষ্টা চালিয়ে আসছি। কিন্তু প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ায় সম্ভব হচ্ছে না।
(আজকের সিলেট/২৯ ডিসেম্বর/ডি/কেআর/ঘ.)