২৫ এপ্রিল ২০২১
বিশেষ প্রতিবেদক : সিলেটে ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে করোনা। মহামারি এই ভাইরাসে সিলেটে গত ২৪ ঘন্টায় আরো ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সিলেটে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৩৩২ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট অঞ্চলে আরও ৪৫ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। এই সময়ে চিকিৎসাধীন আরও ১২৯ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এমন পরিস্থিতিতে সিলেট সীমান্তের সকল স্থলবন্দরে নেয়া হয়েছে সর্বোচ্ছ সতর্কতা। আর দোকানপাঠ ও শপিংমল খুলে দেয়ার কারনে এখন সর্বত্র চলছে নিয়ম ভাঙ্গার হিড়িত।
রোববার সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সুলতানা রাজিয়া স্বাক্ষরিত কোভিড-১৯ কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের দৈনিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে ৪৫ জনের দেহে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। সবমিলিয়ে সিলেট বিভাগে মোট করোনা প্রমাণিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ালো ২০ হাজার ২৩২ জনে। যাদের মধ্যে সিলেট জেলায় ১২ হাজার ৯৩০ জন, সুনামগঞ্জে ২ হাজার ৭১৪ জন, হবিগঞ্জ জেলায় ২ হাজার ৩১৫ জন ও মৌলভীবাজারে ২ হাজার ২৭৩ জন মানুষ ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হন।
গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে শনাক্ত হওয়া ৪৫ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর ১৮ জনই সিলেট জেলার বাসিন্দা। এছাড়া বিভাগের সুনামগঞ্জে ১০ জন ও হবিগঞ্জে ২ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এদিকে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও ১৫ রোগীর শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এসময়ে সিলেট বিভাগে নতুন করে আরও ১২৯ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। যাদের মধ্যে ১২৮ জন সিলেট জেলার বাসিন্দা ও মৌলভীবাজার জেলার ১ জন। এনিয়ে বিভাগে করোনা থেকে সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা ১৮ হাজার ৪৪৩ জন। যাদের মধ্যে সিলেট জেলায় ১১ হাজার ৯৯৯ জন, সুনামগঞ্জে ২ হাজার ৫৮৫ জন, হবিগঞ্জ জেলায় ১ হাজার ৭৭০ জন ও মৌলভীবাজারে ২ হাজার ৮৯ জন।
এদিকে পাশের দেশ ভারতে করোনার প্রকোপ ভেড়ে যাওযায় সিলেটের সীমান্ত বন্দর সমূহে বাড়ানো হয়েছে স্বাস্থ্য সতর্কতা। ভারত থেকে কেউ এলে তাকে কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রতিটি স্থলবন্দর এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে থার্মোস্ক্যানার বসানো হয়েছে। করা হচ্ছে স্বাস্থ্য পরীক্ষাও। তবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর থেকে সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাতায়াতকারী যাত্রী সংখ্যা কমে গেছে। কেবলমাত্র চিকিৎসার জন্য জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা যাতায়াত করছেন। সিলেটের সঙ্গে ভারতের সেভেন সিস্টারের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। এরমধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেক পুরনো। তবে ছয়টি স্থলবন্দর দিয়ে সিলেটের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে। ভারতে করোনার নতুন স্ট্রেইনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সীমান্ত লাগোয়া দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এই আতঙ্কের বাইরে নয়।
স্থলবন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রথম দফা লকডাউনের সময় ভারত ও বাংলাদেশ থেকে চলাচলকারী পর্যটকদের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় এসে নেমেছিলো। সেটি এখনো বিদ্যমান। তবে চিকিৎসার প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে যাত্রীরা চলাচল করতে স্থলবন্দর ব্যবহার করছেন। এ ছাড়া সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহাল রয়েছে। ভারত থেকে চুনাপাথর, কয়লা সহ নানা পণ্য বাংলাদেশে আসছে। এতে করে সীমান্ত এলাকায় ভারত থেকে ট্রাকযোগে চালক ও শ্রমিকরা প্রবেশ করছেন। তবে মালপত্র নামিয়ে দিয়ে তারা চলে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে দু’দেশের ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
গোয়াইনঘাটের উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. রেহানউদ্দিন জানিয়েছেন, তামাবিল চেকপোস্টে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পূর্বের নিয়মে তারা এখন ৫ দিনের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করছেন। ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনের বিষয়টি এখনো তাদের কাছে নির্দেশনা আকারে আসেনি। এলে তারা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এখন যারা আসছেন তাদেরকে পূর্বের নিয়মে গোয়াইনঘাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোয়ারেন্টিনের জন্য পাঠানো হচ্ছে।
এদিকে গতকাল রোববার থেকে দোকানপাঠ ও শপিংমল খুলে যাওয়ায় করোনাভাইরাস যুদ্ধে ঘরে থাকার নির্দেশনা মানছেন না অনেকেই। যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্বও। নিয়ম ভেঙে সিলেটে অধিকাংশ সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি ও অটোরিকশ (সিএনজি), মোটরসাইকেল, রিকশার হিড়িক পড়েছে। এ যেন লকডাউনে নিয়ম ভাঙার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন ।
সিলেটে দোকানপাট ও শপিংমল খোলার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই সড়কে যানবাহনের পাশাপাশি বেড়েছে মানুষের উপস্থিতিও। কঠোর বিধিনিষেধের তিনদিন বাকি থাকলেও যেন স্বাভাবিক হতে চলেছে সবকিছুই। নগরীর তালতলা, বন্দরবাজার,জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা,আম্বরখানা,সোবহানীঘাট, উপশহর, হুমায়ুন চত্বর এলাকায় ফুটপাত ও অলি-গলিতে মানুষের উপস্থিতিও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। উপশহরে এক পাশে বাশ দিয়ে ব্যারিকেড দেওযার ফলে অন্যপাশ দিয়ে গাড়ি যাওয়া আসা করছে। এতে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা ও প্রাইভেটকারের অবাধ চলাচল করছে।
আইনশৃঙ্খলাবহিনীর সদস্যরা বলছেন, সব দোকানপাট, শপিংমল এবং মার্কেট খোলার কারণে সিলেট নগরীতে যানবাহন ও মানুষের চাপ বেড়েছে। গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি না দেয়ায় সিএনজি, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকারে মার্কেট, কর্মস্থল ও প্রয়োজনীয় কাজে যাচ্ছেন মানুষ।তাই মুভমেন্ট পাস আছে কি না কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ৮ জন রোগী। তাদের সকলেই সিলেট জেলার বাসিন্দা। এনিয়ে বিভাগে মৃত্যুবরণ করা মোট রোগীর সংখ্যা ৩৩২ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলার ২৬১ জন, সুনামগঞ্জে ২৬ জন, হবিগঞ্জে ১৮ জন এবং মৌলভীবাজারের ২৭ জনের প্রান নিয়ে গেছে ভাইরাসটি।
এছাড়া, সিলেটের চার জেলা মিলে ২৭৮ জন করোনা আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের ২৫৫ জনই সিলেট জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে, সুনামগঞ্জে ৪ জন, হবিগঞ্জে ১৩ জন ও ৬ জন মৌলভীবাজারে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত চব্বিশ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে ২৮ জনকে নতুন করে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। যাদের সকলেই সিলেট জেলার বাসিন্দা।