৮ ডিসেম্বর ২০২০


তবুও ‘বহাল তবিয়তে’ মেয়র আরিফ!

শেয়ার করুন

ডেস্ক রিপোর্ট : আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের টানা দুইবারের মেয়র। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি দল দলবদল করছেন বলে নগরজুড়ে কানাঘোষা চলছে। এ নিয়ে সিলেটের সচেতন মহলে চলছে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা। বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে নগরবাসীর মাঝেও রয়েছে ব্যাপক কৌতুহল। তবে মেয়র নিজে এ বিষয়টি নিয়ে চুপচাপ রয়েছেন।

গুঞ্জনের সূত্রপাত সাবেক রেলপথমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের সভায় গ্রেনেড হামলার ঘটনায় অভিযোগ গঠনের পরও মেয়র পদে বহাল তবিয়তে থাকা নিয়ে। অভিযোগ গঠনের পর থেকে তিনি বরখাস্ত হবেন এটি সবাই নিশ্চিত ভেবে রেখেছিলেন। এর আগেও তিনি গত মেয়াদে একই কারনে ২ বার বরখাস্ত হয়েছিলেন।

সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ওপর গ্রেনেড হামলার ঘটনায় আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয় গত ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দুপুরে। সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহারিয়ার কবিরের আদালতে এ মামলার অভিযোগ গঠন করেন।

মামলার আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী ও হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র জি কে গউছসহ ১১ জন আসামির উপস্থিতিতে অভিযোগ গঠন করা হয়।

এই অভিযোগ গঠনের পর মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী আগের ধারাবাহিকতায় আবারও বরখাস্ত হতে পারেন বলে নগরীতে গুঞ্জন শুরু হয়। কিন্তু বরখাস্থ না হওয়ায় নগরীতে জল্পনা শুরু হয় দল বদল করছেন আরিফুল হক। তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন। এ বিষয়ে তিনি চুপচাপ থাকলেও সম্প্রতি দেশের বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে তিনি বিষয়টি পরিস্কার করেন।

মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, তিনি অন্যকোনো দল থেকে আসেননি। এই দলের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি আছেন। দলে কোন পজিশন পেলাম বা পাব না সেটা নিয়ে তিনি ভাবেন না। তিনি যে আদর্শ লালন করেন তা পরিবর্তন করবেন না। শেষ জীবনটায় যে আদর্শ লালন করেছেন সেটা নিয়েই বিদায় নিতে চান। দল পরিবর্তন করলে অনেক আগেই করতেন। হলে আগেই পরিবর্তন করে দলে পজিশন নিতে নিতেন।

নগর ভাবনা নামে বেসরকাটি টিভি চ্যানেল মাছরাঙা টিভিতে সরকারের সহযোগিতা তিনি পাচ্ছেন বলে স্বীকার করেছেন মেয়র। যদিও বলেন, যে পরিমান ডিমান্ড আগের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত থাকতে কিছুটা পেয়েছিলেন। এখন তা পাচ্ছেন না। এখন আরও সহযোগিতা পেলে অনেক উন্নয়ন করতে পারতেন।

এর আগে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার দেড় বছরের মাথায় ২০১৪ সালে সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যায় মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নাম উল্লেখ করে সম্পূরক চার্জশিট দেন সিআইডি। হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রশীদ আহমেদ মিলন চার্জশিট গ্রহণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠান। এরপর ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি কারান্তরীণ সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার দুই বছর তিন মাস পর আবারও চেয়ারে বসার পর ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল আবারও বরখাস্ত হন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ১২ (১) ধারায় বলা হয়, কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়রের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হলে, সরকার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরামর্শক্রমে লিখিত আদেশের মাধ্যমে ক্ষেত্রমতো মেয়রকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারবেন।

স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘সিটি করপোরেশন অ্যাক্ট’ বিষয়ক উপ-সচিব মো. মাহমুদুল আলমের স্বাক্ষরে মেয়রকে বরখাস্ত করা হয় সে সময়।

বরখাস্তের চিঠিতে বলা হয়- ‘আরিফুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল মামলা-৪/২০০৯ এর সম্পূরক অভিযোগপত্র গত ২২ মার্চ আদালতে গৃহীত হয়েছে। সেহেতু সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে স্থানীয় সরকার বিভাগ আইন ২০০৯ এর ১২ উপধারা প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।’

