১৯ অক্টোবর ২০১৭
বিশেষ প্রতিবেদক : অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একের পর এক ছাত্রলীগ কর্মী খুন হচ্ছেন। কোন্দলের কারণে খুনোখুনি হয়, কিন্তু বিচার হয় না একটিরও!
সর্বশেষ নগরীর টিলাগড়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ওমর আহমদ মিয়াদ নামের এক ছাত্রলীগকে ছুরিকাঘাত করে খুন করা হয়। এর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জে প্রতিপক্ষ গ্রুপের ছুরিকাঘাতে নিহত হন সংগঠনের আরেক কর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম। এ নিয়ে গত সাত বছরে সিলেটে ছাত্রলীগের আটজন খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো অনেকে।
এভাবে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটলেও আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় তারা গ্রেপ্তার এড়িয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ান। দুএকজন গ্রেপ্তার হলেও খুব দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসেন। এভাবেই বছরের পর বছর ঝুলে থাকে হত্যা মামলার বিচার।
সর্বশেষ সোমবার নগরীর টিলাগড়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বলি হন ওমর আহমদ মিয়াদ। তিনি লিডিং ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ের ছাত্র। সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা মিয়াদ বাবা আকুল মিয়াসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শহরতলির বালুচর এলাকা একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম হত্যার ঘটনায় পরের দিন এমসি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা টিটু চৌধুরীসহ ২২ জনকে আসামি করে মামলা করেন তাঁর মা আতিয়া বেগম। মাসুম সিলেট ছাত্রলীগের সুরমা গ্রুপের অনুসারী আর আসামিরা সবাই টিলাগড় গ্রুপের অনুসারী।
এর আগে ২০১০ সালের ১২ জুলাই নগরীর টিলাগড়ে খুন হন এমসি কলেজের গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছাত্রলীগ কর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। ছাত্রলীগের আটজনসহ অজ্ঞাত আরো ১০-১৫ জন আসামির সবাই এখন জামিনে রয়েছেন। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই নগরীর মদিনা মার্কেটে ইজিবাইকের (টমটম) স্ট্যান্ডের দখল নিয়ে ছাত্ররীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে আব্দুল্লাহ কচি নামের এক কর্মী খুন হন। এ মামলাটি এখন সিআইডিতে তদন্তাধীন।
২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছাত্রলীগ কর্মী সুমন চন্দ্র দাস। এ মামলাটিও এখন সিআইডি তদন্তাধীন। ২০১৫ সালের ১২ আগস্ট সিলেট মদনমোহন কলেজ ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিজ দলের ক্যাডারদের ছুরিকাঘাতে খুন হন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ও মোগলাবাজার থানার সিলাম তেলিপাড়া গ্রামের আকলিস মিয়ার ছেলে আব্দুল আলী (১৯)। তিনি ছাত্রলীগের বিধান সাহা গ্রুপের কর্মী ছিলেন।
২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ছাত্রলীগের গ্রুপিংয়ে খুন হন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছাত্রলীগ কর্মী কাজী হাবিবুর রহমান। এ মামলার ১১ আসামির সবাই জামিনে রয়েছে। চলতি বছরের ১৭ জুলাই দুপুরে সিলেটের বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ছাত্রলীগ কর্মী খালেদ আহমদ লিটুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করলেও বাকি তিনজন পলাতক বলে পুলিশ সূত্র জানায়।
সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম. রায়হান চৌধুরী বলেন, ‘রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকুক তা আমরা চাই। কিন্তু হানাহানি হত্যার রাজনীতিতে ছাত্রলীগ প্রশ্রয় দেয় না। তিনি বলেন, হত্যায় যে-বা যারা জড়িত, তাঁদের আইনের আওতায় এনে শান্তি দেওয়া হোক তা আমাদের প্রাণের দাবি।’
সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদ বলেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল মীমাংসা করে ছাত্রলীগকে সুসংগঠিত করতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবুও নিজেদের অজান্তেই এই ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। যা কোনভাবেই কাম্য নয়। তাই আমরা এখন থেকে কঠোর অবস্থানে থাকবো। তাছাড়া এই ধরণের ঘটনা যারা ঘটায় তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের ব্যাপারে আমরা প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।
সিলেট মহানগর পুলিশের মূখপাত্র ও অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জেদান আল মুসা বলেন, যে-কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী গত কয়েক বছরে খুন হয়েছেন প্রত্যেকটিরই মামলা হয়েছে। আমরা আসামিও গ্রেপ্তার করেছি। যাদেরকে গ্রপ্তার করা যায়নি-তাদেরকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত ছিল। আমরা বসে থাকিনি।
তিনি বলেন, প্রত্যেকটি মামলার অভিযোগপত্রও আদালতে দাখিল করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও অপরাধীদের ব্যাপারে পুলিশের ভূমিকা সক্রিয়ই থাকবে।’
(আজকের সিলেট/১৯ অক্টোবর/ডি/এসসি/ঘ.)