১৫ মার্চ ২০২১
কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : সিলেট বিভাগে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ এখনো হয়নি। নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও কাজ চলছে ঢিমেতালে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের ৩৯ প্রকল্পের মাটির কাজই শেষ হয়নি। বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় হাওরপারের লোকজন বিক্ষুব্ধ।
জানা গেছে, এবার সিলেট বিভাগে ৬৭৫ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৪ কোটি ৮ লাখ টাকা। পাউবো’র কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৯১ শতাংশ কাজ হয়েছে। তবে এই দাবী বাস্তবতার সাথে কোন মিল নেই বলে জানিয়েছেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়।
তিনি জানান, এ পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলায় সর্বোচ্চ ৫৫ শতাংশ কাজ হয়েছে। দফায় দফায় সময় বৃদ্ধির পরও কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় তারা আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।
তবে, পাউবোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী এস.এম. শহিদুল ইসলাম বলেছেন, ৪ জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জ ছাড়া অন্যান্য এলাকার কাজ বেশ অগ্রসর। সুনামগঞ্জের কাজ দ্রুত শেষ করারও তাগিদ তার।
জানা গেছে, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে সিলেট বিভাগের সকল হাওর রক্ষা বাঁধ ও ক্লোজার নির্মাণে ৬৭৪ দশমিক ৯০৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করছে পাউবো। এ জন্যে ৯১১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১৩৪ কোটি ৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা। কাজের বিপরীতে গতকাল রোববার পর্যন্ত ৭২ কোটি ৯৮ লাখ ৮৭ হাজার টাকা অবমুক্ত করেছে পাউবো।
পাউবোর উত্তর-পূর্বাঞ্চল’র প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলায় বাঁধ ও পিআইসির সংখ্যা সর্বোচ্চ। সুনামগঞ্জ জেলায় ৮০৯টি পিআইসির মাধ্যমে ৬২০ দশমিক ২১৩ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যয় নির্ধারণ হয়েছে ১২৫ কোটি ৭৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। কাজের বিপরীতে গতকাল পর্যন্ত ৭৯ কোটি ২৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা অবমুক্ত করা হয়েছে। সিলেট জেলায় ৪৩টি পিআইসির মাধ্যমে ২৩ দশমিক ৭১৭ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা অবমুক্ত হয়েছে। মৌলভীবাজার জেলায় ১২টি পিআইসির মাধ্যমে নির্মাণ করা হবে ৬ দশমিক ৯৬০ কিলোমিটার বাঁধ। এতে ব্যয় ধরা হয় ৫০ লাখ ৭১ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা অবমুক্ত হয়েছে। হবিগঞ্জ জেলায় ৪৭টি পিআইসির মাধ্যমে ২৪ দশমিক ১৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করবে পাউবো। এতে ব্যয় ধরা হয় ৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ১ কোটি ৬৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা অবমুক্ত হয়েছে।
পাউবোর সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৩৩টি পিআইসির মধ্যে ৩১টির মাটির কাজ শেষ হয়েছে। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ৪১টির মধ্যে ২২টির, জামালগঞ্জ উপজেলার ৪৪টির মধ্যে ৪৩টি, তাহিরপুর উপজেলার ৮৩টির মধ্যে ৭৩টি, ধর্মপাশা উপজেলার ১৭০টির মধ্যে ১৬৩টি, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ৪৫টির মধ্যে ২৬টি, জগন্নাথপুর উপজেলার ৩৬টির মধ্যে ২৯টি, দিরাই উপজেলার ১২০টির মধ্যে ১০৫টি, শাল্লা উপজেলার ১৫৬টির মধ্যে ১৪৮টি, ছাতক উপজেলার ১৮টির মধ্যে ১৫টি ও দোয়ারাবাজার উপজেলার ৪৬টি পিআইসির মধ্যে ৩১টির মাটির কাজ শেষ হয়েছে।
