১ মার্চ ২০২১


সিলেটে ৩৬৪৪ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই শহীদ মিনার

শেয়ার করুন

কাউসার চৌধুরী (অতিথি প্রতিবেদক) : সিলেট বিভাগের ৩ হাজার ৬৪৪ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই। উপজেলা পর্যায়ে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সকল বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হলেও সিলেটের গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার কোন বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই। শহীদ মিনার না থাকায় মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা শহীদদের প্রতি শিক্ষার্থীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারছে না।

প্রাথমিক শিক্ষা সিলেট বিভাগের উপ-পরিচালক মোঃ মোসলেম উদ্দিন জানিয়েছেন, যে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই, সে সকল বিদ্যালয়ের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। সে সকল বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিভাগের ৪ জেলার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫ হাজার ৫৮টি। এর মধ্যে সরকারী, ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১ হাজার ৪১৪টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মিত হলেও ৩ হাজার ৬৪৪টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই। সিলেট জেলার ১ হাজার ৪৭৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার রয়েছে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৯৪টি। বাকী ১ হাজার ৮৪টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই।

সূত্রে জানা গেছে, সিলেট সদর উপজেলার ১২৬ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৯টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার আছে। বাকী ১০৭টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই। বিশ্বনাথ উপজেলার ১৩৩টি বিদ্যালয়ের মাঝে ২১টিতে শহীদ মিনার নেই। শহীদ মিনার নেই এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১২টি। বালাগঞ্জ উপজেলার ৭২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকী ৬৭ টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই। ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ৪৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকী ৩৮টিতে শহীদ মিনার নেই।

গোলাপগঞ্জ উপজেলার ১৮০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২১টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। শহীদ মিনার নেই এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৫৯টি। বিয়ানীবাজার উপজেলার ১৫০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১০টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকী ১৪০টিতে শহীদ মিনার নেই। জকিগঞ্জ উপজেলার ১৩৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শুধুমাত্র ১টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার আছে। বাকী ১৩৫টি বিদ্যালয়েই শহীদ মিনার নেই।

কানাইঘাট উপজেলার ১৩০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯০টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। শহীদ মিনার নেই এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪০টি। জৈন্তাপুর উপজেলার ৭২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে একটিতেও নেই শহীদ মিনার। একই চিত্র গোয়াইনঘাট উপজেলায়ও। এই উপজেলার ১৩৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে কোনো বিদ্যালয়েই শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়নি।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৭৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকী ৬৫টিতে শহীদ মিনার নেই। দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ১১৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকী ১১৪টিতে শহীদ মিনার নেই। ওসমানীনগর উপজেলার ১১০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার রয়েছে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১টি। বাকী ৯৯টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, সুনামগঞ্জ জেলায় মোট বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ৪৭৬টি। এর মধ্যে মাত্র ১৮৪ বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার থাকলেও ১ হাজার ২৯২টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ১৩০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯টিতে শহীদ মিনার আছে। বাকী ১২১টিতে নেই।

দোয়ারাবাজার উপজেলার ১০৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮১টিতে শহীদ মিনার আছে। বাকী ২৩টিতে শহীদ মিনার নেই। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ৭৮টি বিদ্যালয়ের মাঝে শহীদ মিনার আছে ৩টিতে। বাকী ৭৫টিতে শহীদ মিনার নেই। ছাতক উপজেলার ১৮৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। শহীদ মিনার নেই এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৫০টি।

তাহিরপুর উপজেলার ১৩৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার রয়েছে মাত্র ১টিতে। বাকী ১৩৩টিতে শহীদ মিনার নেই। জামালগঞ্জ উপজেলার ১২৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮টিতে শহীদ মিনার থাকলেও ১১৮টিতে শহীদ মিনার নেই। ধর্মপাশা উপজেলার ১৯৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার রয়েছে ১২টি বিদ্যালয়ে। বাকী ১৮২টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই। শাল্লা উপজেলার ১০৭টির মধ্যে শহীদ মিনার আছে মাত্র ২টি বিদ্যালয়ে। বাকী ১০৫টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই।

দিরাই উপজেলার ১৬৩ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকী ১৫৭টি বিদ্যালয়ে নেই। জগন্নাথপুর উপজেলার ১৫৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২০টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকী ১৩৮টিতে নেই। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ৯৭ টির মধ্যে ৭টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার আছে। শহীদ মিনার নেই এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯০টি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হবিগঞ্জ জেলায় মোট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৫৩টি। এর মধ্যে ৫৮৮টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। শহীদ মিনার নেই এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৬৫টি।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ১৪৪ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শুধুমাত্র ১টি বিদ্যালয় ছাড়া সকল বিদ্যালয়েই শহীদ মিনার রয়েছে। নবীগঞ্জ উপজেলার ১৮২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫২টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকী ১৩০টিতে শহীদ মিনার নেই।

