১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১


হাওরাঞ্চলে বিদ্যালয় খুললেও যাচ্ছে না অনেক শিক্ষার্থী

শেয়ার করুন

অতিথি প্রতিবেদক : সুনামগঞ্জ জেলার দেখার হাওর পাড়ের স্থানীয় বাজারে চা বিক্রেতা ফজল উদ্দিন। স্বপ্ন দেখতেন ছেলে আল আমিন পড়ালেখা শিখে চাকুরি করে সংসারে সুখ আনবে। হাওরের প্রতিকূল পরিবেশ আর দারিদ্র্যতার মধ্যেও স্থানীয় বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলো আল আমিন। কিন্তু করোনা মহামারি আসার পর বিদ্যালয় বন্ধ হওয়ায় এবং ঘন ঘন দোকান বন্ধ থাকায় তছনছ হয়ে গেছে ফজল উদ্দিনের সেই স্বপ্ন। সংসারের হাল ধরতে পড়ালেখা ছেড়ে আল আমিন এখন ঢাকায় একটি গার্মেন্টস-এ শ্রমিকের কাজ করছে।

একই এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র শিহাব উদ্দিন এখন পিতার সাথে কৃষিকাজ ও হাওরে মাছ ধরায় সহযোগিতা করছে। সম্প্রতি বিদ্যালয় খুললেও শিহাব উদ্দিন জানালো, সে আর বিদ্যালয়ে যাবে না। স্কুল বন্ধ হওয়ার পর থেকে সে প্রতিদিন পিতার সাথে কাজে যায়। এখন পিতাও তাকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য বলেন না। ছেলের পড়ালেখা নিয়ে পিতা লুৎফুর রহমান বলেন, দুই বছর হলো স্কুলে যায়নি। ছেলের মধ্যে আগের মতো আর পড়ালেখার টান (স্পৃহা) নেই। সে (পিতাকে) আমাকে ভালোই সহযোগিতা করছে। তাই কাজই করুক।

করোনা মহামারির কারণে প্রায় ১৮ মাস বন্ধ থাকার পর গত ১২ সেপ্টেম্বর খুলেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শিক্ষায় পিছিয়েপড়া হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জের স্কুলগুলোতে আগের মতো শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে না। গত রোববার স্কুল খোলার প্রথম দিন থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই ৫দিন সুনামগঞ্জ জেলার দুর্গম এলাকার কয়েকটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ শিক্ষার্থী ক্লাসে ফিরেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক প্রতিকূল পরিবেশ ও দারিদ্র্যতার কারণে এমনিতেই হাওর এলাকায় ঝরেপড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে করোনার কারণে প্রায় দুই বছর বিদ্যালয় বন্ধ থাকা ও বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ার কারণে হাওর এলাকায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তথ্য বাতায়ন থেকে জানা যায়, জেলার ১১টি উপজেলায় (নতুন ২টিসহ) মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২০৯টি, এর মধ্যে সরকারি-৫টি, বেসরকারি-২০৪টি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৮৫৬টি। কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৪টি, মাদ্রাসা (সবধরনের ) ৯৭টি। জেলায় স্বাক্ষরতার হার ৩৫ ভাগ। স্বাক্ষরতার দিক দিয়ে পুরুষ-৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ, মহিলা-৩৩ দশমিক ১ শতাংশ।

করোনা মহামারীর আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশতি এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে গড়ে ঝরেপড়া শিক্ষাথীর হার ২০ শতাংশ। সেখানে সুনামগঞ্জ জেলায় ঝরে পড়ার হার ৩৬ শতাংশ। এছাড়া, জাতীয়ভাবে দারিদ্র্যের হার ২৪ শতাংশ। কিন্তু হাওর এলাকা সুনামগঞ্জে তা ২৮ শতাংশ ।

সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এক জরিপে প্রকাশ করেছে, করোনায় বাংলাদেশ দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে। আগে এটা ছিলো ২০.৫ শতাংশ। চরম দরিদ্র অবস্থার মধ্যে আছেন ২৮.৫ শতাংশ মানুষ। করোনায় বাল্যবিয়েও বেড়েছে। এই সবগুলোর অভিঘাতই পড়েছে শিক্ষার উপর। করোনায় ঝরে পড়ার হার বাড়বে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলার প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষের সাথে লড়াই করেই হাওর এলাকা সুনামগঞ্জের মানুষ টিকে আছে। এর আগে যত দুর্ভিক্ষ, বন্যা, খরা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসেছে, তার প্রতিটির একেকটি মাত্রা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারি একেবারেই ভিন্ন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শিক্ষার্থীদের। স্কুল দীর্ঘ বন্ধ থাকায় এবং অভাবের কষাঘাতে মাধ্যমিকের অনেক শিক্ষার্থী শ্রমিকের কাজে চলে গেছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। ঘরে বসে থাকা নবম-দশম শ্রেণির বালিকাকে দরিদ্র পিতামাতা বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ছেড়ে পিতার সাথে কাজে লেগে গেছে অনেক শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থী আর স্কুলে ফিরবে বলে মনে হচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রায় দুই বছর স্কুল বন্ধ থাকায় বিদ্যালয় বিমুখ এবং পড়ালেখার সাথে অপরিচিত হয়ে পড়ায় হাওরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সংখ্যা অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।

এদিকে, বেসরকারি সংস্থা গণস্বাক্ষরতা অভিযান তাদের ‘এডুকেশন ওয়াচ’ রিপোর্টে বলেছে, করোনার সময় দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শতকরা ৬৯.৫ ভাগ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারেনি। টেলিভিশনে প্রদান করা ক্লাসেও অংশগ্রহণ করতে পারেনি অনেকে। অংশগ্রহণ না করার এই হার শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে বেশি। তাদের জরিপ বলছে, শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়া এবং অনুপস্থিতি বাড়বে।

হাওরাঞ্চলে অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে সুনামগঞ্জের ছাতক ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মইনুদ্দিন আহমদ বাহার বলেন, হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জের গ্রামের স্কুলগুলোর এক শতাংশ শিক্ষার্থীও অনলাইন ক্লাসে অংশ নেয়নি। কারণ, দুর্গম এলাকায় সাধারণ মোবাইল ফোন হয়তো গিয়েছে, কিন্তু গ্রামগুলো অনলাইনে ক্লাস করার মতো স্মার্ট ফোন ব্যবহার ও তথ্যপ্রযুক্তিতে এতোটা এগুয়নি।

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন কুমার বলেন, স্কুল খোলার পর থেকে তিনি বিভিন্ন্ স্কুল ভিজিট করছেন। করোনায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে উপস্থিতি কিছুটা কম হচ্ছে। তিনি বলেন, ঝরে পড়ার মধ্যে ছেলেদের সংখ্যা বেশি হবে। আরও কিছুদিন ক্লাস চলার পর তারা উপস্থিতি-অনুপস্থিতির একটি তালিকা করবেন।

সুনামগঞ্জ জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহন লাল দাস বলেন, স্কুল খোলার পর প্রথমে স্বাস্থ্য নিরাপত্তার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের সুরক্ষা ও করোনা সচেতনতা নিয়ে তারা কাজ করছেন। ঝরে পড়ার বিষয়ে পরবর্তীতে কাজ করবেন। তবে, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, করোনার সবচেয়ে বড় সচেতনতা হলো হাত ধোয়া। হাওর এলাকা সুনামগঞ্জের ৩০ থেকে ৪০ ভাগ স্কুলে টিউবওয়েল নেই। বাইর থেকে বালতি দিয়ে পানি এনে হাত ধোয়ার কাজ চালানো হচ্ছে।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দীর্ঘদিন পর স্কুল খোলায় করোনার প্রভাব কিছুটা পড়েছে। তবে, প্রতিদিনই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। এ পর্যন্ত ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে এসেছে। তারা প্রতিদিনই রিপোর্ট তৈরি করে পাঠাচ্ছেন।

শেয়ার করুন