২৩ জুলাই ২০২০
নিজস্ব প্রতিবেদক : দ্বিতীয় দফা বন্যার এক সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয় দফা বন্যায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফা বন্যার পানি না কমতেই আবারো বন্যায় পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্বিপাকে পড়েছেন বানভাসি মানুষ। যাতায়াতে দুর্ভোগের পাশাপাশি, খাদ্য ও পানীয় এবং গো খাদ্য নিয়ে চরম বিপাকে রয়েছেন। পানিবন্দি হয়ে পড়ায় এবং কাজ না থাকায় অনেকে পরিবার পরিজন নিয়ে দুর্বিসহ অবস্থার মধ্যে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
অপরদিকে, বীজতলাসহ সবজি ক্ষেত এবং মৎস্য খামার তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুশ্চিন্তার কথা জানিয়েছেন চাষি ও খামারীরা। এদিকে, তৃতীয় দফা বন্যার পানি গতকাল বুধবার কোথাও কোথাও স্থিতিশীল থাকলেও সুনামগঞ্জের ছাতক, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, শাল্লাসহ ভাটির দিকে পানি বাড়ছে।
সিলেট আবাহাওয়া অফিসের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এবছর জুলাই মাসে অন্য বছরের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড়ি ঢল এবং বৃষ্টির কারণে সিলেট অঞ্চলে বন্যা হয়। এ বছর উজানে ভারতীয় অংশ এবং আমাদের দেশে দুই জায়গাই বৃষ্টি বেশি হচ্ছে। তবে আজকের পর থেকে বৃষ্টি কমবে এবং ২৮ তারিখের দিকে আবারো বৃষ্টি বাড়তে পারে।
গোয়াইনঘাট সংবাদদাতা জানান, গোয়াইনঘাট ৪র্থ দফা বন্যার পানি অতি ধীরে কমলেও রাস্তা ও বাড়িঘর তলিয়ে থাকায় উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এবং লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। গত তিনদিনের ভারি বৃষ্টিপাত আর পাহাড়ি ঢলে সারী ও পিয়াইন নদী দিয়ে নেমে আসা পানিতে উপজেলার সবকটি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে পুনারায় সহস্রাধিক ফিসারির মাছ পানিতে ভেসে গেছে, অনেক ঘরবাড়িতে আবারো পানি উঠেছে।
এছাড়া সারী-গোয়াইনঘাট সড়ক ও গোয়াইনঘাট জাফলং সড়কে, গোয়াইনঘাট-সালুটিকর সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
সরজমিন গিয়ে এবং বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের জাফলং চা বাগান, বাউরভাগ হাওর, আসামপাড়া হাওর, পূর্ব আলীরগাঁও ইউনিয়নের, খাষ, দাড়াইল, বাংলাইন ও লাতু হাওর, পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়নের সাতাইন, নাইন্দা তিতকুল্লি, পাঁচপাড়া, পুকাশহাওসহ উপজেলার বিভিন্ন হাওর ও গ্রাম প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কানাইঘাট সংবাদদাতা জানান, ভারি বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় কানাইঘাট উপজেলায় বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। গতকাল বুধবার কানাইঘাট সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৮৩ সেমি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাহাড়ী ঢল ও ভারি বর্ষণে লোভা ও সুরমা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। অধিকাংশ গ্রামীণ রাস্তা-ঘাট তলিয়ে গেছে। ডুবে গেছে অনেক মৎস্য খামারসহ শত আমন ধানের বীজতলা ও ধানের চারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানভীর আহমদ সরকার জানান, বানের পানিতে সম্পূর্ণভাবে ৬ হেক্টর আংশিক ২০ হেক্টর আমন ধানের বীজতলা এবং ১ হেক্টরের উপরে আউশ ধান নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষি সেক্টরের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি তারা সার্বিক ভাবে মনিটরিং করে যাচ্ছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ বারিউল করিম খান জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কানাইঘাট বাজারসহ উপজেলার নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
জৈন্তাপুর সংবাদদাতা জানান, অবিরাম ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জৈন্তাপুর উপজেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি‘র কিছুটা উন্নতি হলেও উপজেলার সবক’টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। উপজেলার নদ-নদীর পানি অনেকটা কমলেও সারী ও বড়গাং নদীর পানি এখনও বিপদ সীমার উপরে রয়েছে।
জৈন্তাপুর ইউনিয়নের কেন্দ্রী, শেওলারটুক,বাওন হাওর, বাউরভাগ, লক্ষ্মীপুর, বিরাইমারা, লামনীগ্রাম, কাটাখাল গ্রামে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। গ্রামীণ জনপদের অনেক রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। নিজপাট ইউনিয়নের উপজেলা সদরের বন্দরহাটি, মেঘলী, তিলকৈইপাড়া নয়াবাড়ি, জাঙ্গলহাটি সহ বিভিন্ন এলাকা এবং পশ্চিম গৌরিসংকর, ডিবির হাওর, কামরাঙ্গীখেল, বাইরাখেল, হর্নি, কালিঞ্জীবাড়ি, দিগারাইল, নয়াগাতি, বারগতি, হেলিরাই, গুয়াবাড়ি সহ আরো অনেক এলাকায় পানি প্রবেশ করে।
জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামাল আহমদ এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম লিয়াকত আলী বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সালাউদ্দিন জানান, সরকারী ত্রাণ সহায়তা বরাদ্দের জন্য প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের ২ হাজার ৮শত ৭৫টি পরিবারের মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। উচু এলাকার ১৬টি স্কুল কে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র হিসাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, নবীগঞ্জে টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢল অব্যাহত থাকায় কুশিয়ারা, বিবিয়ানা, শাখা-বরাক, বিজনা ও বরাক নদীর পানি বেড়েই চলেছে।
উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের মাধবপুর, গালিমপুর, জামারগাঁওসহ কয়েকটি গ্রাম ও ইনাতগঞ্জ ইউনিয়নের উমরপুর গ্রামের বাড়ি-ঘরে ঢুকে পড়েছে বন্যার পানি। ঘর বাড়িতে পানি আসায় বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ।
তাছাড়া, উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের অনেক গ্রামীণ রাস্তা-ঘাট, মৎস্য খামার বানের পানিতে তলিয়ে গেছে। টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
স্থানীয় জুয়েল খাঁনসহ অনেকেই জানান, হঠাৎ টানা বৃষ্টিপাতের ফলে পানি বাড়ছে। বন্যার পানিতে রাস্তা ঘাট তলিয়ে গেছে। ফলে জনসাধারণকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত কুমার পাল জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দীঘলবাক ইউনিয়নের বন্যাকবলিতদের ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে।