৪ নভেম্বর ২০২০
এমদাদুর রহমান চৌধুরী জিয়া : পুলিশ হেফাজত থেকে রায়হানের হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত এসআই আকবর হােসেন ভুঁইয়া পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ায় আইনশৃংখলা বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবে উচ্চ আদালতকে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই এ মামলার প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
এদিকে রায়হান হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মহিদুল ইসলাম করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় তার পরিবর্তে আলোচিত এ মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে পিবিআইয়ের পরিদর্শক আওলাদ হোসেনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
ঘটনার মূল হােতা আকবরকে গ্রেফতারে একাধিক সংস্থার টিম কাজ করলেও তার কােনাে হদিস পাওয়া যাচ্ছেনা। এরইমধ্যে খবর পাওয়া গেছে সে চােরাকারবারিদের ছত্রছায়ায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যে প্রবেশ করেছে। আবার কেউ বলছে, সেখানে দুইদিন অবস্থান করে দেশে ঢুকেছে।কিন্তু তদন্তের স্বার্থে তথ্য প্রকাশ না করায় অনেকটা হতাশ পুলিশ নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদের পরিবার।
গত ১১ অক্টােবর এসএমপির বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হানের মৃত্যুর পরই ফাঁড়িটির ইনচার্জ (আইসি) এসআই আকবর হােসেন ভুঁইয়া ছিনতাইকালে গণধােলাইয়ের শিকার হয়েছে বলে প্রচার চালায়। এরপর বিষয়টি পুলিশ কমিশনারের নজরে আসলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি নির্যাতনের বিষয়ে প্রমাণ পাওয়ার পর আকবরসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়।
ঘটনার পরদিন ১২ অক্টােবর আকবরসহ সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পরই সে পালিয়ে যায়। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বলা হচ্ছে অন্যদের পুলিশ লাইন্সে রাখা হলেও আকবরের ক্ষেত্রে কেনাে তা হলাে না! এরপরই তাকে ধরতে চারদিকে খুঁজাখুজি শুরু হয়। পুলিশ, র্যাব, পিবিআইসহ বিভিন্ন সংস্থা নানা স্থানে অভিযান চালায়। এমনকি পুলিশ সদর দপ্তরের একটি স্পেশাল টিমও সিলেটে এসে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে যখন তােলপাড় তখনই বদলির আদেশ আসে পুলিশ কমিশনার গােলাম কিবরিয়ার। তার স্থলাভিষিক্ত হন এসপিবিএন’র ডিআইজি মো. নিশারুল আরিফ। তিনি নতুন কর্মস্থলে যােগদানের আগেই নিহত রায়হানের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেন। আকবরকে ধরতে অন্যান্য টিমের বাইরেও এডিসিদের নেতৃত্বে আরাে তিনটি টিম গঠন করেন। তারা এরইমধ্যে সুতারকান্দি, ভােলাগঞ্জ সীমান্তসহ কয়েকটি স্থানে অভিযান পরিচালনা করে।
তবে আকবরকে পাওয়া না গেলেও কােম্পানীগঞ্জের সীমান্তের বড়পুঞ্জি দিয়ে চােরাকারবারি সিন্ডিকেটের সদস্য হেলালের মাধ্যমে সে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে প্রবেশ করেছে বলে নিশ্চিত হয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনী। ইতােমধ্যে এই হেলালকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্য একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
সূত্র জানায়, পলাতক আকবরের সঙ্গে কােম্পানীগঞ্জের স্থানীয় সংবাদকর্মী আব্দুল্লাহ আল নােমানের ঘনিষ্টতা ছিল। আর নােমানের সঙ্গে চােরাকারবারি হেলালের সুসম্পর্ক থাকায় তাদের সমন্বয়ে পালানাের পরিকল্পনা করে। এরই ধারাবাহিকতায় সীমান্তের ১২৫৫ নং পিলার দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে প্রবেশ করে। জানা গেছে, হেলাল সীমান্তের ওপারে খাসিয়া সম্প্রদায়ের এক মহিলাকে বিয়ে করায় সেখানে তার ভালাে যাতায়াত রয়েছে। এমনকি সীমান্ত দিয়ে চােরাই পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে একটি সংস্থার নামে চাঁদা উত্তােলনের অভিযােগও আছে এই হেলালের বিরুদ্ধে।
