১০ জুলাই ২০২১


করোনায় বিপর্যস্ত সিলেট, প্লাজমার জন্য হাহাকার

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : মহামারি করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে সিলেট। চলতি মাসের শুরু থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিনই শনাক্ত ও মৃত্যুতে রেকর্ড গড়েছে। শনাক্তের রেকর্ডের পাশাপাশি করোনায় আক্রান্ত আর উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের চাপে টালমাটাল এখন সিলেটের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল। রোগীদের বেশিরভাগই সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের। আর প্লাজমার জন্য হন্যে হয়ে ছুটছেন রোগীর স্বজনরা।
করোনা আক্রান্ত হয়ে নগরীর একটি বেসরকারী হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন বিশ্বনাথের এক নারী (৫৫)। ওই নারীর স্বামী ও ছেলে নেই। ভাসুরের ছেলে তাকে দেখাশুনা করছেন। তিনি জানান, আমার চাচীর অবস্থা খুব খারাপ। এ পজিটিভ প্লাজমা দরকার, কিন্তু পাচ্ছি না। দুই দিন ধরে প্লাজমা খুঁজছি।

একই হাসপাতালে করোনা উপসর্গ নিয়ে ৭০ বছর বয়সী নানীকে ভর্তি করেন কামরুল। হাসপাতালে ভর্তির পর তার করোনা শনাক্ত হয়। বর্তমানে কামরুলের নানী করোনা আক্রান্ত হয়ে সিলেটের নূরজাহান হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন। চিকিৎসকরা বলেছেন তার চিকিৎসার জন্য প্লাজমা দরকার। তাই হন্য হয়ে প্লাজমা খুঁজছেন কামরুল। কামরুলের মত সিলেটের অনেক করোনা আক্রান্ত রোগীর স্বজনরা প্লাজমার জন্য ছোটাছুটি করছেন। কিন্তু প্লাজমা পাচ্ছেন না।

সিলেটে প্লাজমা সংগ্রহ করে রোগীদের সহযোগিতা করে ‘ইমার্জেন্সি প্লাজমা সংগ্রহকারী টিম সিলেট’ নামে একটি সংগঠনের সদস্যরা।

এই সংগঠনের সদস্য শফি আহমেদ জানান, তাদের কাছে প্রতিদিনই প্রায় ১৫ থেকে ২০টি কল আসে প্লাজমা সংগ্রহ করে দেওয়ার জন্য। এর বিপরীতে আমরা মাত্র তিন থেকে পাঁচ জনকে প্লাজমা সংগ্রহ করে দিতে পারি।

সিলেট বিভাগে করোনা চিকিৎসার জন্য রয়েছে একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল। পাশাপাশি সিলেটের তিনটি বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। করোনা রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এসব হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা প্লাজমা থেরাপি দেওয়ার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন। এই প্লাজমা থেরাপিতে অনেক রোগী ভাল হচ্ছেন আবার অনেকর অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে বলে জানান চিকিৎসকরা।

সরজমিনে নগরীর মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে দেখা যায়, ‘ইমার্জেন্সি প্লাজমা সংগ্রহকারী টিম সিলেট’ এর সদস্য শফি আহমেদ চারজন ডোনার নিয়ে এসেছেন প্লাজমা সংগ্রহ করার জন্য। তাদের সঙ্গে আছেন প্লাজমা ব্যবহারকারী রোগীর স্বজনরা।

শফি আহমেদ বলেন, প্রতিদিনই ১৫ থেকে ২০ জন রোগীর স্বজন আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন প্লাজমার জন্য। আমরা সবাইকে প্লাজমা দিয়ে সহযোগিতা করতে পারি না। কারণ যেকারো প্লাজমা করোনা রোগীর শরীরে দেওয়া যায় না। যারা করোনামুক্ত হয়েছেন শুধুমাত্র তাদের প্লাজমা করোনারোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এখন অনেক করোনামুক্ত রোগী স্বাছন্দে প্লাজমা দেন। আবার অনেকে ভয় পান প্লাজমা দিতে। অনেকেই মনে করেন করোনা থেকে মুক্ত হওয়ার পর আবার প্লাজমা দিলে হয়তো তার শরীরে ক্ষতি হতে পারে। তাই এই প্লাজমা সংকট।

