১৩ জুলাই ২০২০
অতিথি প্রতিবেদক : বন্ধ হচ্ছেনা বন্যার আনাগোনা। ফের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বর্ষণে সিলেট নগরী এখন বানের পানির বেড়াজালে যেন বন্দী হয়ে পড়েছে। সিলেট নগরীর মাছিমপুর, ছড়ারপাড়, চালিবন্দর, মেন্দিবাগ, সাদীপুর, নওয়াগাঁও, কুশিঘাট, শেখঘাট, কলাপাড়া, কানিশাইল, ঘাসিটুলা প্রভৃতি এলাকার নিম্নাঞ্চল দিয়ে সরাসরি ঢুকে পড়েছে সুরমা নদীর পানি। সুরমা নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন ছড়া খাল, ড্রেন পানিতে একাকার হয়ে যাওয়ায় রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি হাট বাজার এখন পানিতে নিমজ্জিত।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মাছিমপুর, চালিবন্দর, মাছিমপুর শুটকিবাজার সড়ক, মাছিপুর মেন্দিবাগ সড়ক, ছড়ারপার চালিবন্দর সড়কে পানি উঠে গেছে। এলাকাজুড়ে দেখা গেছে অনেক বাসাবাড়ি দোকানপাট ও রাস্তাঘাটে বন্যার পানি। অনেক বাসাবাড়ি থেকে লোকজন অন্যত্র সড়ে গেছেন। যারা বাসাবাড়িতে আছেন তারা খাটের উপর রান্নাবান্না করছেন আবার খাটের উপর বসবাস করছেন। অনেকের টয়লেট, প্রশ্রাবখানা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মারাত্মক দুর্ভোগে রয়েছেন তারা। ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় সাপের আতঙ্কেও ভোগছেন নারী-পুরুষ ও শিশুরা।
মাছিমপুর এলাকার বন্যার্ত একটি পরিবারের মহিলা খেলা বেগম কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ঘরে পানি, দুয়ারে পানি, উঠানে পানি, রাস্তায় পানি, সন্তান-সন্তানাদি নিয়ে কিভাবে জীবন যাপন করব। অন্য কোনখানে আশ্রয় নেবার জায়গাও নেই। সন্তানদের অনিরাপদ রেখে ঘর থেকে বের হয়ে কাজের সন্ধানেও যাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে।’
বৈরী আবহাওয়া টানা বৃষ্টিপাত ও স্থানে স্থানে জমে থাকা পানির কারনে নগর জীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
এদিকে, টানা বৃষ্টিতে নগরীর সোবহানীঘাট, হাওয়াপাড়া, কুয়ারপার, জতরপুর, তালতলা, শাহজালাল উপশহর, সাদাটিকরসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি অনেক বাসাবাড়িতেও উঠেগেছে বানের পানি। ভুক্তভোগীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বৃষ্টিপাত যদি বন্ধ না হয় তাহলে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়া ছাড়া আর কোন গতি থাকবেনা।
বন্যার পানিতে অনেক স্থানে টিউবওয়েল তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানিরও সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অনেকে হাঁটু পানি কোমর পানি মাড়িয়ে বিশুদ্ধ পানির সন্ধানে ছুটে বেড়াচ্ছেন।
আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৬টা পর্যন্ত সিলেটে ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া শনিবার সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৬টা পর্যন্ত সিলেটে ৯৯ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। আর শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৬টা পর্যন্ত সিলেটে ২৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিলেট অফিস।
দিনমজুর জব্বার মিয়া বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে এমনিতেই কাজকর্ম তেমন নাই। তার মধ্যে মরার উপর খাঁড়ার ঘা এর মধ্যে আবারো আঘাত হেনেছে বন্যা। আমাদের বাঁচার উপায় কি?’
জামতলা এলাকার বাসিন্দা পিনাক রায় বলেন, ‘রাস্তায় কোমর পর্যন্ত পানি জমে গেছে। আর বাসায় হাঁটুপানি। বৃষ্টি হলেই এই এলাকায় পানি উঠে, তবে রোববার এতোকুটু বৃষ্টি হয়নি যে বাড়িরে পানি ঢুকে যাবে। রাতে এলাকার শতশত মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।’
এ সময় তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘অসময়ে ও অপরিকল্পিতভাবে সিসিকের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডই নগরীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। আর প্রতি বর্ষাতেই জলাবদ্ধতায় নাকাল হতে হয় নগরবাসীকে।’
সিলেট নগরীর ভেতর দিয়ে সুরমা নদী ছাড়াও প্রবাহিত হয়েছে ছোট বড় ১৪টি ছড়া ও খাল। মূলত প্রভাবশালীরা ছড়া ও খালগুলো দখল করে রাখায় বর্ষা মৌসুমে লেগে থাকে জলাবদ্ধতা।
নগরীর লামাপাড়া এলাকার জাফর সিদ্দিক চৌধুরী নামের এক বাসিন্দা বলেন, ছড়া উদ্ধার বা জলাবদ্ধতা নিরসনে সিলেট সিটি করপোরেশন প্রতিবছরই কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তা মানুষের কোনো কাজে আসে না। পুরো বর্ষা মৌসুমই জলাবদ্ধতার অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হয়েছে। তার উপর ফের জলাবদ্ধতা।
তবে ছড়া বা ড্রেনেজ ব্যবস্থায় কারণে নগরীতে জলাবদ্ধতা এটা মানতে নারাজ সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান।
তিনি বলেন, সিলেট নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডের সবকটি এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছে। পুরনো ড্রেনগুলোকে ভেঙে পানির সহজ নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ড্রেনগুলোর গভীরতা ও পাশে বড় করে তৈরি করেছে সিসিক। এছাড়া নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে চলা সবকটি ছড়া উদ্ধার করে তা দিয়ে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই ছড়া বা ড্রেনেজ ব্যবস্থায় কারণে নগরীতে জলাবদ্ধতা হওয়ার মতো কোন কারণ নেই।
তার দাবী, সিলেটে নদনদীর পানি বৃদ্ধির পাওয়ায় ড্রেন বা ছড়ার পানি নদীতে যেতে পারছে না। বরং উল্টো নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে নগরীর দিকে। যার কারণে নগরীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি সময়মতো নদীতে ড্রেজিং না করানোকেই দোষারোপ করছেন। পানি উন্নয়নবোর্ড যদি সময়মতো নদী খনন করতো তাহলে বর্ষা মৌসুমে নগরীর নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো না।
সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সরমা নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে নগরীর পানি নিষ্কাশনের জন্য ছড়া বা খাল দিয়ে পানি উল্টো পানি শহরে ঢুকে নগরীর নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। যার ফলে নগরীর বাসিন্দারা ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে। এসব এলাকার স্থানীয় কাউন্সিলারদের মাধ্যমে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।
এছাড়া বিষয়টিকে সিসিক পর্যবেক্ষণে রাখছেন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে পানিবন্দি বাসিন্দাদের স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী আশ্রয়ে রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।