লাখাই উপজেলার ৭২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২১টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকী ৫১টিতে শহীদ মিনার নেই। বানিয়াচং উপজেলার ১৬৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার আছে ৩৫টিতে। বাকী ১৩২টিতে শহীদ মিনার নেই। আজমিরীগঞ্জ উপজেলার ৬৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২০টিতে শহীদ মিনার থাকলেও শহীদ মিনার নেই ৪৫টি বিদ্যালয়ে। মাধবপুর উপজেলার ১৪৯ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৪৪টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার রয়েছে। শহীদ মিনার নেই এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ৫টি।

চুনারুঘাট উপজেলার ১৭১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার রয়েছে ১৬০টি বিদ্যালয়ে। বাকী ১১টিতে শহীদ মিনার নেই। বাহুবল উপজেলার ১০৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। শহীদ মিনার নেই এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯০টি।
মৌলভীবাজার জেলায় মোট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৫১টি। এর মধ্যে ৪৪৮টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার রয়েছে। শহীদ মিনার নেই এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬০৩টি।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১৯৪ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৮টিতে শহীদ মিনার থাকলেও ১৩৬টিতে শহীদ মিনার নেই। রাজনগর উপজেলার ১৪০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার আছে ২১টিতে। বাকী ১১৯টিতে শহীদ মিনার নেই।

কুলাউড়া উপজেলার ১৯৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৮০টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকী ১৩টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই। বড়লেখা উপজেলার ১৫১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৫টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। শহীদ মিনার নেই ৯৬টি বিদ্যালয়ে।

কমলগঞ্জ উপজেলার ১৫২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৯টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকী ৬৩টিতে শহীদ মিনার নেই। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ১৩৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৮টিতে শহীদ মিনার থাকলেও বাকী ১২০টিতে শহীদ মিনার নেই। জুড়ী উপজেলার ৮৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ মিনার রয়েছে ২৭টি বিদ্যালয়ে। বাকী ৫৬টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই বলে সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিভাগের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক/শিক্ষিকার সংখ্যা ২৬ হাজার ৯৩৯ জন। করোনা শুরুর মুহুর্তে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৪৩ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৭ লাখ, ২৩ হাজার ৪৫৯ জন এবং ছাত্রী ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮৪ জন।

এদিকে, বিভিন্ন এলাকার শিক্ষক- অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শহীদ মিনার না থাকায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বাঁশ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। গত ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে খোদ সিলেট জেলায়ই এমন কয়েকটি দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

শিক্ষকরা জানান, যেসকল বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে তা হয়তো স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, এলাকার শিক্ষানুরাগী কোন ব্যক্তি কিংবা কোন সরকারী কর্মকর্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগেই নির্মাণ করা হয়। এখনো সরকারীভাবে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণের পৃথক কোন প্রকল্প নেয়ার খবর পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের দেয়া অর্থায়নে সিলেট সদর উপজেলার আউশা উত্তর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দৃষ্টি নন্দন শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাদিরা সুলতানা জানান, আমি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট অনুরোধ জানালে পরিষদ শহীদ মিনার নির্মাণে এগিয়ে আসে। শহীদ মিনারটি নির্মাণের ফলে গত ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে স্বাস্থ্য বিধি মেনে শিক্ষার্থীরা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে পেরেছে। সকল বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার স্থাপনের দাবি জানান এই শিক্ষিকা।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক ও গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয়েই নয়’ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকাটা দরকার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবশ্যই সর্বপ্রথম নির্মাণ করতে হবে। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাস শহীদদের ব্যাপারে জানতে পারে। বড় হবার পরেও এর প্রভাব থাকবে। তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার দাবী জানান।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের উপ-পরিচালক মো: মোসলেম উদ্দিন জানান, যে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নেই এই বিদ্যালয়গুলোর তালিকা তৈরি করে ইতোমধ্যে অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আশা করি এ বিষয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। শহীদ মিনার থাকলে শহীদদের প্রতি শিক্ষার্থীরা সম্মান জ্ঞাপনের সুযোগ পায়। সকল বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার স্থাপনে তাঁর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।

শেয়ার করুন