সূত্র জানায়, আকবর আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল এ ঘটনার কারণে সে গ্রেফতার হতে পারে। আর তাই সে সীমান্ত এলাকার বন্ধু নােমানের সহায়তা চায়। একপর্যায়ে ১৩ অক্টােবর তারা হেলালের মাধ্যমে মেঘালয়ে প্রবেশ করে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়।
এদিকে, অপর একটি অসমর্থিত সূত্র বলছে আকবর সেখানে পালিয়ে গেলে খাসিয়া সম্প্রদায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বর্তমানে করােনাকালীন সময়ে তারা খুব সতর্কতার মধ্য রয়েছে। এছাড়া রায়হান হত্যার বিষয়টিও তারা জানতে পেরেছে। এতে করে কােনাে উপায় না দেখে সেখান অবস্থানের পর সে আবারো দেশে প্রবেশ করে।এই তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃংখলা বাহিনী মনে করে সে সীমান্তে কারাে ছত্রছায়ায় থাকতে পারে। ফলে একাধিক টিম সীমান্ত এলাকায় অভিযান অব্যাহত রাখে। আইনশৃংখলা বাহিনী সদস্যদের এতাে পরিশ্রমের পরও সুস্পষ্ট কােনাে তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় আকবর নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন জানান, আকবরকে ধরার জন্য সম্ভাব্য সব জায়গায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আকবরের সহযোগী হিসেবে নাম আসা স্থানীয় সাংবাদিক নোমানের সঙ্গে আকবর থাকতে পারে এমন খবরের ভিত্তিতে নোমানের কোম্পানীগঞ্জের গ্রামের বাড়ি এবং তার শ্বশুরবাড়ি নারায়ণগঞ্জেও তল্লাশি চালানো হয়েছে। নোমানের স্ত্রী, মা ও বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদে নোমানের উপস্থিতি জানা যায়নি। তবে আকবর নোমানের মাধ্যমেই ১৪ অক্টোবর ভোরে সিলেট ত্যাগ করেছে এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায়। তাকে দেশত্যাগে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগের ভিত্তিতে চোরাকারবারি হেলালকে রিমান্ডে নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু সে স্বীকার করেনি। হেলালকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এদিকে, আকবর নিয়ে যখন হৈ চৈ ঠিক তখনই খবর এলাে রায়হান হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই’র ইন্সপেক্টর মহিদুল ইসলামসহ তদন্ত সংশ্লিষ্ট আট পুলিশ সদস্য করােনায় আক্রান্ত হয়েছেন। সেইসঙ্গে অসুস্থ্য হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ির সাময়িক বরখাস্তকৃত রিমান্ডে থাকা এএসআই আশেক এলাহী। ফলে মামলাটির তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।
এদিকে রাহয়ান আহমদ হত্যা মামলার তদন্ত দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হচ্ছে বলে হাইকোর্টকে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতে ও ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সৈয়দ ফজলে এলাহী গত মাসে হাইকোর্টে একটি রিট করেন। এর ধারাবাহিকতায় সোমবার বিষয়টি হাইকোর্টে শুনানির জন্য ওঠে। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে আবেদনকারী আইনজীবী নিজেই অংশ নেন।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নওরোজ মো. রাসেল চৌধুরী। তিনি আদালতে মামলার অগ্রগতি জানান।
রাসেল চৌধুরী আদালতকে বলেন- ‘রায়হান উদ্দিনের মৃত্যুর আলোচিত ঘটনায় করা মামলার তদন্ত দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হচ্ছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে এমনটাই জানিয়েছেন।’
রাষ্ট্রপক্ষের এই তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি মুলতবি করেছেন। ১৬ নভেম্বর রিটের ওপর শুনানির পরবর্তী তারিখ রেখেছেন আদালত।