৭ ডিসেম্বর ২০২০
নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে গণধর্ষণের মামলাটি বিচারের জন্য সিলেট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়েছে। অপর একটি অভিযোগপত্র বিচারের জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার ছাত্রলীগকর্মী সাইফুর রহমানকে প্রধান আসামি করে আটজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে পৃথক দুটি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।
ওই দিনই সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক আবুল কাশেমের আদালতে ধর্ষণ এবং চাঁদাবাজি, টাকা ও স্বর্ণ ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় পৃথক দুটি চার্জশিট দাখিল করা হয়। চার্জশিটে ধর্ষণে ছয়জন সরাসরি অংশ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ধর্ষণে সহযোগিতার অপরাধে অপর দুজনকে অভিযুক্ত করা হয়।
আদালত সূত্র জানায়, আদালতে পৃথক দুটি চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরান থানার ওসি তদন্ত ইন্দ্রানীল ভট্টাচার্য। এরপর সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক আবুল কাশেম এক আদেশে বৃহষ্পতিবারই ধর্ষণ মামলাটি সিলেট নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করেন।
এদিকে চাঁদাবাজি, টাকা ও স্বর্ণ ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগপত্রের ওপর আগামী ২৮ ডিসেম্বর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে। ওইদিন শুনানি শেষ হলে অভিযোগপত্রটি মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর হবে বলে আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের গৃহবধূ ধর্ষণের মামলার অভিযোগপত্রসহ পুরো মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়েছে জানিয়েছেন শাহপরান থানার জেনারেল রেকর্ড অফিসার (জিআরও) এসআই আব্দুল মজিদ খান বলেন, ‘ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, টাকা ও স্বর্ণ ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় আদালতে পৃথক দুটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। দাখিলের দিন (৩ ডিসেম্বর) সিলেট চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক এক আদেশে ধর্ষণ মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করেন।’
তিনি আরও বলেন, অপর অভিযোগপত্রের (চাঁদাবাজি, টাকা ও স্বর্ণ ছিনিয়ে) বিষয়ে আগামী ২৮ ডিসেম্বর সিলেট চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শুনানি হবে।
আদালত সূত্র জানায়, এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় শিক্ষক, প্রত্যক্ষদর্শীসহ ৪৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। আদালতে দাখিলকৃত অভিযোগপত্রটি ১৩ পৃষ্ঠার ছিল। এই অভিযোগপত্রে ছাত্রলীগকর্মী সাইফুর, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম তারেক, অর্জুন লস্কর, মিসবাউল ইসলাম রাজন ও বহিরাগত মো. আইনুদ্দিনকে সরাসরি ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ধর্ষণে সহযোগী হিসেবে ছাত্রলীগ কর্মী রবিউল হাসান ও মাহফুজুর রহমান মাসুমকে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আটজনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অপরাধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। একই ঘটনায় মামলার বাদীর কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে তাকে মারধর ও তার স্ত্রীর কাছে থাকা স্বর্ণালঙ্কার এবং টাকা ছিনিয়ে নেয়ার অপরাধে ওই আট আসামির বিরুদ্ধে পৃথক আরেকটি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
চার্জশিটে বলা হয়, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাদীর গাড়িটি হোস্টেলের ভেতর দেখতে পায়। ভবনের দোতলার প্রত্যক্ষদর্শী ছেলেটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ধর্ষণকারীদের নাম জানতে পারে পুলিশ। এছাড়া হোস্টেলের অন্য ছাত্রদের ছবি দেখিয়ে আসামিদের চিহ্নিত করে বলে চার্জশিট উল্লেখ করা হয়।
জানা যায়, ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের শিকার হন গৃহবধূ। এরপর পুলিশ ধর্ষণের শিকার ওই নারীকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে ওসিসিতে তিনদিন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে যান তিনি। ওই রাতেই ধর্ষণের শিকার গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে মহানগরের শাহপরান থানায় ছয় ছাত্রলীগকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেন।
এ ঘটনার পর সিলেটসহ সারাদেশে তোলপাড় শুরু হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসামিদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযানে চালায়। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৯) ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকায় চারজনকে গ্রেফতার করে। এছাড়া সিলেট জেলা পুলিশ দুজনকে, সুনামগগঞ্জ ও হবিগঞ্জ পুলিশ দুজনকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারের পর আট আসামিকে পর্যায়ক্রমে পাঁচদিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। রিমান্ড শেষে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন তারা। জবানবন্দিতে প্রধান আসামি সাইফুর, তারেক, রনি ও অর্জুন ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন।
রবিউল ও মাহফুজুর ধর্ষণে সহায়তা করার কথা স্বীকার করেন। সন্দেহভাজন আসামি মিসবাউর রাজন ও আইনুলও জবানবন্দি দেন। এছাড়া ২৯ নভেম্বর আসামিদের ডিএনএ প্রতিবেদন হাতে পান তদন্ত কর্মকর্তা।