তবে করোনা চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপির ক্লিনিক্যালি কোনো প্রমাণ নেই বলে জানান চিকিৎসকরা। তারপরও রোগীর স্বজনদের চাহিদার প্রেক্ষিতে প্লাজমা থেরাপির পরামর্শ দেন বলে জানান বেশ কয়েকজন চিকিৎসক।

ডসলেটের একমাত্র করোনা ডেডিকেটেডট চিকিৎসাকেন্দ্র শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা বলেন, করোনা চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপিতে খুব একটা লাভ হয় না। তাছাড়া ক্লিনিক্যালি কোনো প্রমাণ নেই এই থেরাপির। শুরুর দিকে আমরাও কয়েকজন করোনা রোগীকে প্লাজমা থেরাপি দিয়েছি। এখন আর আমরা এই থেরাপি ব্যবহার করছি না। তবে অনেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্লাজমার সাজেশন দিতে পারেন। এটা তাদের ব্যক্তিগত মত। তবে প্লাজমা দিলে প্লাজমাদাতার কোনো শারীরিক সমস্যা হয় না। করোনামুক্ত হওয়ার ২৮ দিন পর প্লাজমা দেওয়া যায়।

এদিকে উপজেলাগুলোতে দিনে দিনে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও বাড়ছে না নমুনা পরীক্ষার হিসেব। কোন কোন উপজেলায় সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৭ থেকে ১০টি নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এতে করে কোন জায়গায় কত পরিমাণ রোগী আছে, কোথায় সংক্রমণ বেশি হচ্ছে তার সঠিক হিসেব বুঝা যাচ্ছে না। অথচ সীমান্ত, হাওর আর চা-বাগানবেষ্ঠিত সিলেট বিভাগে গত কয়েকদিনে রেকর্ড পরিমাণ রোগী শনাক্ত হয়েছে।

তবে করোনার সংক্রমণের এমন উচ্চহারে ঝুঁকি বিবেচনায় সিলেটে নেই টেস্টের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ। সিলেট নগর ও জেলা শহরে তবুও কিছু মানুষ স্ব-উদ্যোগে করোনার পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রে যাচ্ছেন। তবে গ্রাম অঞ্চলের মানুষ জ্বর, সর্দিসহ করোনার সকল উপসর্গ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও করোনার নমুনা পরীক্ষা করছে না। তাছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য অফিস কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরীক্ষা বাড়ানোর জন্য নেয়া হচ্ছে না কোন উদ্যোগ। শুধু উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সগুলোতে রাখা হয়েছে নমুনা দেয়ার বুথ। এসব বুথে সংশ্লিষ্ট উপজেলার প্রান্তিক মানুষের তুলনায় উপজেলা সদরের সচেতন মানুষেরাই নমুনা দিচ্ছেন।

এর আগে গত ৪ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতর দেশের ৪৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে যে, ভর্তি রোগীদের বেশিরভাগই গ্রামের। রোগীরা হাসপাতালে আসছেন রোগে আক্রান্ত হওয়ার বেশ পরে, যখন পরিস্থিতি চলে যাচ্ছে খারাপের দিকে।

একই কথা বলছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা। তাঁরা বলছেন, ‘গ্রামে করোনা নেই’ এমন কথা বলে গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারি নির্দেশ যথাযথ পালন না করার প্রবণতা রয়েছে। সেজন্য জ্বর, সর্দি থাকলে অনেকেই পরীক্ষা করাতে চান না। আর যখন পরীক্ষা করাতে আসেন তখন শেষ মুহূর্তে আসেন। তখন তাদের বেশিরভাগ মানুষেরই অক্সিজেন সাপোর্টের প্রয়োজন হয়।’

তবে সকল কিছু জেনেও পরীক্ষা বাড়ানোর জন্য দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বলছে, সম্প্রতি করোনা রোগী বেড়ে যাওয়ায় পরীক্ষা বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া করোনা রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেখে চিকিৎসা দেয়ার জন্য বলা হচ্ছে। তবে কোন রোগীর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তাকে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে রেফার্ড করা যাবে। এ ব্যাপারে সরকারের সকল নির্দেশনা, সচেতনতা, পরীক্ষা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রান্তিক পর্যায়ে গেলেই শেষ। কোন কোন উপজেলায় সপ্তাহে একদিন, কোথায় দিনে দু-চার থেকে ১০টা, কোথাও দু-চার সপ্তাহে হয়নি করোনা পরীক্ষা।

