২৫ অক্টোবর ২০১৭


সিলেটে ছাত্রলীগের কোন্দলে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক : ছাত্রলীগের দুগ্রুপের সংঘর্ষে ছেলে ওমর আহমদ মিয়াদ আহত হয়েছেন খবর পেয়ে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে ছুটে যান নগরীর বালুচর এলাকার বাসিন্দা আকুল মিয়া। সেখানে গিয়ে দেখেন ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মীদের ভিড়। ভিড়ের মাঝে ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। ছাত্রলীগের কয়েকজন পদধারী নেতা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন ওমরের ট্রিটমেন্ট চলছে। এখন দেখা যাবে না। একটু পরে দেখা যাবে। তবুও ছেলেকে দেখতে দ্বিগ্বিদিক ছুটাছুটি করছেন আকুল মিয়া। চোখ দিয়ে অঝরে ঝরছে পানি। তার পাশে মেঝেতে বসে জড়াজড়ি করে কাঁদছেন ওমরের কয়েকজন বন্ধু ও ছাত্রলীগ কর্মী। তাদের অবস্থা দেখে আকুল মিয়া বুঝে উঠতে পারছিলেন না, আসলে কি হয়েছে। খবর পেলেন ছেলে আহত হয়েছে। আর হাসপাতালে এসে দেখেন অন্য পরিবেশ। পরক্ষনেই দেখলেন একটা লাশ নিয়ে মর্গের পথে রওয়ানা হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। দৌড়ে গিয়ে দেখেন ছেলে ওমরের লাশ। ছেলের লাশ দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আকুল মিয়া। তার আর্ত চিৎকারে ভারি হয়ে ওঠে হাসপাতালের আকাশ বাতাস। পুত্র শোকে স্তব্দ হয়ে যান তিনি।

গতকাল সোমবার নগরীর টিলাগড়ে ছাত্রলীগের দু গ্রুপের কোন্দলে ছুরিকাঘাতে খুন ছাত্রলীগ কর্মী ওমর আহমদ মিয়াদ (২৬)। সে লিডিং ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ছাত্র। শুধু ওমর না সিলেটে ছাত্রলীগের গ্রুপিং কোন্দলে অকালেই একের পর এক প্রাণ ঝরছে। খালি হচ্ছে মায়ের বুক। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।

ছাত্রলীগের করাল গ্রাসে একটি হত্যাকান্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি সংঘটিত হচ্ছে। কোনো হত্যার সুষ্ঠ বিচারও হচ্ছে না। ফলে আরো সাহসী হচ্ছে দলীয় ক্যাডাররা। ওমরের ঠিক এক মাস আগেই প্রাণ ঝরাতে হয় আরেক ছাত্রলীগ কর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুমকে।

সূত্র জানায়, গত ৭ বছরে সিলেটে ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীন বিরোধে খুন হয়েছেন ৮ জন। এরমধ্যে তিনটি হত্যাকান্ডের ঘটনাই ঘটেছে টিলাগড় এলাকায়। সিলেটের ছাত্ররাজনীতি এমসি কলেজ ও সরকারি কলেজ কেন্দ্রিক হওয়ায় টিলাগড় এলাকাটিই ছাত্ররাজনীতির ঘাটি হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। এছাড়াও সংঘাত-সংঘর্ষ, ভাংচুর ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ফলে ওই এলাকাটি আরো বিপদজ্জনক হয়ে দাড়িয়েছে। বেপরোয়া হয়ে ওঠেছেন ছাত্র নেতা-কর্মীরা। তাদের শেল্টারে রয়েছেন ‘ভাইয়ারা’। দাপুটে ও প্রভাবশালী ‘ভাইয়া’ রাজনীতির কারণে আধিপত্য বিস্তার, দখলবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্ম করে যাচ্ছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। কেন্দ্র থেকেও তাদের নিয়ন্ত্রণে কোনো ধরণের পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, টিলাগড়ের আজাদ গ্রুপের নেতা এম. রায়হান চৌধুরী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তার হাত শক্তিশালী করতে গ্রুপিং শুরু করেন। যার ফলে দলীয় কোন্দল আরো তুঙ্গে ওঠে। ফলে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপুর গ্রুপের বিরোধ চলে আসছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল সোমবার ছাত্রলীগ কর্মী ওমর খুন হন। তবে এমন কোনো কারণে ওমর মিয়াদ খুন হননি বলে জানিয়েছেন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম. রায়হান চৌধুরী। তিনি বলেন, নিহত ওমর মিয়াদই আগে হামলা চালিয়েছেন।