সিলেট নগরীর উন্নয়নে সরকারের বরাদ্দ করা কোটি কোটি টাকা সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে না। যারা দায়িত্বে আছেন তারা তড়িঘড়ি করে, যেনোতেনোভাবে অপরিকল্পিতভাবে দায়সারা কাজ করছেন। তাতে সরকারের টাকার অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে নগরীর ছড়াগুলো উদ্ধার না করে উল্টো অধিগ্রহণ করার চেষ্টা করে সরকারের অর্থ ব্যয় করার। নগরীর পুকুরপাড়ে ওয়াক ওয়ের নামে পুকুরসহ জলাশয়গুলো ধ্বংস করার অভিযোগ আছে। পুকুরগুলোকে ডোবায় রুপান্তরিত করার চেষ্টা করছেন। রাস্তা সম্প্রসারণের নামে তিনি বৃক্ষ নিধন করেন। শহীদ মিনার প্রাঙ্গনের বড় কদম গাছটি বিনা প্রয়োজনে কেটে নিয়ে পরিবেশ বিরোধিকাজ বলে সমালোচিতও হয়েছেন। কিন্তু তিনি কোন কিছু্ই স্বীকার করেন না। বরং নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে চলেছেন।

সম্প্রতি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের এক অনুষ্ঠানে এসব অভিযোগগুলোর কোন উত্তর না দিয়ে উল্টো তিনি পরিবেশবাদীদেরকেই তিনি অভিযুক্ত করেন। পুকুর সংস্কারের নামে ২ বছর আগে সরকারের ৭০ লক্ষ টাকা ব্যয় করেও সোনারপাড়া দীঘি ভরাটের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলছেন ২০/২৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন। চারাদীঘি ভরাট প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গিয়ে তিনি নিজে কি কি পুকুর সংস্কার করেছেন তা জানিয়েছেন। তবে ওয়াক ওয়ের নামে পুকুরকে ডোবায় পরিণত করা কিংবা দখলদারদের সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও তিনি এড়িয়ে যান। বিরোধিতার মুখে ধোপাদীঘির পাড়ে বহুতল ভবন তৈরির বিষয়টিও এড়িয়ে গেছেন।

নগরীর উন্নয়ন নিয়ে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সম্পাদক সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক প্রশাসক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রথমে রাস্তায় কোর্ট পয়েন্টে শিকল লাগানো হলো। রিকসার জন্য পৃথক লেন তৈরি করা হলো কিন্তু এসব গেলো কোথায়? পরবর্তীতে এগুলো বাদ দেওয়া হলো। এগুলো করতে গিয়ে যে অর্থের অপচয় করা হলো- এটাতো জনগনের টাকা’।

তিনি বলেন, ‘জিন্দাবাজার হলো সিলেটের হার্ট। সিলেটের লোকজন প্রতিদিন এখানে ভিড় করেন। দির্ঘদিন ধরে কোর্টপয়েন্ট থেকে চৌহাট্টা পর্যন্ত রাস্তা ওয়ান ওয়ে রয়েছে। এরপরও যানজট থাকতো। এখন এই রাস্তায় ডিভাইডার দিয়ে ডাবল ওয়ে করা হচ্ছে। কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। ওয়ান ওয়েতেই যানজটে অতিষ্ট ছিলো নগরবাসী। তাতে করে নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়বে। যানজট তীব্র হবে। হকারদের পুনর্বাসন না করে এসব এক্সপেরিমেন্ট কোন কাজে আসবে না। তাতে সরকারের অর্থের অপচয়ই কেবল হবে। আর এই রাস্তার প্রশস্ততাও কম। এই রাস্তায় ডিভাইডার কতটুকু বাস্তব সম্মত। তাও ভেবে দেখা দরকার। এসব এক্সপেরিমেন্ট করার আগে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী কিংবা সড়ক বিশেষজ্ঞ যারা আছেন তাদের মতামত পরামর্শ নেওয়া উচিত আগে। সেই সাথে সিলেটের সুশীল সমাজ, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের মতামত নেওয়া জরুরী ছিল কিন্তু কোনকিছুই হচ্ছে না। কর্তার ইচ্ছা হলো, আর কর্ম করে গেলাম? তাতে ভোগান্তি কতটুকু বাড়বে এ নিয়ে তাদের কোন চিন্তা নেই‘।

তিনি বলেন, ‘আমরাও চাই দৃষ্টিনন্দন সিলেট হোক। কিন্তু আগে মৌলিক বিষয়ের সমাধান করা দরকার। যেমন জলাবদ্ধতা। সিলেটের অন্যতম প্রকট সমস্যা। যে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সিলেটের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছিলো। কিন্তু জলাবদ্ধতা সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ইচ্ছামাফিক শতশত কোটি কোটি টাকার অপচয় করা হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে ইচ্ছামাফিক ব্যয় করায় বরং বলা যায় আরও একধাপ পিছিয়েছে নগরীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি। এসব মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানে আগে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা উচিত’।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের এক অনুষ্ঠানে এসব অভিযোগগুলোর কোন উত্তর না দিয়ে মেয়র আরিফ নিজের পক্ষেই সাফাই গেয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, সরকারের পরিকল্পনায় তারহীন নগরীর কাজটিকেও নিজের বলে ক্রেডিট নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

শেয়ার করুন