৩ নভেম্বর ২০১৭


দুই চৌধুরীকে নিয়ে ‘ভাই রোগে আক্রান্তদের’ কাদা ছোড়াছুড়ি

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক : সিলেট-২ আসনে আওয়ামী লীগের দুই হেভিওয়েট নেতার মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে এখন রীতিমতো ঝড় বইতে শুরু করেছে। মনোনয়নপ্রত্যাশী দুই নেতার পক্ষাবলম্বন করে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অশালীন মন্তব্য করে যাচ্ছেন।

বিষয়টি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, আক্রমণাত্মক ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহরূপ ধারণ করতে পারে বলে দলের সিনিয়র নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এতে দল এবং দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। সিনিয়র নেতারাও বিষয়টি নিয়ে বিব্রতবোধ করছেন এবং তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ কর্মীরাও হতাশায় ভুগছেন।

দলীয় গ্রুপিং এবং ‘ভাই রাজনীতির’ কারণে জুনিয়র লেভেলের কর্মীরা স্যোশাল নেটওয়ার্কে একে-অপরকে জড়িয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করছে বলে সিনিয়র নেতারাও স্বীকারও করেছেন।

দশম সংসদ নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। সিলেট-২ আসনে মনোনয়ন চাইলেও শফিকুর রহমান চৌধুরী দলীয় মনোনয়ন পেতে সক্ষম হন। কিন্তু জাতীয় পার্টির সাথে আওয়ামী লীগের আসন সমঝোতার কারণে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নির্দেশে শফিকুর রহমান চৌধুরী মনোনয়ন প্রত্যাহার করায় আসনটি জাতীয় পার্টির অনুকূলে চলে যায়। এ আসনে এমপি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টি থেকে ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী এহিয়া। দশম সংসদ নির্বাচনের পর থেকে সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর সমর্থকদের নিয়ে বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথে তাদের নিজ নিজ বলয় গড়ে ওঠেছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উভয় বলয়ের মধ্যে চাঙাভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

গত ২৬ অক্টোবর আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী দেশে অবস্থান করার পর থেকে শফিকুর রহমান চৌধুরী ও আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর সমর্থকেরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য প্রদানের মাধ্যমে এক-অপরকে ঘায়েল করতে মরিয়া হয়ে ওঠেছেন। বালাগঞ্জ-ওসমানীনগরের আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামী লীগ একটি শক্তিশালী দল। দুই প্রার্থীর মনোনয়ন চাওয়াকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে অনুপ্রবেশকারীরাই অরাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-২ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীরা পুরোদমেই সরব রয়েছেন। এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রায় অর্ধ ডজন সিনিয়র নেতা মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে দলীয় মনোনয়ন কেড়ে আনতে এই আসনের সাবেক এমপি সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী হার্ডলাইনে রয়েছেন।

সিলেট-২ আসনের অন্তর্ভুক্ত বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথ উপজেলায় তাদের দলীয় অনুসারীরাও সরব রয়েছেন। শফিকুর রহমান চৌধুরী যুক্তরাজ্য প্রবাসী হলেও নবম সংসদ নির্বাচনে তিনি এমপি হওয়ার পর থেকে দেশে অবস্থান করছেন। আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীও কিছু দিন পর পর দেশে এসে তার অবস্থান জানান দিচ্ছেন। দশম সংসদ নির্বাচনে এই আসনটি জাতীয় পার্টির অনুকূলে চলে যায়। তাই একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এই আসনটি ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে। এতে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা সক্রিয় রয়েছেন। তাদেরকে কেন্দ্র করে মনোনয়নপ্রত্যাশী শফিক চৌধুরী ও আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছেন।

ওসমানীনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহবায়ক চঞ্চল পাল বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নেতিবাচক মন্তব্য করা রাজনৈতিক সৃষ্টাচার বহির্র্ভূত। সংগঠনদরদি, ত্যাগী ও সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তিকেই জননেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় মনোনয়ন দেবেন। সেখানে ব্যক্তি কোনো বিষয় নয়। সে ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আক্রমণাত্মক বক্তব্য পরিহার করা উচিত।

ওসমানীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দাল মিয়া বলেন, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এখন বিশ্ব বিস্তৃত। এখানে কোনো ব্যাক্তি বিশেষের হিতাকাক্সক্ষী হয়ে কাউকে খাটো করা বা গালমন্দ করা মোটেই কাম্য নয়। এগুলো যারা করছে, তারা মূলত দলের ভালো চায় না। আর এগুলো করে কারো দলীয় মনোনয়ন ঠেকানো যাবে না। এখানে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে যেই আসবেন দলীয় নেতাকর্মীরা তার পক্ষেই কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

ওসমানীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান চৌধুরী নাজলু বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশালীন মন্তব্য করে সম্মানী কোনো ব্যক্তির মানসম্মান ক্ষুন্ন করা ঠিক নয়। আওয়ামী লীগ ত্যাগীদের মূল্যায়ন করে। এখানে রোডশো করে মানুষ দেখিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া সম্ভব নয়।

বালাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনহার মিয়া বলেন, দলীয় মনোনয়ন চাওয়া সবারই রাজনৈতিক অধিকার। এক্ষেত্রে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নিয়ে দলের জুনিয়র লেভেল থেকে ইন্টারনেট দুনিয়ায় উস্কানিমূলক কথাবার্তা আসছে। এরা মূলত ‘ভাই রোগে’ আক্রান্ত। নিজ স্বার্থ হাসিলে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তাদেরকে আমরা হাইব্রিডের সারিতে দেখছি। তারা সংগঠনদরদি নয়, তারা মূলত অনুপ্রবেশকারী। এসবের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছি।

বালাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাকুর রহমান মফুর বলেন, আইটি মাধ্যমগুলোতে দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ির বিষয়টি আত্মঘাতী হিসাবে রূপ নিয়েছে। যা সুষ্ঠু রাজনীতির পরিপন্থি। দলীয় গ্রুপিং চরম আকার ধারণ করায় কতিপয় স্বার্থন্বেষী মহল এমন কাজে লিপ্ত রয়েছে। আমরা কোনো ব্যক্তির বিরোধী নই, নৌকা প্রতীকই আমাদের কাছে মুখ্য বিষয়। নৌকা প্রতীক নিয়ে যে আসবেন আমরা তাকেই মূল্যায়ন করব।

বিশ্বনাথ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পংকি খান বলেন, যারা দলের অন্তর্ভুক্ত বা সদস্য নয় তারাই দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে এরুপ মন্তব্য করছে। এদের চিহ্নিত করে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, কিছু বাজে ছেলেরা হয়ত এসব কাজ করছে। আমি এসবের পক্ষে নেই। আমার পক্ষে কারো বিরুদ্ধে কোনো খারাপ মন্তব্য করার প্রশ্নই ওঠে না। তারপরও এগুলো থেকে বিরত থাকার জন্য আমি আমার সমর্থকদের সাফ জানিয়ে দেব।

তিনি বলেন, জনসেবা করার ইচ্ছা এবং শখ আমার আছে। দলের কর্মী-সমর্থকের উৎসাহতেই আমি দলীয় মনোনয়ন পেতে কাজ করছি। তাই বলে আমি দলের ঊর্ধ্বে নই, দলীয় সিদ্ধান্তের ওপরই সব কিছু নির্ভর করবে।

সাবেক এমপি ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কে কার পক্ষে-বিপক্ষে কি করছে না করছে সেটা আমি জ্ঞাত নই। আমি দলীয় কর্মকান্ডে ব্যস্ত থাকার কারণে এসবে সময় দিতে পারি না। কেউ যদি এগুলো করে থাকে, তাহলে আমি এর পক্ষে নই। আওয়ামী লীগকে দুর্বল ও জায়ামাত-বিএনপিকে শক্তিশালী করতে কতিপয় একটি মহল এসব কাজ করছে। আমি দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত। দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে আমি মাঠে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছি।

 

(আজকের সিলেট/৩ নভেম্বর/এসটি/ঘ.)

শেয়ার করুন