৫ নভেম্বর ২০১৭


কোম্পানীগঞ্জের আতঙ্ক পাথর সন্ত্রাস

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক : সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জের পাথরপল্লি ইসলামপুরের শাহ অরেফিন টিলাসহ পুরো ভোলাগঞ্জ দখলে নিয়েছে একটি পরিবার ও তাদের সহযোগীরা। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের ছত্রছায়ায় পাথর সন্ত্রাসীরা খুবলে খাচ্ছে পুরো এলাকা। স্থানীয় প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের উপরমহলের যোগসাজশে ধ্বংস করে চলেছে ভোলাগঞ্জের পরিবেশ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার প্রত্যক্ষ মদদে হত্যা, গুমসহ বড় ধরনের অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে চিহ্নিত অপরাধীরা। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে শতকোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন অনেকে। কাঁচাটাকা আর ক্ষমতার দাম্ভিকতায় কাউকেই পরোয়া করছে না এসব অপরাধীচক্র। এমনকি স্থানীয় প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে। নামমাত্র মামলামোকদ্দমা হলেও প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ছাতক ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শাহ আরেফিন টিলা কেটে দীর্ঘদিন ধরে চলছে পাথর লুট। আগ্রাসনের মাত্রা এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, এক সময়ে শাহ আরেফিন টিলার অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবৈধভাবে টিলা কেটে পাথর উত্তোলন ও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে মাঝে মধ্যে প্রশাসনের অভিযান চললেও পাথরখেকো চক্রটি থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বোমা মেশিন নামক যন্ত্রদানব ধ্বংস করে চলেছে পুরো এলাকা। মাঝে মধ্যে বোমা মেশিন ধ্বংসের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হলেও এসব যন্ত্র কখনো জব্দ করা হয় না। এমনকি এসব বোমা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

স্থানীয়রা জানান, অভিযান আসার আগেই খবর পেয়ে যায় পাথরসন্ত্রাসীরা। এসবের মূলহোতা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল বাছিরের ছেলে বিল্লাল আহমদ এবং তার পরিবারের সদস্য ও সাঙ্গপাঙ্গরা। মূলত চেয়ারম্যান আব্দুল বাছিরের ছেলে, মেয়ে, মেয়ের জামাই, নাতি এবং নাতনিজামাইসহ দলীয় লোকজন, লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্যরা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর, সাদা পাথর, বাংকার, কালাইরাগ, হাজিরদানিয়া, ভোলাগঞ্জ গুচ্ছগ্রাম, কালাইরাগ গুচ্ছগ্রাম, উৎমা ছড়া, বিজয় পাড়–য়া, মতিয়া টিলা, শাহ আরেফিন টিলাসহ পুরো কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধ পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে।

আর এসকল অবৈধ টাকা ব্যবহার হচ্ছে মদ গাঁজা, ইয়াবা বড়িসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে। সেই কালোটাকার কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে প্রশাসন। বার বার অভিযান চালিয়েও মিলছে না তেমন কোনো ফল। শ্রমিক মৃত্যুর হার দিন দিন বেড়েই চলছে। হাতেগোনা কয়েকটি ঘটনা প্রকাশ্যে আসলেও বেশিরভাগই থেকে যায় অজানা।

স্থানীয় শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে তাদের আনা হয়েছে। মাত্র ৪শ টাকার বিনিময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাথর আহরণ করতে হয়। আর প্রাণহানি হলে লাশ গুম করে নিহতের পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কিছু নগদ অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়া হয় পুরো ঘটনা। গত বৃহস্পতিবার বিল্লালের গর্তে মাটি ধসের ঘটনায় আহত হন ২ শ্রমিক। প্রশাসনের হিসাবে গত ২৩ জানুয়ারি শাহ আরেফিন টিলায় মারা যান ৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মার্চে ২ জন, ২০ জুলাই ১ জন এবং সর্বশেষ ১৬ অক্টোবরে একজন শ্রমিক।

জানুয়ারিতে একসঙ্গে ৫ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। পুলিশ প্রশাসন এবং জেলা প্রশাসন দুটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে দায়িত্বে অবহেলার কারণে প্রত্যাহার করা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাছুম বিল্লাহ ও কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি বায়েছ আলমকে। তদন্ত প্রতিবেদনে এসব মৃত্যুকে হত্যাকান্ড হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ওই ঘটনায় ৪ জনকে আসামি করে মামলা করা হলেও প্রকৃত অপরাধীরা থেকে যায় আড়ালে। পুরো কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাকে অস্থিতিশীল করার পেছনে প্রত্যক্ষ প্রভাবশালী ব্যাক্তিরা সব সময় থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের রোখার যেন কেউ নেই!

অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারী হিসেবে স্থানীয় ৪৭ জন প্রভাবশালীকে চিহ্নিতও করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী ৪৭ পাথরসন্ত্রাসীরা হচ্ছেন, কোম্পানীগঞ্জের চিকাডহর গ্রামের আইয়ুব আলী, আঞ্জু মিয়া, সেরাব আলী, কুদ্দুস মিয়া, ফয়জুর রহমান, গরিব উল্লাহ, আতিউর রহমান, মুহিবুর রহমান, আবদুল করিম, নূর উদ্দীন, হেলাল উদ্দীন, শাহ আরেফিন টিলা জালিয়ারপার গ্রামের শুক্কুর আলী, বশর মিয়া, ফারুক মিয়া, মাসুক মিয়া, সোনা মিয়া, সাদ্দাম মিয়া, আশিক মিয়া, মো. মানিক মিয়া, সাজ্জাদ মিয়া, নূর মিয়া, বকুল মিয়া, রমজান মিয়া, হরমত উল্লাহ, নাসির মিয়া, আবদুল খালিক, আবদুল কাদির ও ইসমাইল আলী, পাডুয়া নোয়াগাঁও গ্রামের আতাউর রহমান, নারাইনপুর গ্রামের আবদুল হান্নান, আবদুর রহমান, আনাই মিয়া, আনফর আলী, পুরান জালিয়ারপাড় গ্রামের সমশের আলী কালা, আশিকুর রহমান, সমাদ মিয়া, লায়েক মিয়া, আবদুল কালিক, নূর ইসলাম, পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামের রহিম, ভোলাগঞ্জ গ্রামের সোহেল মিয়া, শাহাব উদ্দীন, নতুন জালিয়ারপার গ্রামের সাইফুল ইসলাম, বাহাদুরপুর গ্রামের লীলু মিয়া এবং পাড়ুয়া লামাপাড়া গ্রামের একবার মিয়া, এনাম হোসেন ও ইসনাত আলী। এছাড়াও বিল্লাল বাহিনী শাহ আরেফিন টিলায় বিভিন্ন নামে বেনামে চাঁদাবাজি করছে।

জানা গেছে , প্রতিটি গর্ত থেকে প্রতিদিন ২-৩ হাজার টাকা আদায় করা হয়। সেখানে ২০০-৩০০ ছোটবড় গর্ত রয়েছে । বোমা মেশিন থেকে আদায় করা হয় ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা । এসব টাকা আদায় করেন বিল্লালের একান্ত সহযোগীরা। এছাড়াও বিল্লাল বাহিনী রাস্তার মালিককানা দাবি করে এবং মসজিদের নামে বাবুলনগর, জালিয়ারপার, চিকাডহরে প্রতিটি ট্রাক্টর থেকে ১০০ টাকা করে আদায় করে থাকে এবং নোয়াগাঁও গ্রামে তার বোনের ছেলে জুয়েল ও তার সহযোগীরা ট্রাক্টর থেকে ২০০ টাকা করে আদায় করে বলে অভিযোগ আছে। টাকা দিতে না চাইলে ট্রাক্টর চালকদের করা হয় নির্যাতন। বিল্লাল বাহিনীর ভয়ে সেখানে স্থানীয়রা কিছু বলার সাহস পান না। এছাড়াও বিল্লালের বিরুদ্ধে মানুষের জামি দখলের অভিযোগ রয়েছে। শাহ আরেফিন টিলার বশর জানান, তার প্রায় ১৩ একর জমি আছে তার মধ্যে বিল্লাল হামলা মামলার ভয়ে দেখিয়ে ৫ একর জমি দখল করেছেন।

বিল্লাল আহমদ তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, ‘শাহ আরেফিন টিলা কেটে পাথর তোলার আমি কে? কোনো পাবলিকের দ্বারা পাথর তোলা সম্ভব নয়। শাহ আরেফিন টিলা কেটে কে পাথর তুলে তা প্রশাসনকে জিজ্ঞেস করেন। প্রশাসন তা ভালো জানে। তিনি বলেন, প্রশাসনই পাথর তুলে, আবার বন্ধ করে। আমার নেতৃত্বে পাথর তোলা সম্ভব নয়। আমি পুলিশও নই, প্রশাসনও না।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কিম বলেন, অভিযানের সময় শাহ আরেফিন টিলায় গর্ত ও বোমা মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা না করে শুধু মেশিন ধ্বংস করে পাথর উত্তলন থামানো যাবে না। এ ছাড়াও বোমা মেশিনের সরঞ্জাম তৈরী বন্ধ করতে হবে। সরঞ্জাম বন্ধ না করে অভিযান চালানো আইনের সাথে রসিকতা, পরিবেশ রক্ষায় শাহ আরেফিন টিলায় পাথর আহোরণ বন্ধ করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

এ ব্যাপারে পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহেদা আক্তার জানান, অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। ব্যবস্থা না নেয়ায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তারা। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রতিনিয়ত শাহ আরেফিন টিলা এলাকায় অবৈধভাবে পাথর তুলছে তারা। এদিকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য প্রশাসনকে উল্টো হুমকি দেয়া হচ্ছে।

গত রবিবার স্থানীয় পাড়–য়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এক প্রতিবাদ সমাবেশে বিল্লালের ভাই শামীম আহমেদ এ হুমকি দেন। তার বক্তব্যের ভিডিও এখন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, সোমবারের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা না তুললে কোম্পানীগঞ্জ অচল করে দেয়া হবে। এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, এসব হুমকিতে কিছু যায় আসে না। এখানে অবৈধ কোনো কর্মকান্ড চলতে দেয়া হবে না। শাহ আরফিন টিলায় অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে আরেফিন টিলা থেকে পাথর বহনের জন্য ব্যবহৃত ৩টি রাস্তায় স্থায়ী প্রতিবন্ধক নির্মাণ করা হবে । জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সেখানে মাইকিং করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

কোম্পানীগঞ্জ থানায় নবাগত ওসি শফিকুর রহমান খান জানান, শাহ আরেফিন টিলায় শ্রমিক মৃত্যুতে ৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। একটির তদন্ত শেষ হয়েছে। এসব ঘটনায় কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তাছাড়া সেখানে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে কোনোভাবেই আর শাহ আরেফিন টিলা চলতে দেয়া হবে না।

 

(আজকের সিলেট/৫ নভেম্বর/ডি/এমকে/ঘ.)

শেয়ার করুন