১২ মে ২০২১


সিলেট ছাড়ছেন ঘরমুখো মানুষ

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : করোনাভাইরাসে কারণে দূর পাল্লার গণপরিবহণ বন্ধ থাকায় সিলেট থেকে ঘরমুখো মানুষেরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে অনেকেই কার, মাইক্রোবাসগুলোতে গাদাগাদি করে উঠছেন। উঠছেন অ্যাম্বুলেন্সেও। এতে একদিনে যেমন স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে তেমন বাড়ি ফেরা মানুষদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া।

তবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আন্তজেলায় গণপরিবহণ চালু থাকায় কিছুটা স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছেন সিলেট-জকিগঞ্জ, সিলেট-ভোলাগঞ্জসহ জেলার অন্যান্য রোডের যাত্রীরা।

এর আগে করোনার সংক্রমণ রোধে চলাচলে সরকারের কঠোর বিধিনিষেধের ২২ দিন পর গত ৬ মে জেলা শহরে গণপরিবহন চলাচলের নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেই প্রজ্ঞাপনের পর থেকেই দূর পাল্লার গণপরিবহণ বন্ধ থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে আন্তজেলা বাস সার্ভিস।

এদিকে বৃহস্পতিবার থেকে ঈদের ছুটির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সেই হিসেবে আগামী শনিবার পর্যন্ত তিনদিনের ঈদের ছুটি থাকছে। আর ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার সাথে সাথেই সিলেট ছাড়ছেন মানুষ। পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটাতে শতবাঁধা পেরিয়েও ঘরে ফিরতে চান ঘরমুখো মানুষেরা। বাড়তি ভাড়া আর গাড়ি পাল্টানোর ঝামেলাকে উপক্ষো করেই তারা বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন। ভিড় জমাচ্ছেন শহর ছাড়ার কেন্দ্রগুলোতে।

উচ্চ শিক্ষা, চিকিৎসা, নাগরিক সুযোগ সুবিধা ও কর্মক্ষেত্রের প্রসারতায় বিভাগীয় শহরে আসেন মানুষেরা। এতে করে জেলায় চাপ পড়ে অন্যান্য তিন জেলার মানুষের। যার ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাড়ি ফিরতে এখন অবলম্বন করছেন প্রাইভেটকার অথবা মাইক্রোবাস।

মঙ্গলবার রাত ১০ টার দিকে হুমায়ূন রশীদ চত্বর, চণ্ডিপুল, কদমতলীতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিলেট থেকে বাড়ি ফেরার জন্য মানুষ গাড়ির অপেক্ষায় আছেন। তবে দুর পাল্লার বাসা না থাকায় কার, মাইক্রোবাসেই ফিরতে হচ্ছে এসব ঘরমুখো মানুষের। বাদ যাচ্ছে না অ্যাম্বুলেন্সও। মঙ্গলবার রাত ১০ টা থেকে ১০ টা ১০ এর মধ্যে হুমায়ুন রশীদ চত্বর থেকে দুটি অ্যাম্বুলেন্স যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায়। এসব অ্যাম্বুলেন্সের চালকরা দরদাম করে ভাগা নির্ধারণ করে যাত্রী উঠিয়েছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুন বেশি ভাড়া নিয়েছেন চালকরা।

মাইক্রোবাসে হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন মতিন মিয়া। তিনি সিলেট নগরের একটি বেকারিতে চাকরি করেন। ছুটি নিয়েছেন ঈদ পরিবারের সঙ্গে আদায় করার জন্য। রাত ৮টা থেকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের হুমায়ুন রশিদ চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভাড়ায় বনিবনা না হওয়ায় আগের গাড়ি দিয়ে তিনি যাননি। অন্য একটি মাইক্রোবাসে ৩০০ টাকার ভাড়ায় তিনি রওয়ানা দিচ্ছেন তার বাড়ির উদ্দেশ্যে। এর আগের গাড়িগুলো ভাড়া দাবি করেছিল ৫০০ টাকা।

