২ নভেম্বর ২০২১


‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হয়েও বহাল তবিয়তে সিটি সুপার মার্কেট!

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের তাগিদ ভেঙ্গে ফেলার। দফায় দফায় উদ্যোগও নেয়া হয় ভাঙ্গার জন্য। শেষ পর্যন্ত ভাঙ্গা হয় না। ঝুকিপূর্ণ এই ভবনের মালিকানা সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক)। তারপও ভাঙ্গতে পারে না ভবনটি। অবশ্য এবার ভবনটি ভেঙ্গে ফেলার জন্য নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে সিসিক।

তবে শোনা যাচ্ছে, এবারো ভবনটি ভাঙ্গা হচ্ছে না। সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেছেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। ব্যবসায়ীদের দাবি ভবনটি ভেঙ্গে বহুতল ভবন করতে তাদের আপত্তি নেই। তবে, সিটি কর্পোরেশনকে সিটি সুপার মার্কেটের স্থলে কতদিনের মধ্যে বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে ব্যবসায়ীদের কাছে দোকান হস্তান্তর করতে পারবে ও ভবন নির্মাণের আগে ব্যবসাবান্ধব স্থানে স্থানান্তরের নিশ্চয়তা সংক্রান্ত চুক্তিতে আসতে হবে।

জানা গেছে, সিলেটে ভূমিকম্প হলেই নড়ে চড়ে বসে সিসিক। নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর পুরনো তালিকা ধরে শুরু হয় নাড়াচাড়া। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী দিতে থাকেন হুমকি ধমকি। মাঝে মধ্যে দু-একটি ভবনে অল্প স্বল্প হাতুড়িও চালিয়েছেন। একটা সময় থেমে যান মেয়র। এবার মেয়র সিটি কর্পোরেশনের ভবন ভাঙ্গতে গিয়ে পড়েছেন চ্যালেঞ্জের মুখে।
সিটি সুপার মার্কেট সিসিকের মালিকানাধীন একটি পুরনো বিপণিবিতান। পৌরসভার সময়কাল থেকে এটি পরিচালিত হয়ে আসছে। তিন তলাবিশিষ্ট এ বিপণিবিতানে রয়েছে শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মার্কেটটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৭২ সাল।

নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নাম নিলেই প্রথমে সামনে চলে আসে সিটি সুপার মার্কেটের নাম। সেই মার্কেট ভবনটি ভাঙ্গার জন্য দফায় দফায় উদ্যোগ নিয়েও পুনরায় পিছু হটে সিসিক। অভিযোগ রয়েছে, মার্কেটের ব্যবসায়ীরা এতে বাধা হয়ে দাঁড়ান।

সর্বশেষ (চলতি বছরের গত ২৯ অক্টোবর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি ভেঙ্গে অপসারণের জন্য নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেয় সিসিক। এতে পুনরায় নড়েচড়ে বসেন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। তাদের মার্কেটটি ভেঙ্গে ফেলতে ঘোর আপত্তি। ২০১৬ সালে একবার ভবনটি ভেঙ্গে ফেলার উদ্যোগ নেয় সিসিক। ওই সময় সিসিকের উদ্যোগে নগরীর শাহী ঈদগাহ ও তাঁতী পাড়া এলাকায় দুটি ভবন ভেঙ্গে ফেলা হয়। তবে নিজেদের মালিকানাধীন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সিটি সুপার মার্কেট ভাঙ্গতে গিয়ে বাধাঁর মুখে পড়তে হয়। তখন ভবনটির ৩য় তলার ১৪টি দোকানকোটা ভেঙ্গে নিয়ম পালন করে সিসিক। এরপরে একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও ভেঙ্গে ফেলা যায়নি। এছাড়া, ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময়ও মার্কেটটিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়েছিলো সিসিক। একটা সময় এই বিজ্ঞপ্তিটি ওঠে যায়।

অন্যদিকে, ভবনটি ভেঙ্গে ফেলতে বেশ কিছুদিন থেকে ভেতরে ভেতরে এগুচ্ছিলো সিসিক। এর জন্য চলতি বছরের জুন থেকে কোন দোকানের ভাড়া নিচ্ছিলো না। গত ২৮ অক্টোবর সিলেটের একটি গণমাধ্যমে সিলেট সিটি সুপার মার্কেট নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেখে ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

