১৭ ডিসেম্বর ২০২০


উন্নয়ন বিড়ম্বনায় সিলেটবাসী, নগরজুড়ে অর্ধশত ‘মরণ ফাঁদ’

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক : বিভিন্ন কারনে গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাতিক রাজধানী সিলেট। সুন্দর এই পরিপাটি শহরটিতে হঠাৎ করেই উন্নয়ন বিড়ম্বনায় পড়েছেন নগরবাসী। এমনকি উন্নয়নের ফাঁদে পড়ে ইতিমধ্যে একজন কবিরও মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই এই দায়ভার নিতে চাচ্ছেনা সিলেট সিটি কর্পোরেশন। আর এ নিয়ে ফুসে উঠছেন সচেতন মহল। প্রায় প্রতিদিনই নগরীতে কবির মৃত্যুও প্রতিবাদে বিভিন্ন কর্মসূচী পালিত হচ্ছে।

নগরজুড়ে দেখা যায়, নগরীর অধিকাংশ ড্রেনই খোলা রেখে চলছে উন্নয়ন কাজ। তবে এসব উন্নয়ন এখন জনগনের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের পর দিন খুড়ে রাখা হয়েছে রাস্তা, ড্রেন গুলো উন্মুক্ত রেখে ময়লা পানি ছড়িয়ে বিনষ্ট করা হচ্ছে পরিবেশ। নতুন নির্মানাধীন ড্রেন ও রাস্তায় বের করে রাখা রডে প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোটখাটো দুর্ঘটনা।

সবশেষ গত ৮ ডিসেম্বর নগরীর আম্বরখানার হুরায়রা ম্যানশনের সামনে সিলেট সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নির্মাণাধীন ড্রেনে পড়ে প্রাণ যায় কবি, ছড়াকার ও শিক্ষক আব্দুল বাসিত মোহাম্মদের। এই ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে সিলেট সিটি কর্পোরেশন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের অবেহলার বিষয়টি উঠে এসেছে।

নগরঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন জায়গায় অন্তত অর্ধশত খোলা ড্রেন রয়েছে। যার খুব কম সংখকই নির্মাণাধীন। অধিকাংশ এসব ড্রেনের নির্মাণ কাজ শেষ হলেও কেবল স্ল্যাব বসানোর অভাবেই ঝুঁকিমুক্ত হচ্ছে না ড্রেনগুলো। আর এতে করেই এসব ড্রেন এখন মৃত্যুকুপে পরিনত হয়েছে।
আম্বরখানা থেকে সাপ্লাইগামী সড়কের উভয় আশে অন্তত ২২ টি খোলা ড্রেন দেখা গেছে। এসব ড্রেনের অধিকাংশই কাজ শেষ এবং পাশেই স্ল্যাব নির্মাণ করে রাখা হয়েছে। তবে কেবল বসানোর অভাবেই ট্রেনগুলো খোলা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। আবার কিছু কিছু ড্রেন এখনো নির্মানাধীন থাকলেও কোন ধরণের নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়া হয়নি।

এদিকে চৌহাট্টা থেকে আম্বরখানাগামী সড়কের বাম পাশ দিয়েও প্রায় ৭ টির মতো ড্রেন খোলা। কয়েক শত মিটারের এ সড়কেই নির্মানাধীন এতো ড্রেন থাকলেও সিসিকের পক্ষ থেকে নেই কোন নিরাপত্তা বেষ্টনী। আর কবি বাসিত মোহাম্মদের মৃত্যুর পর সিসিকের পক্ষ থেকে এ ড্রেনে নামমাত্র বেষ্টনী তৈরি করা হলেও বাকি সকল ড্রেনই আখনো রয়েছে অরক্ষিত।

এমতাবস্থায় স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে কয়েকটি ড্রেনে লাল ফিতা বেঁধে সংকেত তৈরি করেছেন। কেবল তাই নয়, নগরী ব্যবস্থতম জিন্দাবাজরে লন্ডন ম্যানশন, রাজা ম্যানশনের সামনে এবং জিন্দাবাজার-মর্জাজাঙ্গাল সড়ক আছে খোলা ড্রেন।

স্থানীয়রা জানান, গত প্রায় ৭/৮ মাস সময় থেকেই এসব ড্রেন খোলা রয়েছে। কোথাও কোথাও পুরনো ড্রেনের ময়লা অপসারণের জন্য ড্রেনের স্ল্যাব সরানো হলে পরে আর স্ল্যাব বসানো হয়নি। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা।

