৯ জুলাই ২০২০
ডেস্ক রিপোর্ট : ‘ক্রয় সূত্রে এই জমির মালিক মোহাম্মদ শহীদ ইসলাম, সংসদ সদস্য, লক্ষ্মীপুর (রায়পুর)-২ ও সেলিনা ইসলাম, সংসদ সদস্য, মহিলা আসন কুমিল্লা-১’। বিশাল নীল রংয়ের সাইনবোর্ডে সাদা রংয়ের এই লেখা চোখে পড়বে সিলেট নগরীর নাইওরপুল মোড় সংলগ্ন দক্ষিণে। বাউন্ডারি করা প্রহরী বেষ্টিত ৪৯ শতক জায়গাটি একটি পরিত্যক্ত সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনসহ পড়ে আছে।
তবে সম্প্রতি মানব পাচার ও অর্থ পাচার মামলায় কুয়েতের কারাগারে আটকের পর মো. শহীদ ইসলাম পাপুল ও স্ত্রী এমপি সেলিনা ইসলামকে নিয়ে সিলেটে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে মানব পাচার ও অর্থপাচারের ক্ষেত্র তৈরীর জন্য এই জায়গা ক্রয় করেছিলেন পাপুল দম্পতি। জায়গা ক্রয়ের পর তারা সিলেটে অনেকবার যাতায়াত করেছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন। এমনকি সিলেটেও তার শক্ত সিন্ডিকেট রয়েছে বলে ধারনা করছেন অনেকেই।
এদিকে, সিলেট নগরীর রাস্তা সম্প্রসারণ কাজ শুরু হলে বিভিন্ন বাসা, ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ স্থাপনা ও জায়গার মালিকরা সম্প্রসারণ কাজের সুবিধার জন্য নিজস্ব জায়গা ছেড়ে দেন। কিন্তু পাপুল দম্পতি এক ইঞ্চি জায়গাও ছাড়তে রাজি ছিলেন না। ফলে নাইওরপুল আসার পর সিটি কর্পোরেশনের রাস্তা সম্প্রসারণ কাজ আটকে যায়।
২০০৯ সালে নাইওরপুল মোড়ে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনসহ এই ৪৯ শতক জমি সিলেট নগরীর খরাদিপাড়ার ব্যবসায়ী আতাউল্লাহ সাকেরের কাছ থেকে ৯ কোটি টাকা মূল্যে কিনেন শহীদ ইসলাম পাপুল দম্পতি।
ব্যবসায়ী আতাউল্লাহ সাকের বলেন, ২০০৯ সালে নাইওরপুলের এই জায়গা পেট্রোল পাম্পসহ এমপি পাপুল ও তার স্ত্রী সেলিনার কাছে তিনি বিক্রি করেন। ৪৯ শতক এই জায়গার মূল্য হিসাবে তিনি ৯ কোটি টাকা গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই পাপুল দম্পতির দখলে জায়গা রয়েছে। তারা নিজস্ব লোক দিয়ে জায়গা দেখভাল করছেন।
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে জমির দাম কম ছিলো। এখন এই জমির দাম দ্বিগুণ হবে। জায়গা কেনার পর সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে বাউন্ডারি ঘেরা জায়গাটি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেট চ্যাপ্টারের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সিলেটের মানুষ ভদ্র এবং নিরীহ। সিলেটবাসী সকলকেই সমান চোখে দেখে, সাদরে গ্রহণ করেন। শহীদ ইসলাম পাপুল ও স্ত্রী সেলিনা ইসলাম যে সিলেটে জায়গা কিনেছেন, এখানে তারা কি করতে চাচ্ছেন-এ ব্যাপারে সিলেটবাসী মাথা ঘামায়নি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে মানব পাচার ও অর্থ পাচারের ক্ষেত্র তৈরী করতে-তারা জায়গা কিনে এখানে নিজেদের নেটওয়ার্ক সাজাতে চেয়েছিলো।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের একটি সূত্র জানায়, সিলেট নগরীর রাস্তা সম্প্রসারণ করতে গিয়ে নাইওরপুলে পাপুল দম্পতির জায়গার কাছে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয় সিটি কর্পোরেশন। রাস্তা সম্প্রসারণ ও ড্রেন করতে গিয়ে নগরবাসী নিজের জায়গা ছেড়ে দিয়ে সিটি কর্পোরেশনকে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু, হাইওয়ে সড়ক তামাবিলের প্রবেশ মুখ নাইওরপুলের রাস্তার পরিধি খুব ছোট হওয়ায় সড়কের আশপাশের জমির মালিকদের কাছে ড্রেন নির্মাণের জন্য কিছু জায়গা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায় সিটি কর্পোরেশন। এই অনুরোধ কেউ ফিরিয়ে দেননি। জমির মালিকরা রাস্তার পাশের ড্রেন নির্মাণের জন্য ২ অথবা ৩ ফুট করে নিজ উদ্যোগেই জায়গা ছেড়ে দেন। কিন্তু এমপি পাপুল ও তার স্ত্রী সেলিনা এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বেন না বলে জানিয়ে দেন।
সমঝোতার জন্য অনুরোধ করে এমপি সেলিনাকে নিয়ে আসা হয় সিলেটে। নগর ভবনেই তাকে নিয়ে বৈঠকে দুই অথবা তিন ফুট জমি ছেড়ে দিতে অনুরোধ করা হয়। এতেও মন গলেনি তাদের। বরং জমিতে হাত দিলে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেয়া হয় পাপুল দম্পতির পক্ষ থেকে। তাই নিরুপায় হয়ে ওই জায়গায় গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয় সিটি কর্পোরেশন।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, সিটি কর্পোরেশন এমপি দম্পতির জায়গা সরকারিভাবে অধিগ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানায়। এ আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। এখন জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জায়গা অধিগ্রহণের প্রস্তুতি চলছে বলে জানান মেয়র আরিফ।
প্রসঙ্গত, লক্ষীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী পাপুল কুয়েতে মারাফি কুয়েতিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। গত ৬ জুন মানব পাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করে কুয়েতের সিআইডি। আটক করা হয়েছে তার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও তার ঘনিষ্ঠ মূর্তজা মামুনকে। এমপি পাপুল কুয়েতের ইতিহাসে বৃহত্তম মানবপাচারের ঘটনায় জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।