সিলেটের কানাইঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অভিজিৎ শর্মা বলেন, আমরা প্রতি মঙ্গলবারে নমুনা প্রেরণ করি। সবশেষ মঙ্গলবারে ৭/৮ জনের নমুনা প্রেরণ করি এরমধ্যে দুজনের করোনা শনাক্ত হয়। তবে তাদের কারোই বড় কোন সমস্যা নেই। এছাড়া আমরা অ্যান্টিজেন টেস্ট করছি।

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রত্নদীপ বিশ্বাস বলেন, সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) ৩০ জনের স্যাম্পল সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে। এই ৩০ জনের রিপোর্ট এখনো আসেনি। তবে গতকাল র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টে ৫ জনের মধ্যে ৪ জনের করোনা পজিটিভ এসেছে।’ উপজেলা কমপ্লেক্স থেকেই স্যাম্পল সংগ্রহ করা হয়।

কুলাউড়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফেরদৌস আক্তার জানান, গত দুদিনে ৪৯ দিন নমুনা প্রেরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ১৯টি পজিটিভ এসেছে। আর গত ১ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত ১২৪ জনের নমুনা প্রেরণ করা হয়। এরমধ্যে ৫৪ জনের রিপোর্ট পজিটিভ আসে। এছাড়া এ উপজেলায় এক মাস আগে থেকে অ্যান্টিজেন টেস্ট শুরু হয়েছে।

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সুমন ভূইয়া জানান, গত এক সপ্তাহে ৯টি নমুনা সংগ্রহ করে পিসিআর ল্যাবে পাঠানো হয়। এরমধ্যে একটি পজিটিভ এসেছে। সর্বশেষ গত দিন আগে পিসিআর ল্যাবে নমুনা পাঠানো হয়েছে। অ্যান্টিজেন টেস্ট চলছে। গত আট দিনে দিনে ৪৬ জনের অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হয়েছে।

তাহিরপুরের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মির্জা রিয়াদ হাসান জানান, গত এক সপ্তাহে ৩৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এরমধ্যে ১০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রেই নমুনা সংগ্রহ করা হয় বলে জানান তিনি। তিনি জানান, উপজেলায় অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হচ্ছে।

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাদ্দাম হোসেন জানান, গত এক সপ্তাহে শায়েস্তাগঞ্জে ৪০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল ১৯টি নমুনা টেস্টের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ পর্যন্ত শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় ৯৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন, সম্প্রতি দুই জন রোগী মারা গিয়েছেন। এছাড়া শায়েস্তাগঞ্জে অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হয়ে থাকে।

আর চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোজাম্মেল হক বলেন, চুনারুঘাটে সবশেষ দুজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবে তিনি বাইরে থাকায় বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেন নি।

বানিয়াচং উপজেলা মেডিকেল অফিসার ডা. মইনুল ইসলাম জানান, ১ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত উপজেলায় ১৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়। তবে ৮ জুলাই কোন নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি। উপজেলা ৮ জুলাই পর্যন্ত ১১৯৪ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। এরমধ্যে ১২৭ জনের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। ১ থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত ২৫টি অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হয়। এরমধ্যে ৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিভাগীয় কার্যালয় সিলেটের সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রক) ডা. নূরে আলম শামীম বলেন, সম্প্রতি গ্রামের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী কয়েকগুন বেড়েছে। বিভিন্ন উপজেলা থেকে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীরা প্রতিদিন আসছেন। তবে আমরা সম্প্রতি জোর নির্দেশনা দিয়েছি যাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হয়। তবে যদি কারো বেশি অক্সিজেন ও আইসিইউ সাপোর্ট লাগে তাহলে তাকে সদর হাসপাতাল কিংবা সিলেটে প্রেরণ করবেন। এছাড়া উপজেলাগুলোতে টেস্টের পরিমাণ বাড়ানোর জন্যও সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জনদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর আগে নির্দেশনাটি দেয়া হলেও এবার নির্দেশনাটিতে জোর দেয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা লক্ষ করেছি সম্প্রতি করোনায় আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে যেসব রোগী ভর্তি আছেন, তাদের অর্ধেকের বেশি গ্রামাঞ্চলের। এসব রোগীর বেশিরভাগই রোগের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার পর হাসপাতালে এসেছেন। সেজন্য তাদের সবারই অক্সিজেন সাপোর্ট লাগছে।

শেয়ার করুন