৭ মার্চ ২০২১
দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা নেই একথা সত্য। তবে এক ধরণের নীরব হাহাকার বিরাজ করছে দেশজুড়ে। এর প্রধান কারণ এদেশের মানুষের প্রধান খাদ্যপন্য চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। দেশের ১০-১৫ শতাংশ সচ্ছল ও বিত্তবানদের অসুবিধা না হলেও বাকী ৮০-৯৫ শতাংশ সীমিত আয়ের মানুষকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে চালের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। এর সাথে আরো বেশ কিছু নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তাদের দুর্ভোগ বৃদ্ধি করেছে কয়েকগুণ।
দেখা যাচ্ছে, গত ২ সপ্তাহ যাবৎ অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে চালের দাম। গত বছরের মাঝামাঝি চালের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি শুরুর পর থেকে বাড়তে বাড়তে প্রতি কেজি চালের দাম এখন শ’য়ের কোঠা স্পর্শ করতে চাইছে। একটু ভালো জাতের চাল এখন ৬৮ টাকা থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত শুক্রবার সিলেট নগরীর বাজারগুলোতে দেখা যায়, চালের দাম প্রতি কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে। প্রতি কেজি পাইজাম ৫৫ টাকায়, বিক্রি হলেও কাটারি ভোগ ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটা চালের দাম প্রতি কেজি ৫০ টাকা। দেখা গেছে মাত্র বছরখানেক আগেও মালা জাতীয় সাধারণ মানের চাল প্রতি কেজি ৩০/৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ এই চালের দাম এখন ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। বলা যায়, প্রায় দ্বিগুণ। সাধারণ মানুষের সবিস্ময় প্রশ্ন, হঠাৎ কী এমন ঘটলো যে চালের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেলো।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশেষভাবে চাল উৎপাদনকারী প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, চীন, থাইল্যান্ড কিংবা ভিয়েতনামে চালের দাম তো তেমন বাড়েনি। বাংলাদেশ সাধারণত: এ সব দেশ থেকেই চাল আমদানি করে থাকে। কিন্তু এসব দেশে এতো বিপুলভাবে চালের দাম না বাড়লেও বাংলাদেশে কেনো তা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে এ প্রশ্নে অনেকটা দিশেহারা ও বিভ্রান্ত সাধারণ মানুষ। বলা বাহুল্য, গত ক’বছর যাবৎ বাংলাদেশে তেমন বড়ো কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় নি। বরং উপুর্যপুরি বাম্পার ফলন হয়েছে ধানের। দেশের কিছু কিছু এলাকায় ফসলহানির ঘটনা ঘটলেও বাকী এলাকাগুলোতে ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু তা সত্বেও এদেশে হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে চালের মূল্যবৃদ্ধি। সচেতন মহলের আশংকা মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের কারসাজির ফলেই এতো অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে চালের দাম। চাল ছাড়াও তেল ও অন্যান্য কিছু নিত্যপণ্যের ওপর তাদের লোভের নখর প্রসারিত হয়েছে। ফলে এসব সামগ্রীর দাম চলে যাচ্ছে সীমিত আয়ের সিংহভাগ মানুষের নাগালের বাইরে।
আগামী রমজান মাস ও ঈদে যে এই অবস্থার আরো অবনতি ঘটবে, এতে কোন সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে যে ভোজ্য তেলের দাম কয়েক মাস আগে ছিলো ১০০ টাকা, তা এখন ১৩০-১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। তবে সেই তুলনায় বাংলাদেশের বাজারে তেলের দাম অনেক বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ। এসব মনিটরিং বা নিয়ন্ত্রনের যেনো কেউ নেই। অনেকটা আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মর্জি মাফিক চলছে দেশের পণ্যের বাজার। অসৎ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে নিত্যপণ্যের বাজার। এ অবস্থায় ক্রেতা সাধারণ তাদের বেঁধে দেয়া দামে পণ্য সামগ্রী কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এদিকে বাজারে চাল ও তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে অন্যান্য অনেক পণ্য বিশেষভাবে খাদ্য সামগ্রীর ওপর। এতে রুটি বিস্কুটসহ অনেক সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে সাধারণ সীমিত আয়ের মানুষের জীবন হয়ে ওঠেছে দুর্বিষহ। তাদের আয় না বাড়লেও ব্যয় বৃদ্ধির মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এতে জীবনমান ক্রমশ নীচে নেমে যাচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতিসংঘের কাছ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। এটা দেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে কিছুটা হলেও। কিন্তু একই সাথে গত এক বছরে কোটি মানুষ নেমে গেছে দারিদ্র্যসীমার নীচে। আগে যারা খেতে পারতো, এখন নিত্যপণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির কারণে সঞ্চয় ভেঙ্গে খেতে বাধ্য হচ্ছে। সঞ্চয় বা জমানো এখন শিকেয় ওঠেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে ব্যর্থ হয়ে কিংবা চাকুরী হারিয়ে অনেকে ভালো ঘরদোর ছেড়ে বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। মহামারির সংকটের সাথে যুক্ত হয়েছে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিড়ম্বনা। এসব থেকে রেহাই পেতে চান এদেশের সাধারণ সীমিত আয়ের অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু কিভাবে পাবেন তারা মুক্তি? যারা এসব নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষা করার কথা তাদের অধিকাংশই এখন কারসাজিকারক, ভক্ষক। তাই সবই অরণ্যে রোদন। তা সত্বেও আমরা এক্ষেত্রে সরকারের হিতকামী মহলের শুভ পদক্ষেপ কামনা করি। আশা করি, দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে এই অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে তারা অবিলম্বে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।