২ জুলাই ২০২০
ডেস্ক রিপোর্ট : বন্যার পানি কিছুটা হ্রাস পেলেও বেড়েছে জন দুর্ভোগ। বানভাসী মানুষেরা জানিয়েছেন, ত্রাণের অপ্রতুলতায় তারা কষ্টে রয়েছেন। সেই সাথে গো-খাদ্যের অভাব গবাদি পশু পালন নিয়ে লোকজনকে দু:শ্চিন্তায় ফেলেছে। পানি কমায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার বাড়িঘর, রাস্তাঘাটের ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন ফুটে উঠছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক সড়ক ভেঙ্গে যানবাহন চলাচলে বিঘ্নতা সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার আবার নতুন করে বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় কয়েকটি নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে।
সিলেট আবহাওয়া অফিস গতকাল বুধবার ভোর ৬টা পর্যন্ত (২৪ ঘন্টায়) ২৫ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৩২ মিলিমিটার।
এদিকে, সিলেট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সফিক উদ্দিন জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত সিলেটের ৬ উপজেলায় বন্যা দুর্গতদের জন্য ১শ’ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এসব উপজেলা হচ্ছে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, সিলেট সদর ও বিশ্বনাথ।
কোম্পানীগঞ্জ
কোম্পানীগঞ্জে বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট থেকে ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে পানি। উপজেলা পরিষদ মাঠ, থানা কম্পাউন্ডার ও থানাবাজার থেকেও নেমে গেছে পানি। পানি কমায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘর, রাস্তাঘাটের ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন ফুটে উঠছে। বন্যা দুর্গতরা তাই এখন মাথা তুলে দাঁড়াবার দুশ্চিন্তায়। পাহাড়ি ঢলে উপজেলার পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়নের ঢালারপাড়, মোস্তফানগর ও চাঁনপুর গ্রামের বেশ কয়েকটি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার ঘুরে দাঁড়াতে সরকারি সহায়তা চেয়েছেন।
চাঁনপুর গ্রামের রহিজ উল্লাহ, কাশেম, মন্তাজ আলী ও আলেক মিয়াসহ কয়েকজন জানান, পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে তাদের বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তাদের এখন মাথা গোঁজার ঠাই নেই।
এদিকে বন্যার পানি কমায় ঢালারপাড়-মোস্তফানগর বাঁধ ধসে পড়ার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ পরিদর্শন করেছেন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিয়া, মো. আলমগীর আলম মেম্বার, সমাজসেবক মো. আলীসহ অনেকে।
অপরদিকে, বানভাসি মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার ও সরকারি বরাদ্দের চাল বিতরণ অব্যাহত রেখেছে উপজেলা প্রশাসন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমন আচার্য জানান, বন্যা দুর্গতদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণের পাশাপাশি গত দু’দিনে ৩৫ মেট্রিকটন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
কানাইঘাট
কানাইঘাট উপজেলায় বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। উপজেলার বেশ কিছু এলাকা থেকে পানি নেমে গেছে। তবে, এখনও উপজেলা ২নং লক্ষিপ্রসাদ, ৮নং ঝিঙ্গাবাড়ী, ৯নং রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের কাঁচা পাকা সড়ক পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এসব এলাকার বেশির ভাগ লোকজন চলাচল করছে নৌকায়। বন্যার পানিতে তলিয়ে অনেক সড়ক ভেঙ্গে গিয়ে যানবাহন চলাচলে বিঘ্নতা সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, পানি কমতে শুরু করলেও বন্যা কবলিত এলাকার মানুষজন চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। ঘরবাড়ির চারপাশে এখনও পানি থাকায় কার্যত পানিবন্দি হয়ে আছেন লক্ষাধিক মানুষ।
এদিকে, মঙ্গলবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এসময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ বারিউল করিম খানসহ বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যান এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
গোয়াইনঘাট
গোয়াইনঘাটে বন্যা পরিস্থিতি আবারও অবনতি দেখা দিয়েছে। বরাক আর সুরমা নদীর প্রভাব পড়ছে উপজেলার দক্ষিণ এলাকায়। এতে কৃষকরা আতংকিত হয়ে পড়েছেন। গত কয়েকদিনের পাহাড়ি ঢল আর টানা ভারি বৃষ্টিতে গোয়াইনঘাট উপজেলা প্লাবিত হয় এবং উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে করে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি থাকেন। গত সোমবার থেকে পানি কমতে থাকলে মোটামুটি স্বাভাবিক হয় যাতায়াত। কিন্ত গতকাল বুধবার সকাল থেকে বরাক ও সুরমা নদীর প্রভাব পড়ে গোয়াইনঘাট উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলে। বিশেষ করে পূর্ব আলীরগাঁও, পশ্চিম আলীরগাঁও, ডৌবাড়ী, ফতেপুর, নন্দীরগাঁও এবং তোয়াকুল ইউনিয়নে।
