৭ এপ্রিল ২০২২
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার জয়চণ্ডী ইউনিয়নের সিটিএস নামের মন্দিরের ধর্মযাজক বা গুরুমহারাজের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, অর্থ আত্মসাৎসহ ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।কথিত এই মহারাজের বিরুদ্ধে দেবোত্তর সম্পত্তি আইন, সাইবার পিটিশন আইন, সিআরসহ পাঁচটি মামলা আদালতে চলমান।
বর্তমানে গা ঢাকা দেওয়া এই মহারাজকে নিয়ে স্থানীয় হিন্দু (সনাতনী) সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।কুলাউড়া উপজেলাসহ মন্দিরে আগত লোকজন এই গুরুমহারাজকে যতি মহারাজ হিসেবে চেনেন।
পাসপোর্ট অনুযায়ী তার প্রকৃত নাম প্রদীপ বিশ্বাস। ভারতের নদিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা (পাসপোর্ট নম্বর জেড ২৬০৮১৫৮) তিনি। পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ভারত থেকে এসে ২০০৮ সালে উপজেলার জয়চণ্ডী ইউনিয়নের পুসাইনগরে শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর দেবালয় নামের একটি মন্দিরের নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করেন সিটিএস মন্দির। এ ক্ষেত্রে জাল দলিলের আশ্রয় নেন তিনি। একই সঙ্গে দলিলে নিজেকে পুসাইনগরের বাসিন্দা উল্লেখ করেন।
কথিত এই গুরুমহারাজ অল্প সময়ে বিশাল ভক্তকুল গড়ে তোলেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সরল বিশ্বাসে মন্দিরে মোটা অঙ্কের অনুদান দিতে থাকে। কোটি কোটি টাকা অনুদান নিয়ে গড়ে তোলেন দ্বিতলবিশিষ্ট মন্দির। মন্দিরে তিনটি দানবাক্স বসানো হয়। সেই সঙ্গে তার ভক্তকুলের কাছে এক হাজার ৮০০ দানবাক্স বিলি করেন। সব মিলিয়ে আসতে থাকে লাখ লাখ টাকা। সব দানবাক্সের চাবি এই গুরুমহারাজের কাছে। মোটা অঙ্কের টাকায় বদলে যেতে থাকে গুরুমহারাজের চলাফেরা।
বেশির ভাগ সময় তিনি সিলেট শহরে কাটান।রাজধানী ঢাকার তাঁতিবাজারের গঙ্গা টাওয়ারের পঞ্চম তলায় সিটিএস মন্দিরের আরেকটি কার্যালয় স্থাপন করেন। সেই অফিসের মাধ্যমে অসীম কুমার নন্দী ও অর্জুন পাল নামের দুই ব্যক্তির সহযোগিতায় হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে টাকা পাচার শুরু করেন।
২০১৩ সালে মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকে পরিচালনায় কোনো কমিটি করেননি। মন্দিরের আয়-ব্যয়েরও কোনো হিসাব নেই। ফলে প্রতি মাসে মন্দিরের আয়ের লাখ লাখ টাকা তিনি আত্মসাৎ ও ভারতে পাচার করেছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ।
এদিকে, ভারতীয় নাগরিক প্রদীপ বিশ্বাস ওরফে যতি গোস্বামী মহারাজকে অর্থপাচারের অভিযোগে আইনের আওতায় আনার দাবিতে বাংলাদেশ নাগরিক অধিকার ফাউন্ডেশনের আইন ও সালিশ বিষয়ক যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট মাসুদুল হক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দুদক চেয়ারম্যানের মাধ্যমে একটি লিখিত অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে, মহারাজের অপকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রসচিব বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেন শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর দেবালয়ের ভক্তরা।মন্দিরের জমির জাল দলিল সম্পাদন ও মন্দিরের নাম পরিবর্তন করায় মৌলভীবাজার জেলা জজ আদালতে একটি মামলা চলমান।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে আদালতে আরও চারটি প্রতারণার মামলা রয়েছে। মামলাগুলো পিবিআইয়ের তদন্তাধীন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে, ঢাকা, সিলেট, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নারীরা এসে পাঁচ থেকে ১০ দিন মন্দিরে অবস্থান করেন। রাতে মন্দিরে নারীদের নিয়ে গুরুমহারাজ প্রমোদ লীলায় মত্ত থাকেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনা চলছে।
মন্দিরের বর্তমান অধ্যক্ষ দামোদর মহারাজ বলেন, ‘এই মন্দির পরিচালনায় কোনো কার্যকরী কমিটি নেই। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে যতি গোস্বামী মহারাজের মধ্যে যেসব মামলা চলমান, এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আমি ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকি। এসব বিষয় যতি গোস্বামী মহারাজ ভালো বলতে পারবেন।
গুরুমহারাজের স্থানীয় ভক্ত ডা. ননী গোপাল বলেন, ‘গুরুমহারাজ বর্তমানে সিলেটে অবস্থান করছেন। তবে তিনি কোথায় থাকেন—তা বলতে পারব না।
পিবিআইয়ের মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ বলেন, ‘তিনটি অভিযোগের তদন্তের কাগজ পেয়েছি। বিষয়টির অনুসন্ধান চলছে। তদন্ত শেষ আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। ’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, চলমান পরিস্থিতি নিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে অভিযোগ পেয়েছি। এ নিয়ে বুধবার দুপুরে আমার কার্যালয়ে উভয়পক্ষকে নিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।