সিটি সুপার মার্কেটের আকবর স্টোরের ব্যবসায়ী রমজান মিয়া বলেন, এটি দীর্ঘদিনের একটি বিপনি কেন্দ্র। ব্যবসার অবস্থা একেবারেই মন্দা। করোনার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, এরমধ্যে যদি মার্কেট ভেঙ্গে ফেলা হয়; তবে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। রমজান মিয়ার বক্তব্য এটি একটি প্লাস্টিক পণ্যের মার্কেট। এসব পণ্য ওজনের নয়। এতে মার্কেট ভেঙ্গে পড়বেও না। যদি পড়তো নগর ভবনের পাইলিংয়ের সময় মার্কেট ভেঙ্গে পড়তো। তিনি বলেন, মূলত ব্যবসায়ীদের কিছুদিন পর পর জুজুর ভয় দেখানো হয়। তার দাবি মার্কেটটিতে কোন ত্রুটি নেই।

সিটি সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান রজব বলেন, মার্কেটটিতে ৩২০টি দোকান রয়েছে। ৪ ভাগে বিভক্ত মার্কেটের দোকান মালিকদের সাথে ২০৩১ সাল পর্যন্ত চুক্তি রয়েছে। যা ২০১৭ সাল থেকে নিয়ে পর্যায়ক্রমে হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি মার্কেটটি ভেঙ্গে ফেলতেই হয়, তবে সিসিক চুক্তিতে আসবে কেন?।

রজব এর দাবি ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বর্তমান নগর ভবন যে প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে হয়েছে, সেই প্রকৌশলী দিয়ে মার্কেটটি সার্ভে করা হয়েছে। তার পরামর্শ মতে, তখন ১৪টি দোকান ভেঙ্গে ফেলে ভবনটি ঝুঁকিমুক্ত করা হয়। তবুও কিছু দিন পরপর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন হিসেবে ঘোষণার চেষ্টা চলছে। সর্বশেষ ব্যবসায়ীদের সাথে কথা না বলে নিলাম আহবান করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে।

সিটি সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো: জয়নুল হোসেন বলেন, সিটি কর্পোরেশন বহুতল ভবন করুক আমাদের আপত্তি নেই। তবে এর আগে সিটি সুপার মার্কেটের স্থলে কতদিনের মধ্যে বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে ব্যবসায়ীদের কাছে দোকান হস্তান্তর করতে পারবেন ও ভবন নির্মাণের আগে ব্যবসাবান্ধব স্থানে স্থানান্তরের নিশ্চয়তা সংক্রান্ত চুক্তিতে আসতে হবে। এছাড়া, ব্যবসায়ীদের সাথে কোন প্রকার আলোচনা না করে নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে সিটি কর্পোরেশন। এতে ব্যবসায়ীরা যেমন আতঙ্কিত তেমন চরম ক্ষুব্ধও।

মো: জয়নুল হোসেন বলেন, ২০১৬ সালে যখন ১৪টি দোকান ভেঙ্গে ফেলা হয়, তখন হার্ট অ্যাটাক করে ঘটনাস্থলেই মারা যান দোকান মালিক শরিফ উদ্দিন। সেই পরিবারকে তখন অনুদানও দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবিব।

মো: জয়নুল হোসেন বলেন, নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেখার পর মার্কেটের ব্যবসায়ীরা চরমভাবে হতাশ ও আতঙ্কিত হয়েছি। ব্যবসায়ীদের কোন ক্ষতি হলে সিসিককে এর দায়ভার নিতে হবে।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ। এটা ভেঙ্গে ফেলার তাগিদ দীর্ঘ দিনের। এর জন্য নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। শুনেছি ব্যবসায়ীরা মেয়রের সাথে দেখা করেছেন। মেয়র যে সিদ্ধান্ত দিবেন, সেটাই হবে বলে।

সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, সিটি মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ। এটি ভেঙ্গে ফেলার তাগিদ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। এর জন্য নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ প্রাথমিক কার্যক্রমের একটি। আমরা বিশ্বাস করি, এই মার্কেটের ব্যবসায়ীরা সিটি কর্পোরেশনেরই ভাড়াটে। তাদের মুহূর্তের মধ্যে পথে বসিয়ে দেয়া যায় না। ভবনটি ভাঙ্গার জন্য একদিকে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া চলবে, অন্যদিকে তাদের বিকল্প অস্থায়ী জায়গা তৈরি করে দেয়া হবে লালদিঘী মার্কেটে। জায়গা প্রস্তুতও রয়েছে।

তিনি বলেন, এরপর নতুন কমপ্লেক্স হয়ে গেলে তাদের দোকানের সিরিয়াল অনুযায়ী নিচতলা, দুতলা ও ৩য় তলায় নিজ নিজ দোকান সমঝে দেয়া হবে। মেয়র এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের বিভ্রান্ত না হওয়ার আহবান জানান।

শেয়ার করুন