মতিন মিয়া বলেন, পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটাতেই বাড়ি যাচ্ছি। সেখানে আমার ছোট দুটি সন্তান রয়েছে। তাদের জন্য কাপড়ও কিনেছি। এগুলো নিয়ে বাড়িতে না গেলে ঈদটাই মাটি হয়ে যাবে। পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটাতে না পারলে মনের ভেতর একটা চাপা অশান্তি থেকে যাবে। যার কারণে বাধ্য হয়েই বাড়তি ভাড়া দিয়ে মাইক্রোবাস দিয়ে যাচ্ছি।

এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে নগরের আখালিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সিলেট, সুনামগঞ্জ জেলার এ সড়কে গণপরিবহণ বন্ধ থাকলেও লুকিয়ে চলছে সিএনজি অটোরিকশা, নুহা ও প্রাইভেটকার। নগরের কুমারগাও বাসস্ট্যান্ড, মদিনা মার্কেটসহ নগরীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে এ গাড়িগুলো ছেড়ে যাচ্ছে।

এসময় কথা হয় নগরের আখালিয়া এলাকার মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাসিন্দা ইমন আহমদের সাথে। তিনি মাউন্ট এডোরার সামনে ও মদিনা মার্কেটের আশপাশ থেকে প্রাইভেটকার পাওয়া যায় এমন তথ্যের ভিত্তিতে মাউন্ট এডোরার সামনে এসেছেন। পরে সেখানে থাকা একটি প্রাইভেটকারের ড্রাইরের সাথে ৭০০ টাকার বিনিময়ে বাড়ি যাওয়ার চুক্তি করেন তিনি। ইমনের মতো আরও ৫ জনকে নিয়ে দিরাইয়ের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় গাড়িটা।

ইমন বলেন, এমনিতে ১২০ টাকা বাস বাড়া, সেই জায়গায় ৭০০ টাকা দিয়ে যেতে হচ্ছে। প্রাইভেট কোম্পানিতে ৬ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করা একটা মানুষ যদি ৭০০ টাকা বাড়া দিয়ে বাড়ি যেতে হহ, তাহলে টিকবো কিভাবে?

কিছুক্ষণ পর একই জায়গায় সাইদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি পরিবারের ৩ সদস্য নিয়ে আসেন বাড়ি যাবেন বলে। কিন্তু এখানে কোন গাড়ি না থাকার বিপাকে পড়েন তিনি। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও কোন গাড়ি না পাওয়ায় ফের বাসার চলে যান।

সাইদুল বলেন, যান চলাচল বন্ধ হলেও বাড়ি তো যেতে হবে। পরিচিত একজনের কাছ থেকে শুনলাম এখান থেকে প্রাইভেট গাড়িগুলো ছেড়ে যায়। কিন্তু এসে তো পেলাম না। তাই বাসায় চলে যাচ্ছি। বিকেলে আবারও আসবো, দেখী কষ্ট করে হলেও তো বাচ্চাদের বাড়ি নিয়ে যেতে হবে।

দুপুর ২ টার দিকে আখালিয়া পয়েন্টে আসেন তাহিরপুরের জয়নাল মিয়া। সেখানে থাকা একটি প্রাইভেট কার ড্রাইভারের কাছে গেলে ৮০০ টাকা ভাড়া দিতে হবে বলে জানায় সে। পরে ৫০০ টাকা দিতে চাইলে অসম্মতি জানান গাড়ির ড্রাইভার। পরক্ষণে এর চেয়ে কম টাকায় যাওয়ার জন্য অন্য গাড়ির অপেক্ষায় বসে থাকেন তিনি।

জয়নাল বলেন, দেখেন ভাই দুর পাল্লার বাস বন্ধ হওয়ায় প্রাইভেটগাড়িগুলো কেমন আচরণ করছে। ১২০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা দেয়ার কথা বলছে। বড় লোকেরার তো সমস্যা নেই, তারা রিজার্ভ করে চলে যাবেন। বিপদে তো আমাদের মতো মানুষ।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) বিএম আশরাফ উল্যাহ তাহের বলেন, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। তারপরও যদি কেউ আইন অমান্য করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর লুকিয়ে লুকিয়ে যে জায়গাগুলো থেকে প্রাইভেট গাড়িগুলো ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছেন, বিষয়টি দেখতেছি। এরকম কিছু হলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেয়ার করুন