এদিকে, পিয়াইন ও সারী নদীতে হালকা পানি বাড়ায় পূর্ব আলীরগাঁও ও পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়নের একাংশ, পূর্বজাফলং, পশ্চিম জাফলং এবং রস্তমপুর ইউনিয়নে হালকা পানি বাড়ছে। উপজেলার দু’দিক থেকে পনি বৃদ্ধি হওয়ায় উপজেলার কৃষককূলে নেমে আসছে অজানা আতঙ্ক। কেননা গত বন্যার ঘা শুকাতে না শুকাতেই আবার বড় বন্যার আশংকা।
সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, রোপা আউশ, বোনা আমন এবং আমনের বীজতলা শতভাগ ক্ষতির আশংকা রয়েছে। এছাড়া, শাক সবজির বাগান পুরোটাই ক্ষতি সাধিত হয়েছে। উপজেলার মধ্যে কয়েক হাজার ছোট বড় ফিসারীর মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। সব মিলিয়ে কয়েক শত কোটি টাকার ক্ষতি সাধিত হয়েছে। একদিকে করোনার প্রভাব, অন্যদিকে বন্যার ছোবল। এতে উপজেলাবাসী ক্ষতির দিকদিয়ে ৫০ বছর পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এবারের ক্ষতিগুলো পিছনের সকল ঝড়, তোফান, বন্যা খরা হার মানিয়েছে। সরকারী ভাবে উজেলার সবকটি ইউনিয়নে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুস সাকিব জানান, বুধবার পুনরায় কিছু পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিপদ সীমার উপরে যায়নি। তিনি আরও বলেন বন্যা উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ৩৫ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে, আর ২০ টন মজুত আছে।
সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জে সুরমার পনি হ্রাস পেয়ে বিপদ সীমার ৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল বুধবার বিকেলে সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ ষোলঘর পয়েন্টে ৮ দশমিক ৯ সেন্টিমিটার রেকর্ড করে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড। সুরমা নদীর পানি হ্রাস পেলেও জনপদে দুর্ভোগ রয়েছে ।
বুধবার শহরের কাজির পয়েন্ট, বড়পাড়া, তেঘরিয়া, মধ্যবাজার, উকিলপাড়া, নবীনগরসহ নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যার পানি কমলেও শহরের বলাকা আবাসিক এলাকা, বিলপাড়, মোহাম্মদপুর, পূর্ব নতুনপাড়া, দক্ষিণ নতুনপাড়ায় জলাবদ্ধায় দুর্ভোগ বেড়েছে। এছাড়াও গ্রামাঞ্চলে বন্যায় দুর্ভোগ বেড়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, ছাতক ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করেলেও দিরাই, শাল্লা ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের উমেদশ্রী গ্রামের আমান উল্লাহ জানান, মঙ্গলবার তার বসত ঘর থেকে বন্যার পানি নামলেও গ্রামে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ বসত ঘরে বন্যার পানি রয়েগেছে। বন্যার পানিতে ওইসব বসতঘর এখন কাদায় মাখামাখি করছে। একই বক্তব্য সদর উপজেলার লালপুর গ্রামের আব্দুল কাইয়ুমের। বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার মিজানুর রহমান জানান, তার গ্রামের কিছু কিছু বসতঘর থেকে বন্যার পানি নামলেও বাড়ির আঙ্গিনায় পানি থৈ থৈ করছে। পানি বন্দি হয়ে পড়েছে গ্রামের মানুষ।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বুধবার সুনামগঞ্জ ঘোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি ৭ দশমিক ৮৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা বিপদ সীমার ৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৫ মে পর্যন্ত হাওরের ফসলরক্ষার জন্য সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমা ছিল ৬ দশমিক ৫০ সেন্টিমিটার এবং ১৫ মে-এর পরে বিপদ সীমা হল ৭ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার। ৭ দশমিক ৮০ সেন্টিমিটার অতিক্রম করলেই বর্ষাকালে সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমা ধরা হয়।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে জেলার ১১টি উপজেলায় ৪ শত ১০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও ৭৮ টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে আশ্রয় কেন্দ্রে ১৪৮টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।
জেলার ৮টি উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৪৪ হাজার ১১০ টি। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ৫ হাজার পরিবার, তাহিরপুরে ৩ হাজার, জামালগঞ্জে ৪শ, ছাতকে ১৯ হাজার ৩৯৬, দোয়ারাবাজারে ১১ হাজার, শাল্লায় ১৪টি, ধর্মপাশায় ২৫০টি ও জগন্নাথপুরে ৫০টি পারিবার।
এদিকে, সুনামগঞ্জ পৌর এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে বন্যার্তদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রি বিতরণ করছেন পৌর মেয়র নাদের বখত।