৪ মে ২০২১


হাওরে প্রযুক্তির ছুয়ায় কৃষিতে বিপ্লব

শেয়ার করুন

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : কৃষক বেলাল হোসেনের মুখে সর্বক্ষণ হাসির ঝিলিক । এবারের বোরো মৌসুমে ৭ খানি জমিতে বোরোধান চাষ করেছিলেন তিনি। ফলন ভালো হয়েছে। সপ্তাহ দিনের মধ্যে ধান কাটা, মারাই, শুকানোসহ সকল প্রক্রিয়া শেষ করে ধান গোলায় তুলে তৃপ্তির ডেকুর বেলালের। কোনো ধরণে বিপ্তি ছাড়াই নিরাপদে গিরস্তি সমাপ্ত করেছেন দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পাখিমারা হাওর পাড়ের কৃষক বেলাল হোসেন।

বেলাল জানান, এবার কৃষি কাজে আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহারসহ উন্নত বীজ ও সার ব্যবহারের ফলে ফসল উৎপাদনে সাফল্য পেয়েছেন তিনি। দ্রুত সময়ে ফসল ঘরে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সরকারের দেয়া হারবেস্টর মেশিন। একই সাথে ধানকাটা ও মারাই প্যাকেট জাত করায় খুব কম সময়ে অধিক জমির ফসল কেটে বেলালের মতো সুনামগঞ্জ জেলার হাজারো কৃষকের মুখে হাসি ফোটিয়েছে কৃষি কাজে ব্যবহৃত এই ডিজিটাল যন্ত্রটি। নিরাপদে বোরো ধান গোলায় তুলতে পারায় আনন্দের জোয়ার বইছে হাওর অঞ্চল সুনামগঞ্জের কৃষক পরিবারে। এই আনন্দ আয়োজনের মূল কারিগর কৃষি খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার।

কৃষিতে ডিজিটাল প্রদ্ধতি ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে কৃষি বিপ্লব দেখা দিয়েছে। যার পুরু কৃতিত্বের দাবিদার বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের।

সুনামগঞ্জ হাওর অধ্যুষিত জেলা। এ জেলায় ছোটবড় মিলে দেড় শতাধিক হাওর রয়েছে। এসব হাওরে যে ধান ফলে তা দিয়ে সারা বছরের খাদ্যের সংস্থানসহ উদ্বৃত ধান বাহিরে রপ্তনী করা হয়। ১১ উপজেলার বেশিরভাগ স্থান নিম্নাঞ্চল হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমের বোরো ধানের আবাদই এ অঞ্চলের প্রধান খাদ্যের যোগান দেয়। হাওর অঞ্চলের কৃষির উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যবস্থায় বীজ,সার, কীটনাশক সরবরাহ, কৃষককে প্রনোদন প্রাদনসহ ফসলের সুরক্ষায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের ফলে জেলার কৃষি সূচকে এসেছে সম্ভাবনা।

সুনামগঞ্জে এবার ১৩৭ টি হাওরে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৩২৩ হেক্টর জমিতে। এই বোরো ধান থেকে প্রায় ৯ লক্ষ ১ হাজার মেট্রিকটন চাল উৎপাদিত হবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। জেলায় বছরে বোরো-আমন মিলে সর্বমোট ১১ লক্ষ ৫১ হাজার ৮৬৬ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদিত হয়ে থাকে। এ জেলার ২৯ লাখ মানুষের বাৎসরিক খাদ্যের চাহিদা ৪ লক্ষ ৭৯ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন । এ বছর উৎপাদিত বোরো থেকেই ৪ লক্ষ ২১ হাজার ৪৯৫ মেট্রিক টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকবে। যা দেশের খাদ্য যোগানে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখবে।

সুনামগঞ্জের কৃষিতে সাফল্যের পেছনে সরকারে গৃহীত পদক্ষেপ প্রসংশার দাবি রাখে। উন্নত বীজ,সার, কীটনাশক সরবরাহ করা, ডিজিটাল পদ্ধতিতে চাষাবাদে কৃষকের উন্নত প্রক্ষিণের ব্যবস্থা করা, ভুর্তকীমূল্যে ডিজিটাল কৃষি যন্ত্রপাতি প্রদান, ফসলের সুরক্ষায় বাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রনোদনার ব্যবস্থা করাসহ উৎপাদিত ফসল ন্যায্যমূল্যে বিক্রয় নিশ্চিতে বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশের নেতৃত্বে থাকা সরকার খুবই আন্তরিক। চলিত বোরো মৌসুমে কৃষকরা যাতে নিরাপদে আগাম বন্যার আগে দ্রুত সময়ে ধান কাটতে পারেন সেই জন্যে কৃষি বিভাগের মাধ্যমে ৭০% ভুর্তকীমূল্যে ১০৭ টি হারভেস্টর মেশিন কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়। যার কারনে জেলার কৃষকরা নির্বিঘ্নে ধান কেটে গোলায় তুলতে পেরেছেন।

এছাড়াও চাষাবাদের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি প্রদানসহ পানির সেচের সুব্যবস্থা নিশ্চিতে উৎপাদনে এসেছে সাফল্য। তাই বেলাল হোসেনের মতো লাখ কৃষক স্বপ্ন দেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তিনবেলা ডালভাত খেয়ে বেঁচে থাকার। পড়াশুনা করিয়ে মেয়েটাকে ভালো ঘরে বিয়ে দেয়ার। ছেলেটাকে দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করায়। তাঁর উৎপাদিত ফসল দিয়ে দেশের জিডিপিতে অবদান রাখার। যা একদিন ছিলো কল্পনার বাহিরে।

এইতো সেদিন ২০১৭ সালে অকাল বন্যায় ফসল ডুবিতে তলিয়ে যায় জেলার সকল হাওরের ফসল। এর আগের বছর গুলোতে পর পর হাওর ডুবিতে মাঝা ভেঙ্গে দিয়েছিল চাষীদের। ফসল রক্ষায় প্রাণপন লড়ে যেতেন হাওর পাড়ের কৃষকরা। মসজিদের মাইকের ঘোষণা উড়া কোদাল নিয়ে ছুটতেন বাঁধে। রাতদিন চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হতো না। এমন কোনো বছর ছিলনা জেলার কোনো কোনো হাওরে বাঁধ ভেঙ্গে ফসল তলিয়ে যায়নি। শ্রমিক সংকট আর প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্রপাতি অভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি কৃষকদের। এ থেকে এখন পরিত্রাণ মিলেছে । কাবিটা নীতিমালা ২০১৭ অনুযায়ি বোরো ফসলের সুরক্ষায় হাওর পাড়ে বাঁধ নির্মাণে সরকার প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। যা অকল্পনীয়।

২০২০-২০২১ অর্থ বছরে পিআইসির মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণে ১৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। যা অতীত সময়ে কোনো সরকারই করতে পারেনি। দুর্যোগ ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস এখন মোবাইলে পাচ্ছেন কৃষকরা। সতর্ক হচ্ছেন, গ্রহণ করছেন প্রয়োজনীয় পরামর্শ। কৃষি সেবা মিলছে হ্যান্ডফোন কিংবা স্মার্ট ফোনে। কৃষক অ্যাপ্সে মিলছে অসংখ্য পরিষেবা। কৃষক ও কৃষির জন্য সরকারের ডিজিটাল উদ্বাবনী সুনামগঞ্জ তথা বাংলাদেশের কৃষিতে ঘটেছে বিপ্লব। কৃষি প্রদান বাংলাদেশ এড়িয়ে যাক দুর্বার গতিতে। কৃষক বাঁচুক মাছে ভাতে।

শেয়ার করুন