২০ জুলাই ২০২০
ডা. কামরুল হাসান খান : এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে চলেছে আমাদের প্রিয় পৃথিবী। কোনো দিকেরই কোনো সুসংবাদ পাওয়া যাচ্ছে না। গোটা বিশ্বে নতুন করে সংক্রমিত হচ্ছে মানুষ। কার্যকর তেমন সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা এখনও মেলেনি। বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার চেয়ে সামাজিক চিকিৎসাই বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু মানুষ তো জন্মগতভাবেই পরাধীনতা মানতে চায় না। কতদিন আর ঘরবন্দি হয়ে থাকবে? প্রয়োজনের কাছে মানুষ চিরকাল পরাজিত হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে অর্থ আর কতদিন থাকে, কতদিন থাকে খাবার ও শিশুর পথ্য? পেটের দায়ের কাছে তো মানুষ হার মানবেই। রাষ্ট্রকে জীবন জীবিকা দুটিই দেখতে হয়, সব দিক বিবেচনায় বাস্তব কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হয়। সামনে আসছে পবিত্র ঈদুল আজহা- মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। বাংলাদেশেও বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশ্বে ৫ জুলাই পর্যন্ত সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা এক কোটি ১৩ লাখ ৮৭ হাজার ৩৯৩ আর মৃত্যুর সংখ্যা ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬২১। বাংলাদেশে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা এক লাখ ৫৯ হাজার ৬৭৯ এবং মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ৯৯৭।
করোনাযুদ্ধে নতুন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, নতুন নতুন কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমান সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি এবং পবিত্র ঈদকে ঘিরে নতুন কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। যেমন- পরিস্থিতি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে; চিকিৎসা ব্যবস্থা (কভিড ও নন-কভিড) দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে; স্বাস্থ্যবিধি বলবৎ রেখে জীবিকার সর্বোচ্চ সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে; পবিত্র ঈদ ঘিরে কোনোক্রমেই স্বাস্থ্যবিধি শিথিল করা যাবে না; খামারি/কৃষকের কোরবানির পশু বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে; আগ্রহী মুসলমানদের কোরবানির ব্যবস্থা করতে হবে।
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার ঈদ সচেতনতা নিয়ে সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে। গত ঈদের অভিজ্ঞতা মোটেও ভালো ছিল না। বর্তমান সময়ের করোনা সংক্রমণের অনেকটাই বেড়েছে গত ঈদে ঘরমুখো মানুষের স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে যাওয়া-আসায়। এ পর্যায়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনুভূতির মর্যাদা দিতে হবে যেমন, অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু রোধ করতে হবে।
সৌদি আরবে পবিত্র হজের সময় কোরবানির জন্য ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হয়, বাকি দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। সমগ্র বিবেচনায় কোরবানির সময়ের প্রস্তাবগুলো- কোরবানির সব কার্যক্রম ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নেতৃত্বে হতে হবে। তাদের রয়েছে দেশব্যাপী শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। সব আর্থিক লেনদেন ব্যাংক/মোবাইল ব্যাংকিয়ের মাধ্যমে হতে হবে। যেসব ব্যক্তি কোরবানি দিতে আগ্রহী, তারা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নির্ধারিত অ্যাকাউন্টে নির্ধারিত টাকা জমা দেবেন। মহানগর/জেলা/উপজেলা/ইউনিয়ন পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসনের সহযোগিতায় ছোট ছোট কমিটি করতে হবে, যার নেতৃত্বে থাকবে মসজিদের স্থানীয় ফাউন্ডেশনের নিযুক্ত ইমাম। অন্যান্য আলেম-ওলামাকে কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে; কমিটি পশু ক্রয়, কোরবানি করা, মাংস বিতরণ, চামড়া সংরক্ষণ এবং বিক্রি- পুরো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে। ক্রয়-বিক্রয়ের পুরো প্রক্রিয়াটা হতে হবে অনলাইনে। যতটা জেনেছি, খামারিরা অনলাইনে যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রামে এখনও সমাজে পশু কোরবানি করা ও বিতরণ অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে হয়। প্রতিটি গ্রামে তাদের পাঁচ-সাতজনকে যুক্ত করতে হবে, যাদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি মাংস পৌঁছানোসহ কোরবানির সব কার্যক্রম অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব। তারা গ্রামের মানুষদের বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের তালিকা সংরক্ষণ করবে; সঙ্গে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন তো থাকবেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস- গ্রামের সমাজ নেতাদের দায়িত্ব দিলে তারা উৎসাহভরে আন্তরিকতার সঙ্গে সফল করে দেবেন। কোথাও লোক সমাগম/ভিড় করতে দেওয়া যাবে না; প্রধান শর্ত হচ্ছে- প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। যারা কোরবানির জন্য টাকা জমা দেবেন, তারা যেন নিশ্চিত হন যে, টাকার যথাযথ ব্যবহার হয়েছে।
প্রস্তাবিত কর্ম পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হবে ব্যাপক প্রচার ও যোগাযোগ- যা ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ চাইলে রাত-দিন পরিশ্রম করে সাত দিনে প্রস্তুত করতে পারবে। সে সক্ষমতা তাদের রয়েছে। বিশ্বের/দেশের এক দুর্যোগ মুহূর্তে দেশকে রক্ষা করার জন্য, দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য আমাদের সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, যার যেখানে দায়িত্ব রয়েছে।
যে কৃষক সারাবছর দুই-একটি পশু পালন করেছেন, তার বছরের জীবিকা নির্বাহ করার জন্য তারা যেন বিক্রির সুযোগ পান, সে জন্য তাদের নেটওয়ার্কের আওতায় আনার বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে তারা ন্যায্যমূল্য পাবেন। অনেকের ধারণা, এবার পশুর হাটে বেচাকেনা খুব সুবিধার হবে না। মাঝখান থেকে করোনা সংক্রমণ বাড়বে।
পবিত্র ঈদকে ঘিরে কোনোক্রমেই স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশের করোনার যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার রয়েছে, তাতে আমরা সবাই মিলে সমন্বিতভাবে, সুপরিকল্পিত ও আন্তরিকভাবে কাজ করতে পারলে এ পরিস্থিতি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অযোগ্য, অসহযোগী, অসৎ লোক দিয়ে কোনো সংকটই মোকাবিলা করা যায় না, সফল হওয়া যায় না। প্রয়োজনে তাদের সরিয়ে দিতে হবে।
আমার প্রস্তাবগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখবে- এটি আমার প্রত্যাশা।
বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ গৌরবের অনেক ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এখানেও আরেকটি ইতিহাস সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে, যেখানে নেতৃত্বে রয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা; যিনি বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছেন বিশ্বের দরবারে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে।
(লেখক : কলামিস্ট।)