এখনো ৩৯টি পিআইসির মাটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। মাটির কাজ শেষ হওয়া, প্রকল্প সমূহে দূর্বাঘাস লাগানো, সুলুফ কাটিংসহ নানান কাজ চলছে বলে পাউবো সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, নীতিমালা অনুযায়ী পিআইসির কাজ শেষের তারিখ ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। ২২ ফেব্রুয়ারি পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ.কে.এম এনামুল হক শামীম সুনামগঞ্জ বাঁধ পরিদর্শন শেষে ৭ মার্চ পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করেন। কিন্তু, কাজ শেষ না হওয়ায় ১৫ মার্চ পর্যন্ত তৃতীয় দফা সময় বৃদ্ধি করা হয়।
কিন্তু, রোববার পর্যন্ত কোনো উপজেলায়ই পুরোপুরি কাজ শেষ না হওয়ায় হাওরপারের লোকজনের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। বিক্ষুব্ধ লোকজন সোমবার সুনামগঞ্জ জেলা শহরের ট্রাফিক পয়েন্টে মানববন্ধনের ডাক দিয়েছেন।
সিলেট জেলার মধ্যে সিলেট সদর উপজেলায় ২টি, বিয়ানীবাজার উপজেলায় ৪টি, ওসমানীনগর উপজেলায় ৩টি, গোয়াইনঘাট উপজেলায় ৭টি, জৈন্তাপর উপজেলায় ৬টি, কানাইঘাট উপজেলায় ৮টি, জকিগঞ্জ উপজেলায় ১টি ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ১২টি পিআইসি হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজ করছে। গতকাল রোববার পর্যন্ত সিলেট জেলায় পুরোপুরি বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। পাউবো সিলেট জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ শহীদুজ্জামান সরকার গতরাতে জানান, এ পর্যন্ত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কাজ হয়েছে। পুরোপুরি শেষ করতে কয়েকদিন লাগবে।
হবিগঞ্জ জেলার মধ্যে হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় ৪টি, বাহুবল উপজেলায় ৩টি, নবীগঞ্জ উপজেলায় ৬টি, লাখাই উপজেলায় ৮টি, আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ৯টি, মাধবপুর উপজেলায় ৭টি ও বানিয়াচং উপজেলায় ১০টি পিআইসির মাধ্যমে বাঁধের কাজ চলছে।
পাউবোর হবিগঞ্জ জেলা প্রকৌশলী মোঃ শাহানেয়াজ তালুকদার জানান, রোববার পর্যন্ত ৮৫ শতাংশ কাজ হয়েছে। বর্তমানে দূর্বাঘাস লাগানো, ড্রেসিংসহ অন্যান্য কাজ চলছে। কয়েক দিনের মধ্যেই শতভাগ কাজ সম্পন্ন হবে বলে জানান তিনি।
মৌলভীবাজার জেলার মধ্যে মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় ৩টি, কুলাউড়া উপজেলায় ৩টি, বড়লেখা উপজেলায় ১টি, কমলগঞ্জ উপজেলায় ১টি, রাজনগর উপজেলায় ৩টি ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ১টি পিআইসির মাধ্যমে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ করছে পাউবো। মৌলভীবাজারে এখনো সামান্য কাজ বাকী রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। পাউবো মৌলভীবাজার জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান জানান, জেলায় ১২টি পিআইসির শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, সিলেট বিভাগের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায়ই প্রায় সকল হাওর। এ জন্যে সুনামগঞ্জকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। কিন্তু এখনো এই জেলায় ৫৫ শতাংশ কাজও হয়নি। এজন্যে কৃষকরা উদ্বিগ্ন। তিনি সিলেট বিভাগের সকল বাঁধের কাজ দ্রুত সম্পন্নের দাবি জানান। পাশাপাশি বাঁধের নামে লুটপাটকারীদেরকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানান তিনি।
পাউবোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী এস.এম. শহিদুল ইসলাম বলেন, সুনামগঞ্জে মাটির কাজ এখনো বেশ কিছু বাঁধে শেষ হয়নি। যা উদ্বেগের। অন্যান্য জেলায় বাঁধের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সুনামগঞ্জের কাজ দ্রুত সম্পন্নের জন্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কেউ বাঁধে অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।