৯ আগস্ট ২০২১


শায়েস্তাগঞ্জে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে প্রসূতি মায়েরা

শেয়ার করুন

শায়েস্তাগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি : করোনা পরিস্থিতিতে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় বাসা-বাড়িতে বেড়েছে সন্তান প্রসবের হার। সেই সাথে হাসপাতালগুলোতে সীমিত আকারে সেবা, সময়মত সেবা না পাওয়ার আশঙ্কা, যানবাহন সমস্যা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব ও নির্ধারিত গুণগত সেবা না পাওয়ায় প্রসূতি মায়েরা রয়েছেন বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লকডাউন থাকার কারণে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রসূতি সেবার ম্যাটেরিয়াল পৌঁছাতে পারেন নি। পরিবার পরিকল্পনা সেন্টারগুলোও খোলা ছিল সীমিত সময়ের জন্য। তাই অনেকেই এর সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার নুরপুর ইউনিয়নের সুচনা বেগম। যিনি গত দুই মাস আগে স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। তিনি জানান, তাঁর প্রসব ব্যথা শুরু হলে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র দেয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই ডেলিভারি হয়। এখন তার ছেলে ও তিনি সুস্থ আছেন।

উপজেলার নুরপুর ইউনিয়নের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক মা বলেন, ‘আমার আলট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট অনুযায়ী সন্তান হওয়ার কথা আছে চলতি মাসের শেষ দিকে। কিন্তু গতমাসে আমি একটু ব্যথা অনুভব করলে আমাকে প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা বিভিন্ন রিপোর্ট করিয়ে আমাকে অপারেশন করতে বলেন, কিন্তু আমি অপারেশন করিনি। এই বিষয়টি নিয়ে আমার অসুস্থ শরীরে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে।’

তবে করোনাকালে সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রয়োজনমাফিক ডাক্তার না পাওয়া। বেশিরভাগ চিকিৎসক চেম্বার বা হাসপাতাল ডিউটি করছেন না। আবার অনেক চিকিৎসক করোনা ইউনিটে ডিউটি করে চেম্বার বা সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা আপাতত বন্ধ রেখেছেন। সেই সাথে আছে লকডাউন। পরিবার পরিকল্পনার মাঠকর্মীরাও তাদের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। সব মিলিয়ে সাধারণ রোগীর পাশাপাশি বিশেষ করে প্রসূতি মায়েরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মী মনোয়ারা বেগমের সাথে তিনি জানান, বিগত তিনমাসে আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৩৫টি নরমাল ডেলিভারিতে সহায়তা করেছি। সবগুলো ডেলিভারির মা ও শিশু সুস্থ রয়েছেন। গত একমাস আগে শায়েস্তাগঞ্জের একটি ডেলিভারিতে যাওয়ার কথা ছিল, পরে যাওয়া হয়নি। তখন এই গর্ভবতী মাকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে নবজাতকের মৃত্যু হয়।

ব্র্যাকের স্বাস্থ্য পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির এলাকা ব্যবস্থাপক খায়রুল বাশার জানান, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় ৪ জন স্বাস্থ্যকর্মী বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেল চেকআপ ও প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র দিয়ে আসছে। এরই মাঝে আমাদের একজন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন যিনি ক্লিনিকে ডেলিভারি করতে সাহায্য করে থাকেন।

তিনি বলেন, ‘আমি মূলত হোম ডেলিভারির মতবিরোধী। আমি চাই ক্লিনিকে ডেলিভারি করা হোক। এতে করে মা ও শিশু সঠিকভাবে চিকিৎসা পেয়ে থাকেন ও মৃত্যুর ঝুঁকিও কমে যায়।’

নুরপুর ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক মো. আব্দুল মজিদ জানান, গত তিনমাসে নুরপুর ও ব্রাহ্মণডুরা ইউনিয়নে মোট ১০৮টি ডেলিভারি হয়েছে। এর মধ্যে বাড়িতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর সহযোগিতায় ডেলিভারি হয়েছে ৩৮টি, অপ্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের সহায়তায় হয়েছে ৫৪টি। তন্মধ্যে সিজার হয়েছে ৬টি ও হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ১০টি। এই সময়ে কতজন শিশু মারা গেছেন এই তথ্যটি আমার কাছে এখন নেই।

তিনি বলেন- ‘এই করোনাকালে স্বাভাবিক প্রসব বেড়ে যাওয়াকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। তবে অবশ্যই দক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের সহযোগীতা নিয়ে স্বাভাবিক প্রসব করাতে হবে। তবেই শিশু ও মায়েদের ঝুঁকি কমবে।’

হবিগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানবিদ মোছা. দিলারা খাতুন জানান, ‘আসলে হবিগঞ্জ সদর উপজেলা ও শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় একইসাথে স্বাভাবিকপ্রসবের হার গণনা করা হয়ে থাকে। গত তিনমাসে আনুমানিক ১৯৫ জন মা স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। এরই মাঝে কয়েকটি শিশু মৃত হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। গত তিনমাসে আমাদের সংগৃহীত তথ্যমতে কোন মা মারা যাননি।’

তিনি আরো জানান, ‘প্রতিটি উপজেলায় আমাদের দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন, যারা প্রান্তিক পর্যায়ে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’

শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাদ্দাম হোসেন জানান, ‘এই বিষয়টি পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ দেখে। তবে, আমি মনে করি এই করোনাকালে স্বাভাবিক প্রসবের হার বেড়েছে এটা ইতিবাচক দিক। যদিও সন্তান প্রসবের আগে ও পরে মায়েদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে অবশ্যই ভাল চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।’

শেয়ার করুন