২৫ আগস্ট ২০২২


কঠোর আন্দোলনে যাচ্ছে চা-শ্রমিকরা

শেয়ার করুন

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারে বেশ কয়েকটি চা বাগানে কাজ হলেও তিনশ টাকা মজুরির দাবিতে অধিকাংশ বাগানেই চলছে কর্মবিরতি। জেলার বড়লেখা, জুড়ি ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার ঢাকা-বিয়ানীবাজার সড়ক অবরোধ করে চা-শ্রমিকরা। এতে ভোগান্তিতে পড়েন হাজার হাজার যাত্রী।

এখন পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল জেরিন চা বাগানে কাজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে শ্রমিকরা আজ বিভিন্ন চা বাগানের নাটমন্দিরে সভাকরে তারা তাদের নায্য মজুরির দাবি তুলে ধরছেন। গত মঙ্গলবার জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন বাগান পরিদর্শন করার পর মৌলভীবাজারের ১২ টি বাগানে কাজে ফিরেন শ্রমিকরা। কিন্তু আজ বুধবার আবারো এসব বাগানসহ জেলার প্রায় সব বাগানেই কাজে যোগ দেননি চা শ্রমিকরা।

৩০০ টাকা মজুরির দাবীতে মৌলভীবাজারের বড়লেখা, জুড়ি ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঢাকা বিয়ানীবাজার ও ঢাকা মৌলভীবাজার সড়ক অবরোধ করে রাখে আন্দোলনরত শ্রমিকরা। এতে বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে শত শত যানবাহন। ভূগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।

বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বড়লেখা উপজেলার বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিকরা উপজেলার দক্ষিনভাগ এলাকায় ঢাকা-বিয়ানীবাজার সড়ক অবরোধ করে রাখে। এ সময় আটকা পড়ে শত শত যানবাহন।

বিয়ানীবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা যাত্রী ইকরাম মাহমুদ চৌধুরী জানান, সকাল সাড়ে ১১টায় গাড়িতে উঠেছেন বড়লেখার দক্ষিণভাগে প্রায় সোয়াঘন্টা আটকা ছিলেন।

বেলা ২টার দিকে মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলা চৌমুহনীতে জুড়ির বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিকরা জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত তারা ৩০০ টাকা মজুরির দাবীতে মিছিল শ্লোগান দেয়। শ্যামলী পরিবহরেন চালক তাজুল ইসলাম জানান জুড়িতে বড়লেখায় ১ঘন্টা জুড়িতে দেড়ঘন্টা আটকা পড়েন। সাড় ১১টার গাড়ী শ্রীমঙ্গলে আসতে ২ঘন্টার স্থলে ৫ ঘন্টা লেগেছে।

এদিকে বিকেল তিনটাকে শ্রীমঙ্গল সাতগাও চাবাগান ফেক্টরীর সামনে ঢাকা সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে চা শ্রমিকরা।

এ বিক্ষোভে শ্রীমঙ্গলের সাইফ, মাকড়ীছড়া, মীর্জাপুর, সাতাগাও, বৌলাছড়া ও ইছামতি সহ কয়েকটি বাগানের শ্রমিকরা অংশ নেন।

সরজমিনে দেখা যায় শ্রমিকরা রাস্তার এপার ওপার বাঁশ বেঁধে বাশে বিভিন্ন বাগানের নামে ভেনার ফেস্টুন বেঁধে রাখে। আন্দোলনরত যুবকরা নারী চা শ্রমিকদের নিয়ে রাস্তায় বসে পড়ে চা-পাতা ভর্তা তৈরী করে খাচ্ছেন।

শ্রীমসঙ্গল সাঁতগাও চা বাগানের বাগান পঞ্চায়েত কাজল কালিন্দি জানান, ১৬দিন হচ্ছে আন্দোলন করছেন। তাদের যৌক্তিক দাবী মালিকরা মানছেন না। তাই বাদ্য হয়ে তারা আন্দোলন কঠোর করছেন। আন্দোলনে অংশনেয়া রাধাকান্ত কৈরী জানান, পেটের জ্বালায় তারা আন্দোলন করছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের এ আন্দোলন চলবে।

এদিকে বিকলে ৫টার দিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলি রাজিব মাহমুদ মিঠুন ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে ৩ঘন্টা পর বিকেলে ৫টার দিকে অবরোধ ছাড়ান।

শ্রীমঙ্গল আমরইল ছড়া চা বাগানের শ্রমিক সন্তান ও মৌলভীবাজার ছাত্রমৈত্রির নেতা অজিত বুনার্জী জানান, আমাদের দাদা, দাদী, মা বাবারা বছরের পর বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। একজন সুস্থমানুষ যদি তাদের কষ্ট কাছ থেকে দেখতেন তাহলে তারা বুক ধরাতে পারবেনা। কিন্তু এটা আর কতদিন। এই যাত্রায় আন্দোলন তুঙ্গে। এই আন্দোলনেই অধিকার আদায় করতে হবে। না হলে চা শ্রমিকদের বঞ্চনার ইতিহাস জনম জনমই থাকবে।

তিনি বলেন, জনমভর আমাদের ধোঁকা দেয়া হচ্ছে এখনও তাই। এই আন্দোলন বন্ধকরার জন্যও নিরহ চা শ্রমিকদের নানাভাবে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

চা শ্রমিক সন্তান তাপস ঘোষ জানান, মালিক পক্ষ বলেছে প্যাকেজে ৪০০ টাকার মতো মজুরি। তাহলে বোনাস কতো আসে। বাসস্থানের অধিকার শ্রমিকদের নায্য অধিকার। এটা আবার বেতনের অংশ হয়।

তিনি জানান, দুশ বছর এক জায়গায় বসবাস করেও কি এই জমির মালিক বসবাসকারীরা হতে পারেন না।

এ সময় আমরইল ছড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সাধারণ সম্পাদক রঙ্গন শীল, চা শ্রমিক নেতা সজল বুনার্জী ও সন্তোষ কর্মকার জানান, চা শ্রমিকদের দুর্বলতা রয়েছে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার প্রতি। তাই তারা প্রধানমন্ত্রীর দোহাই দিয়ে আমাদের ঠকাতে চায়। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা সবই বুঝি। ধানাই পানাই চলবে না। মজুরি বাড়াতে হবে না হয় আন্দোলন চলবে।

এসময় চা শ্রমিক টুম্পা তাঁতী, সজল দাশ ও জনি পটনায়েক জানান, হয় মজুরি ৩০০ টাকা ঘোষনা আসতে হবে না হয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি বক্তব্য শোনতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি বক্তব্য শোনলে আমরা মজুরির দিকে তাকাবো না কাজে যোগ দিবো। কারন প্রধানমন্ত্রী এতে হেস্তক্ষেপ করলে আমাদের ভাগ্য সু প্রসন্ন হবে এটা আামরা বিশ্বাস করি।

চা শ্রমিক সন্তান ও ছাত্রমৈত্রির নেতা অজিত বুনার্জী আরো জানান, প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যি সত্যি আমাদের সাথে বসতে বলেন তাহলে একটু তাড়াতাড়ি বসলে শ্রমিকদেরও মঙ্গল বাগানও রক্ষা পাবে লোকসানের হাত থকে।

এদিকে চা বাগান বন্ধ থাকায় সেকশনে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি থেকে কোথাও ৫টি কোথাও ৭টি পাতা হয়েগেছে। যা এখন কাটতে হবে কাছি দিয়ে। আর কাছি দিয়ে পাতা কাটলে নতুন সুট আসতে সময় লাগবে একমাস।

শ্রীমঙ্গল সাতগাও চা বাগানের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত তাদের বাগানের প্রায় ৫ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। ফেক্টরিতে পঁচেছে উত্তোলিত চা, সেকশনে নষ্ট হচ্ছে কুঁড়ি।

তিনি বলেন, শুধু চলমান ক্ষতি নয়, এতে চা শিল্প দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতিতে পড়বে। এই সময়ে প্রতিদিন নতুন চারার জন্য ডাল কাটা হয় প্রায় ১০ হাজার পিস। যা মাটির বেডে রোপন করা হয়। এবং আগে রোপন করা চারা ট্রান্সফার করার কথা পলিবেগে। যা হয়নি। এটিই এর মুখ্যম সময়। কারন এই সময়ে যে ওয়েদার তা এর জন্য মুখ্যম সময়। এতে আগামী মৌসুম গুলোতে দেখা দিবে চারার সংকট। তিনি বলেন নানামূখী চাপে পড়বে চা শিল্প।

শ্রীমঙ্গলস্থ বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাহিদুল ইমলাম বলেন, এটি শুধু আন্দোলন নয় এটি শিল্প ধ্বংসের একটি পায়তারা। চা শ্রমিক নেতারা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ শোনেছেন। কিন্তু একটি পক্ষ সহজ সরল চা শ্রমিকদের ইমোশনকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে রাজনীতি ঢোকেছে। আছে ভেটের রাজনীতিও।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের সত্যতার বিষয়ে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২৫ আগষ্ট সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আন্তমন্ত্রনালয়ের বৈঠক হওয়ার কথা ছিলো। এটি বাতিল করা হয়েছে যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিষয়টি দেখছে। তিনি বলেন, তাদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যলয় থেকে নির্দেশনা আসে প্রধানমন্ত্রী সামনে বিদেশ যাবেন দেশে আসার পর চা শ্রমিকদের নিয়ে গণভবনের বসে তাদের কথা শুনে ব্যবস্থা নিবেন।

চা শ্রমিক নেতা বিজয় হাজরা জানান, প্রধানমন্ত্রী আমাদের বিষয়টি দেখবেন বলেছেন এটা আমাদের জন্য বড় বিষয়। আমরা চা শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে শ্রমিকদের কাজে যেতে বলেছি। অনেকে কথা শুনছেন অনেকে শুনছেন না। আমরা চেষ্টা করছি শ্রমিকদের বুঝিয়ে কাজে পাঠাতে।

শেয়ার করুন