তিনি বলেন, তিনদিন আগে এমসি কলেজে তোফায়েল আহমদ নামে আরেক ছাত্রলীগ নেতার সাথে ওমর আলী মিয়াদের ঝামেলা হয়। এ একটি ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুর রহমান আজাদ ও রনজিত সরকার বসে ঘটনার নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত ছাত্রলীগের সকল নেতাকর্মীকে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে যেতে নিষেধ দিয়েছেন।

কিন্তু গতকাল সোমবার বিকেলে ওমর মিয়াদ কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে টিলাগড় এলাকায় তোফায়েলের উপর হামলা চালায়। তোফায়েলকে সে প্রথমে দা দিয়ে কুপ মারে। এরপর তোফায়েলও মিয়াদের উপর পাল্টা ছুরিকাঘাত করে। আহত অবস্থায় তোফায়েল ও মিয়াদ দু’জনকেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে মিয়াদের মৃত্যুর সংবাদ জানার পর তোফায়েল হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়।

এঘটনায় তারেক, রাহাত ও নাসিম নামে আরো ৩ ছাত্রলীগকর্মী আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ফখরুল ইসলাম (৩০) নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। ফখরুল সিলেট সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্স শাখায় কমর্রত।

ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, নিহত মিয়াদ সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরন মাহমুদ নিপু গ্রুপের কর্মী। তার উপর হামলাকারীরা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরী গ্রুপের কর্মী।

ছাত্রলীগের রাজনীতির ব্যাপারে রায়হান চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন থেকে এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কোনো কমিটি নেই। কমিটি না থাকায় কোনো নেতার নিয়ন্ত্রনে ছাত্রলীগ কর্মীরা নয়। তারা ভাইয়াদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে সংঘাত, সহিংসতা ও কোন্দল দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, এমসি কলেজ জেলা ছাত্রলীগের কোনো ইউনিট নয়, এটা মহানগর ছাত্রলীগের ইউনিট। তাদের বিষয়ে মহানগর ছাত্রলীগ দেখবে। তিনি আরো বলেন, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্রলীগের সকল কর্মীই আমার কর্মী। দলের কর্মী। আমার নিজের কোনো ব্যাক্তিগত গ্রুপ নেই। আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর একই এলাকায় প্রতিপক্ষ গ্রুপের ছুরিকাঘাতে নিহত হন ছাত্রলীগের কর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম।

এদিকে ছাত্রলীগ কর্মী নিহত হওয়ার জেরে সড়ক অবরোধ করে রনজিৎ সরকার অনুসারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে মিছিল নিয়ে এসে টিলাগড় পয়েন্টে জড়ো হয় বিক্ষুব্দ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এরপর পয়েন্টে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে রাখে তারা। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে পুলিশের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এসময় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মিয়াদ হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানায় বিক্ষোভকারীরা। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিক্ষোভকারীদের সাথে আওয়ামী লীগ নেতা রনজিৎ সরকারও যোগ দেন। এসময়

বিক্ষোভকারীরা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শোনা যায়। অবরোধকালে বিপুল সংখ্যক পুলিশও টিলাগড় পয়েন্টে অবস্থান নেয়। তাদের উপস্থিতিতেই প্রায় দেড় ঘণ্টা বিক্ষোভ করে ছাত্রলীগ। অবরোধের ফলে সিলেট-তামাবিল সড়কে যানজট লেগে যায়।

বিক্ষোভকালে রনজিৎ সরকার ছাড়াও শাহপরান থানা আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গির আলম, ছাত্রলীগ নেতা কামরুল ইসলাম, সঞ্জয় চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেনসহ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত রয়েছেন। তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মিয়াদের খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জেদান আল মুসা বলেন, ছুরিকাঘাতে ছাত্রলীগের এক কর্মী নিহত হয়েছে। তবে কে বা কারা এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তা জানা যায়নি। পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়। তদন্ত সাপেক্ষে বিস্তারিত জানা যাবে। খুনের সাথে জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে।

এছাড়া হত্যাকান্ডের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ফখরুল ইসলাম (৩০) নামের এক যুবককে আটক করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরো বলেন, ছাত্রলীগের দলীয় কোন্দলে খুনাখুনির ঘটনা কমিয়ে আনতে নেতাদের কাজ করতে হবে। এখানে আমাদের প্রশাসনের কার্যকরি পদক্ষেপ নেয়ার কিছু নেই। আমাদের কাছে খবর আসলে আমরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। এছাড়া মামলাগুলোর ব্যাপারে আমারা কাজ করি।

 

 

(আজকের সিলেট/২৫ অক্টোবর/ডি/এসসি/ঘ.)

শেয়ার করুন