সব মিলয়ে সিসিকের উন্নয়ন বিড়ম্বনায় পড়ে কবি বাছিত মোহাম্মদের মৃত্যুর পর ফুসে উঠেছেন সিলেটবাসী। প্রায় প্রতিদিনই কবির মৃত্যুর প্রতিবাদে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করছেন সচেতন মহল। এরই ধারাবাহিকতায় গতকালও নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদমিনার প্রাঙ্গনে মানববন্ধন করেছে সম্মেলিক ছড়া পরিষদ, সিলেট।

সম্মেলিত ছড়া পরিষদ, সিলেটের মুখপাত্র রিপন ফরিদী আজকের সিলেটকে বলেন, কবি বাছিত মোহাম্মদেও মৃত্যুও বিষয়ে ক্ষতিরপূরণ আদায়ের আগ পর্যন্ত আমারা সিলেটের সুশীল সমাজকে নিয়ে রাজপথে থাকব।

এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক ও সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের সমন্বয়ক আবুল করিম কিম বলেন, উন্নয়ন হোক সেটা সবাই চায়। নাগরিক জীবনে উন্নয়নের প্রয়োজন আছে। কিন্তু উন্নয়নের নামে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া সেটা আমরা চাই না। এসব কাজে কোন ধরণের নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই। বরং খোলা এসব ড্রেন দিয়ে যেন এক ধরণের ফাঁদ তৈরি করে রাখা হয়েছে। তাই অবিলম্বে এসব ড্রেন বন্ধ করা হোক।

কবির মৃত্যু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কবি বাসিতের মৃত্যুর দায় সম্পূর্ণ সিসিকের। ঠিকাদার, প্রকৌশলী এবং মেয়র সবাই এর দায়বদ্ধ। কেউ দায় এড়াতে পারেন না। কারণ এরকম ঘটনা নতুন নয়। মৃত্যুর ঘটনা নতুন হলেও খোলা ড্রেনে দুর্ঘটনার খবর অহরহ। এতো কিছুর পর নগর কর্তৃপক্ষের অনেক আগেই বোধ আসার কথা ছিলো।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) নুর আজিজুর রহমান আজকের সিলেটকে বলেন, কবির মৃত্যু নিয়ে ঘটিত তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলার বিষয়টি পাওয়া গেছে। আমাদের কাজের কন্ডিশনে বলা আছে- ‘যে প্রকল্পের কাজ হবে সে প্রকল্পে যারা কাজ কর্মরত থাকবে এবং স্থানীয়দের নিরাপত্তার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকেই নিশ্চিত করতে হবে। এখানে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর গাফিলতি ছিল।

তিনি বলেন, বর্তমানে সকল ড্রেনই লাল ফিতা দিয়ে ঝুকিপূর্ণ হিসেবে চিহিৃত করার কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্টান ডিএস কনষ্ট্রাকশনের স্বত্তাধিকারী অরবিন্দু পাল নিজেদের গাফিলতির বিষয়টি স্বীকার করে আজকের সিলেটকে বলেন, আমরা একাধিক প্রকল্প চলমান থাকায় ঠিকমত তদারকি করা সম্ভব হয়না। একটি দুর্ঘটনা ঘটার কারনে আমাদের সকলের টনক নড়েছে। আমরা ভবিষ্যতে সতর্ক থাকব।

সিসিকের সাবেক প্যানেল মেয়র (১) ও ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিরর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী আজকের সিলেটকে বলেন, প্রখ্যাত কবি, সাহিত্যিক লেখক বাছিত মোহাম্মদের মৃত্যু নিঃসন্ধেহে বেদনাদায়ক এবং কষ্টের। এরকম মৃত্যু সিটি কর্পোরেশন অথবা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাকে এবং আমাদের ভূমিকাকে প্রশ্নবৃদ্ধ করে। আমি তদন্ত কমিটিকে ধন্যবাদ জানাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়ায়। এরকম ঘটনার দায়ভার আমরা এবং নগর কর্তৃপক্ষ কোনভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তদন্তে প্রমানিত দোষিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি নিশ্চিত করা হউক। ভবিষ্যতে আরেকটি ঘটনার জন্ম যাতে না হয় সে জন্য নগর কর্তৃপক্ষের সজাগ দৃষ্টি রাখা বাঞ্চনীয়।

তবে সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে সিসিকের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি ক্ষুদে বার্তা দিয়েও সাড়া পাওয়া যানি।

শেয়ার করুন