৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১


বালুখেকো মুশাহিদ বাহিনীর কাছে জিম্মি তাহিরপুর যাদুকাটার মানুষ

শেয়ার করুন

এমদাদুর রহমান চৌধুরী জিয়া,সুনামগঞ্জ তাহিরপুর(যাদুকাটা) থেকে ফিরে : তারা বালুখেকোদের কাছে জিম্মি। এর দু’দিন আগেই সেখানে স্থানীয় সাংবাদিক কামাল হোসেনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে বর্বরোচিত নির্যাতন করে বালুখেকোরা। অথচ ঘটনাস্থলের লোকজন বলছেন কারা এটা করেছে তা কেউ দেখেনি। প্রশ্ন হলো কার ইশারায়, কার ভয়ে তারা মুখ খুলছে না? তবে ঘটনাটি যে শ্রমিকরা ঘটায়নি তা বেরিয়ে এসেছে সরেজমিন অনুসন্ধানে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাংবাদিক কামাল বলেছেন কোনো শ্রমিক তার উপর হামলা করে নি। হামলা করেছে একদল ক্যাডার বাহিনী। সাংবাদিক কামালকে পরিকল্পিতভাবে অপরিচিত একটি মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে পূর্বের সংবাদ প্রকাশের জেরে প্রতিশোধ নিয়েছে বালুখেকোচক্র। তাকে নির্যাতনের আগে মাহমুদ আলী নামক এক বালুখেকো কয়েকবার কোন একজনকে ফোন করছিল। সেখান থেকে নির্দেশ আসার পর মুঠোফনে জ্বি ভাই জ্বি ভাই বলে শুরু হয় তার ওপর নির্যাতন।

কে সেই হুকুমদাতা? কোথায় তার নেটওয়ার্ক? স্থানীয় এমপি না সরকার দলীয় মন্ত্রীদের আশীর্বাদ পুষ্ট তারা । এ ব্যাপারে ঘটনাস্থলের কেউ মুখ না খুললেও পাশের বাদাঘাট বাজারে বার বার শোনা যায় অভিযোগের তীর কয়লা আমদানি কারক মোশাররফ তালুকদার নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির দিকে। যিনি তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। তিনি বর্তমান সময়ে অদৃশ্য থেকে এলাকা পরিচালনা করলেও প্রকাশ্যে বালু, কয়লা ও পাথরসহ সকল সরকারি সম্পদ লুটপাট অসামাজিক কার্যকলাপ মাদক ব্যবসার নের্তত্ব দিচ্ছে এখন তারই আপন ছোট ভাই মুশাহিদ তালুকদার। তার দাপটে ভয়ে তটস্থ যাদুকাটা থেকে শুরু করে তাহিরপুর পর্যন্ত এ জনপদের সাধারণ মানুষ।

এই সেই মুশাহিদ যার নেতৃত্বে মফস্বলের এক দেশপ্রেমিক সাংবাদিক কামালের ওপর নির্যাতন করা হয়। সাংবাদিক কামাল হোসেন কে সুনামগঞ্জ জেলা হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ও ঘটনাস্থল যাদুকাটা পরিদর্শন করে জানা যায় এসব অজানা তথ্য। এসময় আমার সাথে সিলেট থেকে যাওয়া সাংবাদিক টিমের নেতৃত্বে ছিলেন দৈনিক সংবাদের বিশেষ প্রতিনিধি আকাশ চৌধুরী। হাসপাতাল ও ঘটনাস্থলে আমাদের সাথে ছিলেন সুনামগঞ্জ রিপোটার্স ইউনিটির সভাপতি লতিফুর রহমান রাজু, সাধারণ সম্পাদক এমরানুল হক চৌধুরীসহ সুনামগঞ্জ ও তাহিরপুরের স্থানীয় সাংবাদিকগণ।

কামালের সংবাদ প্রকাশের অবৈধ বালু উত্তোলন কিছুটা হলেও বন্ধ হয়েছিল। ঘটনার দিন একটি অপরিচিত মোবাইল ফোন থেকে কামালকে ফোন করে বলা হয় আবারও যাদুকাটা নদী থেকে বালু উত্তোলন হচ্ছে। খবর পেয়ে বিষয়টি তিনি বাদাঘাট পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জকে জানান তিনি। তিনি তাকে ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেয়ার অনুরোধ করেন। এরপর তিনি খবরের জন্য ছবি তোলেন ও ভিডিও করেন। তখন সেখানে উপস্থিত এই অবৈধ ব্যবসার ‘গডফাদার’ নিয়োজিত ক্যাডার মাহমুদ আলী কোথাও ফোন করে। এরপরই মুশাহিদ ও মাহমুদের নেতৃত্বে কামালের ওপর হামলা চালায়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, নির্যাতনের পুরো ঘটনাটিই পূর্বপরিকল্পিত।

সরেজমিন গেলে যাদুকাটা নদীঘেঁষা ঘাগটিয়া গ্রামের মহিলারা ভিড় করে। সেখান থেকে কোন পুরুষ আসেনি। তাদের ভাষ্যে বুঝা যায় কারও শেখানো বুলি প্রচার করছে। পরে গাছে বেঁধে রাখা স্থান চকবাজারে গিয়ে কথা হয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। জানতে চাওয়া হয় কারা কিভাবে কোন গাছে বেঁধে রেখেছিল। কিন্তু কেউ গাছ দেখিয়ে দেয়নি। যাদেরই প্রশ্ন করা হয়েছিল তাদের বক্তব্য, ঘটনার সময় তারা ছিল না। তাই কারা ঘটিয়েছে তাও দেখেনি। পরে জানা যায়, মোশাররফ পরিবারের ভয়েই কেউ মুখ খুলতে চায়নি। আওয়ামী লীগের এই প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে রয়েছে স্থানীয় এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের সখ্যতা। পুলিশও তাদের সমীহ করে। আর এ থেকেই তাদের প্রভাব। এ প্রভাবের কারণেই তার ভাই মুশাহিদ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দুঃসাহস দেখিয়েছে সাংবাদিক নির্যাতন করার মতো ঘটনা।

সাংবাদিক কামালের অভিযোগ, তার ওপর হামলার মূল পরিকল্পনাকারীরা অনেক দিন ধরেই অবৈধভাবে পাথর ও বালু তোলার সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা আছে। বাঁধ কাটার মামলাও আছে। প্রতিবছরই তাদের এই অবৈধ কাজ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়, কিন্তু কোন কাজ হয় না। কামাল মনে করছেন, নির্যাতনের আগে মাহমুদ মোবাইল ফোনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং তাকে ফোন করে কে বালু উত্তোলনের তথ্য দিয়েছিল তাদের কললিস্ট বের করলে নির্দেশদাতার নাম বেরিয়ে আসবে।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি মোশাররফ তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার ভাই মুশাহিদ ঘটনার সময় সেখানে ছিল না। আর মনির মেম্বার অনেক জনপ্রিয়। সে তিন বারের মেম্বার’। তিনি বলেন, তারা পাঁচ ভাই, মুশাহিদ সবার ছোট। সবাই প্রাপ্তবয়স্ক। যার যার ব্যবসা স্বাধীনভাবে করে। সে কি করে তিনি জানেন না। তবে বুধবার তার বাড়িতে এ প্রতিবেদককে মোশাররফ বলেছেন, যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে এটা খুব নিন্দনীয়। এ ঘটনার তিনি সুষ্ঠু বিচার চান।
যাদুকাটা নদীপাড়ের এজাহারভুক্ত চার আসামি অধরা

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যাদুকাটা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের ছবি তুলতে গিয়ে সংবাদ প্রতিনিধিকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় এজাহারভুক্ত চার আসামি এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। সেইসঙ্গে নির্যাতনের নির্দেশদাতা কে তা জানতে আদালতে রিমান্ডও চায়নি পুলিশ।

তাহিরপুর থানার ওসি আবদুল লতিফ তরফদার বলেন, এ ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ দেখে চারজন ও এজাহারনামীয় আরও একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল চার আসামি এখনও অধরা থাকায় নির্যাতিত সাংবাদিক ও তার পরিবার আতঙ্কে ভুগছে। গত সোমবার এ ঘটনার পর মঙ্গলবার ভোররাতে সন্দেহজনক চারজানকে আটক করে পুলিশ। এর পরদিন বুধবার এজাহারনামীয় আসামিদের মধ্যে রইস উদ্দিন নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে অধরা রয়েছে মাহমুদ আলী শাহ, দীন ইসলাম, মুশাহিদ তালুকদার ও বহিষ্কৃত মেম্বার মনির উদ্দিন। উল্লিখিত এই চারজন গ্রেপ্তার না হওয়ায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

গত সোমবার দৈনিক সংবাদের তাহিরপুর প্রতিনিধি কামাল হোসেন যাদুকাটা নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের ছবি তুলতে গেলে বালুখেকো চক্র তার ওপর অতর্কিত হামলা করে মারাত্মক আহত করে নদীরপাড় থেকে টেনে-হেঁছড়ে ঘাগটিয়া বাজারে নিয়ে যায়। পরে সেখানে একটি গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে এবং মোবাইল দিয়ে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। পরে তার সহকর্মীদের সহযোগিতায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে প্রথমে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। বিকেলে তার অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সুনামগঞ্জ জেলার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

উল্লেখ্য, বালুপাথর সরকারি সম্পদ এসব রক্ষা করার দায়িত্ব উপজেলা প্রশাসনের কিন্তু সেখানে প্রশাসনের ঢিলেঢালা ভাব ও আইনের ফাঁক ফুকরে এক শ্রেণীর মানুষ আঙ্গুল ফোলে কলাগাছ হয়। এই শ্রেণীর মানুষদের একজন বালুখেকো মোশাহিদ। সরকারি সম্পদ রক্ষায় জীবন বাজি রেখে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক কামাল দেশপ্রেমিকের পরিচয় দিয়েছেন। অবিলম্বে জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক। পুলিশকে ফোন দেওয়ার পর কেনো হামলার ঘটনা ঘটল তা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হোক।

শেয়ার করুন